অর্থ শুধু পাচারই হয় ফেরত আসে না

0
89

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে। পৃথক সংস্থা, বিশেষ সেল ও আইন প্রণয়ন করেও এটি প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। তদুপরি পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রেও ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে বাংলাদেশ। ফেরত আনার বিষয়ে দায়িত্বশীল যারা তারা বলছেন, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা অনেক সময়সাপেক্ষ বিষয়।

পাচারের অর্থ ফেরত পেতে হলে একটি বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর প্রাপ্ত রায়ের ভিত্তিতে উদ্যোগ নিতে হয়। কিন্তু অর্থ কোথায় গেছে বা যাচ্ছে, সে সবের হদিসই পাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।

জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি চাকুরে, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীসহ একশ্রেণির মানুষ সচেতনভাবে দেশ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ পাচার করছেন। বিশেষ করে ঘুষ বা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ অর্থ নিরাপদ রাখতে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। সম্পদশালী ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা রাজনৈতিক মতপার্থক্যসহ নানা কারণে দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলো নিরাপদ মনে করেন না। কারণ তারা দেখেছেন,

ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানও জোরপূর্বক দখল করার ঘটনা ঘটেছে। তাই আখের গোছাতে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে ব্যাংকের মাধ্যমে চলছে তাদের অর্থ পাচার। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই, থাইল্যান্ডসহ ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলো রয়েছে তাদের পছন্দের তালিকায়। সেসব দেশে বিকল্প ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন অর্থ পাচারকারীরা। কানাডা, অস্ট্রিয়া, আমেরিকা ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এ দেশের অনেক অর্থ পাচারকারী বিলাসবহুল বাড়ি গড়ে তুলছেন দেশ থেকে পাচারকৃত অর্থে। সরকারি-বেসরকারি চাকুরেদের সন্তানরা বিদেশে লেখাপড়ার জন্য যাচ্ছেন। তাদের খরচ এ দেশে বসে বহন করছেন মা-বাবা। লেখাপড়া শেষ করে সন্তানরা সেসব দেশেই ব্যবসা করছেন, বাড়ি-গাড়ি কিনছেন। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো হচ্ছে। এসব অপরাধ অনেকটাই ‘ওপেন সিক্রেট’। কিন্তু এ নিয়ে কারও বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, বাংলাদেশ অর্থ পাচারের প্রধানত দুটি কারণÑ এক. এ দেশে অর্থ রাখা নিরাপদ মনে না হওয়া এবং দুই. বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না থাকা। মূলত এ দুটি কারণেই অর্থ পাচার হচ্ছে। এখানে ব্যবসা শুরু করা এবং টিকে থাকা বিভিন্ন কারণে অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং। বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা করার পরিবেশ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৬তম বলে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

প্রতিরোধের বিষয়ে ড. মির্জ্জা আজিজুল বলেন, অর্থ পাচার রোধে গঠিত সংস্থাগুলোর সক্ষমতার অভাব রয়েছে বলেই পাচার বাড়ছে। পাচার হওয়ার পর অর্থ কোথায় গেছে, সেটি খুঁজে বের করতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাচারকৃত অর্থের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। যার ফলে ফেরতও আনা যাচ্ছে না। বিএফআইইউ, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সেই সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এর পর পারস্পরিক সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে।

অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার জন্য গঠিত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অনেক জটিল। যেহেতু এটি এক দেশ থেকে আরেক দেশে যায়, তাই আইনগত নানা ধাপ রয়েছে। বেশ কয়েকটি পাচারের ঘটনা নিয়ে আমরা কাজ করছি। বিভিন্ন দেশের আদালতে আমাদের ৩০টির মতো মামলা চলমান রয়েছে। একেকটি মামলা শেষ হতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে। আমরা কাজ করছি, কিন্তু প্রক্রিয়াটি অনেক জটিল বলে পাচারের অর্থ ফেরত আসার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে না। তিনি বলেন, আরাফাত রহমান কোকোর পাচার করা অর্থ ফেরত আনা গেছে সাড়ে ৩ বছরে। ওই মামলায় কোনো আপিল হয়নি। তাই এত দ্রুত ওই অর্থ ফেরত আনা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ধরা পড়া অর্থ অতিদ্রুত শ্রীলংকা ও ফিলিপাইন থেকে ফেরত আনা গেছে। যে পরিমাণ অর্থের কোনো হদিস, সেই অর্থ ফেরত আনতে দু-একদিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা করা হবে।

উল্লেখ্য, ‘২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত উন্নয়নশীল দেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ পাচার’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন গত সোমবার প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক অর্থ পাচারবিরোধী সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির (জিএফআই)। এতে বিশ্বের ১৪৮টি দেশের অর্থ পাচারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে ২০১৫ সালে ৫৯১ কোটি ৮০ লাখ ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫০ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে)। আর ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এক দশকে সর্বমোট পাচার হয়েছে ৬ হাজার ৩২৮ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। আমদানি-রপ্তানির আড়ালে ব্যাংকের মাধ্যমে বেশির ভাগ অর্থ পাচার হয়েছে।

বাংলাদেশিদের অর্থ পাচারের তথ্য বৈশ্বিক আরও কয়েকটি সংস্থার রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৭ সাল শেষে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশীদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ৪৮ কোটি ১৩ লাখ ১৭ হাজার সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা (প্রতি সুইস ফ্রাঁ ৮৪ টাকা ৫২ পয়সা হিসাবে)। ২০১৬ সাল শেষে এর পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ১৯ লাখ ৬১ হাজার সুইস ফ্রাঁ বা ৫ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা।

মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, সেখানে দ্বিতীয় নিবাস গড়ার কর্মসূচি ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোমে (এমএম২ এইচ)’ অংশ নেওয়া ৩ হাজার ৭৪৬ বাংলাদেশির মধ্যে ২৫০ জন সেখানে বাড়ি কিনেছেন। ওই প্রকল্পে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা যেমন তৃতীয় অবস্থানে আছেন, তেমনি বাড়ি কেনার ক্ষেত্রেও একই অবস্থানে তারা।

পানামা পেপার্স, প্যারাডাইস পেপার্সে বাংলাদেশিদের নাম এসেছে। তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন বলে ওই দলিলপত্রে তাদের নাম এসেছে। এ ছাড়া ঋণ হিসেবে ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে হলমার্ক গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও অ্যাননটেক্স গ্রুপ এবং এবি ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার করেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু ওই সব অর্থও আজ পর্যন্ত ফেরত আসেনি।

আরও ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুইফট সিস্টেমের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইন ও শ্রীলংকায় চলে যায়। এর মধ্যে শুরুতেই শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবৈধ লেনদেন বুঝতে পেরে ২ কোটি ডলার আটকে দেয় এবং পরে তা বাংলাদেশকে ফেরত পাঠায়। কিন্তু ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে এখনো ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের কোনো হদিস নেই।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, অর্থ পাচার প্রতিরোধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বতন্ত্র সেল রয়েছে। পাচারকারীদের শাস্তি দিতে যুগোপযোগী আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান পাচার ঠেকাতেও পারছে না। আবার পাচারকৃত অর্থ ফেরতও আনতে পারছে না।