আইনস্টাইনকে সত্য প্রমাণ করে নোবেল জয়

4
1182
পদার্থবিজ্ঞানের নোবেলজয়ী ব্যারি সি ব্যারিশ, কিপ এস থ্রোন ও রেইনার ওয়েইজ।
পদার্থবিজ্ঞানের নোবেলজয়ী ব্যারি সি ব্যারিশ, কিপ এস থ্রোন ও রেইনার ওয়েইজ।

চিকিৎসার পর পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারও এবার তিন মার্কিন বিজ্ঞানীর হাতে উঠেছে। তাঁরা হলেন রেইনার ওয়েইজ, ব্যারি সি ব্যারিশ ও কিপ এস থ্রোন। মহাকর্ষ তরঙ্গ আবিষ্কারের জন্য আজ মঙ্গলবার এই তিন মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

১৯১৫ সালে সাধারণ অপেক্ষবাদের তত্ত্ব নিয়ে কাজ করার সময় এমন একটি তরঙ্গের কথা অনুমান করেছিলেন আইনস্টাইন, যা স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়। কিন্তু এর পর বহু বছর কেটে গেলেও এমন কোনো তরঙ্গের প্রমাণ পাননি বিজ্ঞানীরা। অবশেষে ২০১৫ সালে স্বরূপে ধরা দিল মহাকর্ষ তরঙ্গ। মহাকাশে স্থান-কালের কল্পিত বুনটে এ মৃদু তরঙ্গ বিরাজ করে। নক্ষত্রপুঞ্জের মৃত্যু কিংবা দুটি কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে সংঘর্ষের মতো ঘটনা থেকে এ তরঙ্গের সৃষ্টি।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো মহাকর্ষ তরঙ্গের পর্যবেক্ষণ করেন কিপ থ্রোন ও রেইনার ওয়েইজ। এ তরঙ্গ পর্যবেক্ষণের জন্য তাঁরা ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (ক্যালটেক) একটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ শুরু করেন। পরে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন আরেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ব্যারি ব্যারিশ। লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশন্যাল-ওয়েভ অবজারভেটরি (লিগো) নামে নিজেদের তৈরি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে তাঁরা প্রথমবারের মতো মহাকর্ষ তরঙ্গ প্রত্যক্ষ করেন, যা ছিল পৃথিবী থেকে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। তবে এ বিষয়ে তাঁরা আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি দেন গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে।

আবিষ্কারের পর থেকেই এই তিন বিজ্ঞানী সম্ভাব্য সব ধরনের পুরস্কার নিজেদের ঝুলিতে ভরেছেন। আর আজ এর সঙ্গে যুক্ত হলো নোবেল পুরস্কারও। এ বিষয়ে এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, সুইডিশ রয়াল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস এ পুরস্কার ঘোষণার সময় মহাকর্ষ তরঙ্গ আবিষ্কারের ঘটনাকে ‘যুগান্তকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে একে ‘পৃথিবী কাঁপিয়ে দেওয়া আবিষ্কার’ হিসেবেও উল্লেখ করেছে নোবেল কমিটি।

*চিকিৎসার পর পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পেলেন তিন মার্কিনি।
*মহাকর্ষ তরঙ্গ আবিষ্কারের জন্য এবারের নোবেল। *তিন বিজ্ঞানী হলেন রেইনার ওয়েইজ, ব্যারি সি ব্যারিশ ও কিপ এস থ্রোন।
*১৯১৫ সালে আইনস্টাইন এমন একটি তরঙ্গের কথা অনুমান করেছিলেন।
*২০১৫ সালে স্বরূপে ধরা দেয় মহাকর্ষ তরঙ্গ। নক্ষত্রপুঞ্জের মৃত্যু কিংবা দুটি কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে সংঘর্ষ থেকে এ তরঙ্গের সৃষ্টি।
*মহাকর্ষ তরঙ্গ নিয়ে ১৯৭০ সালেই গবেষণা শুরু করেন রেইনার ওয়েইজ। তাই পুরস্কারের ৯০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার অর্ধেক পাবেন তিনি। বাকিটা কিপ থর্ন ও ব্যারি বারিশ ভাগ করে নেবেন।
নোবেল কমিটির ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘যে তরঙ্গ ধরা পড়েছিল, তা ছিল অনেক দুর্বল। কিন্তু এ তরঙ্গ শনাক্তের ঘটনা জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য বৈপ্লবিক। মহাকাশে ঘটে চলা বিভিন্ন ঘটনার দিকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে আলো ফেলার এক ক্ষেত্র তৈরি করেছে এ আবিষ্কার। এটি আমাদের জ্ঞানের সীমা সম্পর্কে জানতেও সহায়তা করবে।’

