আগের রাতে ভোট হয়েছে

12

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে গতকাল দিনভর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের গণশুনানিতে ধানের শীষের প্রার্থীরা বলেছেন, গত ৩০ ডিসেম্বর ভোট হওয়ার কথা থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সহায়তায় আগের রাতেই নৌকা-লাঙল প্রতীকে সিল মেরে ৫০-৬০ শতাংশ ব্যালট বাক্সভর্তি করা হয়। গায়েবি মামলাসহ বিনা কারণে সাদা পোশাকে নেতাকর্মীদের তুলে নেওয়া অব্যাহত ছিল।

এ অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ১০ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পর নির্যাতনের মাত্রা ধীরে ধীরে বেড়ে যায়। প্রচারে নামলে প্রার্থীদের ওপরও হামলা হয়। প্রার্থীরাও হামলার কারণে ঘরবন্দি হয়ে পড়েন। প্রতীক বরাদ্দের পরও বেশ কয়েক প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়। প্রার্থীরা অভিযোগ করেন, অনেক প্রার্থীকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং এজেন্টদেরও গ্রেপ্তার ও কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে গণশুনানি শুরু হয়।

ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে গণশুনানির বিচারক প্যানেলে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ, শিক্ষক অধ্যাপক নুরুল আমিন ব্যাপারী, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, সাবেক বিচারক আ ক ম আনিসুর রহমান খান ও আইনজীবী মহসিন রশিদ। গণশুনানিতে সরকার, নির্বাচনে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার সমালোচনা করার পাশাপাশি উল্লিখিত অনিয়ম প্রতিরোধে অথবা অনিয়মের প্রতিবাদে কোনো ভূমিকা না রাখায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনসহ স্টিয়ারিং কমিটির নেতা, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সমালোচনা করেন প্রার্থীরা।

তারা বলেন, নির্বাচনে যেসব অনিয়ম হয়েছে তা প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের পরিকল্পনার অভাব ছিল। তারা প্রশ্ন করেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপের পর কোনো দাবি-দাওয়া আদায় ছাড়াই আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলো, তা হলে সেই আন্দোলন কোথায়? ২৪ ডিসেম্বর সেনাবাহিনী নামার পরও প্রার্থীরা আক্রান্ত হচ্ছিল, তখন কেন কোনো কর্মসূচি দেওয়া হলো না? কেন ৩০০ প্রার্থী নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করলেন না?। এ ধরনের গণশুনানি জনসমক্ষে করতে হবে। পাশাপাশি ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাতে আন্দোলন করতে হবে। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য কর্মসূচি দিতে হবে। এ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। গণশুনানির শুরুতে চকবাজারে আগুনে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এ ছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোকপ্রস্তাব পাঠ করেন।

গণশুনানির শুরুতে ড. কামাল হোসেন বলেন, তারা বিচারক নন। বিচার করার ক্ষমতা তাদের নেই। বিচার হবে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে। ৮ ঘণ্টা শুনানি শেষে ড. কামাল বলেন, এ শুনানিতে আমরা বুঝতে পেরেছি, এটা (একাদশ সংসদ) কোনো নির্বাচন হয়নি। ৪২ জনের কথা শুনার পর আমরা বলতে পারি এটাকে নির্বাচন বলা যায় না, এটাকে বলা যেতে পারে সরকার একটা প্রহসন করেছে, দেশের নাগরিকদের তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন, সংবিধান অমান্য করেছে, গণতন্ত্রের মূলনীতির প্রতি অবমাননা করেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আজকে অনেকে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির কথা বলেছেন। এটা একটি ন্যায্য দাবি। আমি অবিলম্বে তার মুক্তির দাবি করছি। এই গণশুনানিতে মির্জা ফখরুল ও ড. আবদুল মঈন খান ছাড়া স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যই ছিলেন না।

বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাদের কাউকে দেখা যায়নি। ২০-দলীয় জোটের প্রধান সমন্বক অলি আহমেদসহ শরিক নেতাদের অধিকাংশই ছিলেন না। গণশুনানি পরিচালনা করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সালাম, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রমুখ। রেজা কিবরিয়া (হবিগঞ্জ-১) অভিযোগ করে বলেন, সাদা পোশাকে তার কর্মীদের তুলে নেওয়া হয়। দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন এক নেতাকে বাড়িতে পায়নি, তার ১৬ বছরের ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে। বলেছে, ‘তোর বাপ এলে তোকে ছাড়ব’।

নির্বাচনের আগের রাতে প্রায় ২০টা ফোন এলো ভোট তো অর্ধেক হয়ে গেছে। রুমানা মাহমুদ (সিরাজগঞ্জ-২) অভিযোগ করেন, তার প্রচার মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। গুলিতে তার কর্মী মেরী বেগমের দুই চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বক্তব্য রাখার সময় তিনি মেরী বেগমকে নিয়ে মঞ্চে ওঠেন। পুলিশের গুলিতে দুই চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়া মেরি বেগম তার অবর্ণনীয় ঘটনা তুলে ধরেন। পুরো মিলনায়তনের প্রার্থী-সমর্থকরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। মঞ্চে বসা ড. কামাল হোসেনসহ অন্যদের চোখও অশ্রুসজল দেখাচ্ছিল। মেরী বেগম বলেন, ১৪ ডিসেম্বর পুলিশ আমাকে গুলি করবে, এটা আমার কল্পনার বাইরে। সেই দৃশ্য আমাকে ক্ষণে ক্ষণে কাঁদাচ্ছে, এ দৃশ্য আমি এখনো ভুলতে পারি না। আমার একটা কথা দেশবাসীর কাছে, চোখ হারিয়েছি আমার দুঃখ নাই। কিন্তু সবচেয়ে বড় দুঃখ যে, আমি ৩০ তারিখে ভোট দিতে পারি নাই। যখন শুনছি ২৯ ডিসেম্বর রাত ১২টায় ভোট শেষ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কষ্ট হয়েছে তখন। আমি দাবি জানাতে চাই, আমি ভোট দিতে চাই, আমাকে ভোট দিতে দেন নইলে আমার দুই চোখ ফেরত দেন।

কুঁড়ি সিদ্দিকী (টাঙ্গাইল-৮) বলেন, এবার বাংলাদেশে ভোট হয়েছে ৩০ ডিসেম্বর ভোটের আগের দিন। অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (যশোর-৩) বলেন, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা ও প্রচারের মাইক ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমরা ওপর তিন দফা বোমা হামলা, গুলিবর্ষণ ও আমার গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। ভোটের দিনও আমার গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে, আমি আহত হয়েছিলাম। তারপরও মাঠ ছাড়িনি। ২০ ডিসেম্বরের পর ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত তার এলাকার ১৩টি মামলায় নাম উল্লেখপূর্বক ১ হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়, সহ¯্রাধিক অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। আমার প্রধান নির্বাচনী এজেন্টকে আসামি করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২৫ ডিসেম্বরের পর আমার পাশে কার্যত কোনো নেতাকর্মী থাকতে পারেনি।

এরকম অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে আমি ভোটযুদ্ধে মাঠে ছিলাম। আসাদুল হাবিব দুলু (লালমনিরহাট-৩) বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ভোট ডাকাতির চিত্র একই রকম। নির্বাচন ৩০ তারিখ হয়নি, এর আগের দিন রাতেই হয়েছে। আমার এলাকায় ভোটের আগের দিন রাত একটা থেকে ব্যালট নিয়ে সিল মেরেছে। এর চিত্র আমার কাছে আছে, আমার মোবাইলে এর ভিডিও ক্লিফ আছে। কেন্দ্র উল্লেখ করে রিটার্নিং অফিসারকে আমি জানিয়েছি কোন কোন কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারের কাছ থেকে জোর করে ব্যালট নিয়ে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করেছে। পরবর্তীতে রিটার্নিং অফিসার যে ফল দেখিয়েছে তাতে ৭টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট দিয়েছে। এক লোক আমাকে বলল, ভাই আমার মৃত বাবাও নাকি কালকে জীবিত হয়েছেন। আর ২৩টি কেন্দ্রে ৯৫ ভাগ ভোট দেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবসম্মত কিনা। হাবিবুর রহমান হাবিব (পাবনা-৪) বলেন, আসুন আমরা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করি এবং রাজপথে জীবন দেব এর বাইরে কিছু হতে পারে না। জয়নুল আবদিন ফারুক (নোয়াখালী-২) বলেন, আমি সব কিছু ভুলতে পারি, আমি সব কিছু। কিন্তু আমার মাকে (খালেদা জিয়া) মুক্ত করার জন্য আপনারা কেন কর্মসূচি দিচ্ছেন না।