রীতি অনুযায়ী আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে তিন বিজ্ঞানীর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। পুরস্কারের ৯০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার (১১ লাখ ডলার) অর্ধেক পাবেন রেইনার ওয়েইজ। বাকিটা কিপ থর্ন ও ব্যারি বারিশ ভাগ করে নেবেন।

নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, মহাকর্ষ তরঙ্গ নিয়ে ১৯৭০ সালেই গবেষণা শুরু করেন রেইনার ওয়েইজ। সে সময়ই তিনি লেজারভিত্তিক একটি ইন্টারফেরোমিটার তৈরি করেন। আর লিগো পর্যবেক্ষণকেন্দ্রটি স্থাপনের কাজ শুরু হয় আজ থেকে ৫০ বছর আগে। ২০ টিরও বেশি দেশের এক হাজার বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। রেইনার ওয়েইজ, কিপ এস থ্রোন ও ব্যারি সি ব্যারিশ এ প্রকল্পের স্বপ্নদ্রষ্টা ও বাস্তব রূপায়ণকারী। আর এ কারণেই তাঁদের এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে বলে নোবেল কমিটি জানিয়েছে।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালে প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর এ পর্যন্ত তিনবার মহাকর্ষ তরঙ্গ ধরা দিয়েছে। এর মধ্যে দুইবার লিগোর মাধ্যমে। আর একবার ইতালির ইউরোপীয় মহাকর্ষ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (ইগো) ভারগো ডিটেক্টরের মাধ্যমে এ তরঙ্গ ধরা পড়ে।

নোবেল কমিটির ঘোষণায় বলা হয়, ‘আইনস্টাইন যেমনটা বলেছিলেন, ঠিক সে রকমভাবেই মহাকর্ষ তরঙ্গ আলোর গতিতে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। দুটি কৃষ্ণগহ্বরের পারস্পরিক আবর্তন কিংবা এমন কোনো ঘটনায় যখনই কোনো ভর গতিশীল হয়, তখনই এ তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। এ তরঙ্গ স্থানকে (স্পেস) ক্রমাগত সংকুচিত ও প্রসারিত করে। এ তরঙ্গের ফলে সৃষ্ট শব্দ শোনা সম্ভব হলে পুরো মহাবিশ্বকেই সাংগীতিক বলে মনে হবে।’

প্রসঙ্গত, গতকাল চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ বছরের নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শুরু হয়। দেহঘড়ির অস্তিত্বের প্রমাণ দিয়ে গতকাল এ পুরস্কার জিতে নেন তিন মার্কিন জিনবিজ্ঞানী। আর আজ পদার্থবিজ্ঞানে নাম উঠে এল আরও তিন মার্কিনির। এ নিয়ে এ বছরের নোবেল পুরস্কারের প্রথম দুদিন আমেরিকার হয়েই থাকল। আগামীকাল বুধবার ঘোষণা করা হবে রসায়নে নোবেল বিজয়ীর নাম।

গত বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তিন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ডেভিড থলেস, ডানকান হ্যালডেন ও মাইকেল কস্টারলিটজ।

4 COMMENTS

LEAVE A REPLY