কেন ৩১ ডিসেম্বর প্রোগ্রাম দেওয়া হলো না? সব নেতাকর্মী উজ্জীবিত ছিল। আমি বিনয়ের সঙ্গে মহাসচিবকে বলতে চাই, আর সহ্য হচ্ছে না মাননীয় মহাসচিব। শেষ প্রস্তাব দিয়ে যাই, আজকে গণশুনানি। প্রয়োজনে কৌশলে আমরা কোথাও ভুল করেছি কিনা দলের জন্য একটু শুনানি করা প্রয়োজন। চোরের গল্প শুনিয়ে বলেন, সব নিয়ে চোর চলে গেল দেখি না আর শেষ হয় না। ড. কামাল হোসেনের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনার ওপর আমাদের তৃণমূল নেতাকর্মীদের অনেক আাশা ছিল। এত আশা আমি করেছি ব্যক্তিগতভাবে। মনিরুল হক চৌধুরীও (কুমিল্লা-১০) জোরালো কণ্ঠে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে নেতৃত্বকে অনুরোধ জানান। জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রবের স্ত্রী তানিয়া রব বলেন, নির্বাচন চলাকালীন কোনো কারণ ছাড়াই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইকবাল সিদ্দিকী (গাজীপুর-৩) বলেন, আমার নিজের নামের স্কুলের কেন্দ্রের সিসি ক্যামেরা রিটার্নিং অফিসার খুলে ফেলেছেন। আমি বিশ্বাস করি ২৯ ডিসেম্বর শতভাগ কেন্দ্রেই ব্যালট পেপারে সিল করে ভোট বাক্সে ফেলা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আমসা আমিন (কুড়িগ্রাম-২) বলেন, ভোট কারচুপির জঘন্যতম কাজটি করেছে ভোটের আগের দিন রাতে।

সুব্রত চৌধুরী (ঢাকা-৬) বলেন, ৯৮টি কেন্দ্রের কোথাও তার এজেন্টদের প্রবেশ করতে দেয়নি। এটা নির্বাচন হয়নি, ভোট ডাকাতি হয়েছে।

গণশুনানিতে একই ধরনের অভিযোগ এনে প্রার্থীদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন নিতাই রায়চৌধুরী (মাগুরা-২), মিজানুর রহমান মিনু (রাজশাহী-২), জয়নুল আবেদীন ফারুক (নোয়াখালী-২), নির্বাচনের সময়ে কারাগারে থাকা মনিরুল হক চৌধুরী (কুমিল্লা-১০), ফজলুর রহমান (কিশোরগঞ্জ-৪), নির্বাচনের সময়ে কারাগারে থাকা খায়রুল কবির খোকন (নরসিংদী-১), শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী (লক্ষ্মীপুর-৩), সাবিনা ইয়াসমীন ছবি (নাটোর-২), আনিসুর রহমান তালুকদার (মাদারীপুর-৩), মাহমুদুল হক রুবেল (শেরপুর-৩), আবুল হোসেন খান (বরিশাল-৬), ডা. শাহাদাত হোসেন (চট্টগ্রাম-৯), শামা ওবায়েদ (ফরিদপুর-২), সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল (নরসিংদী-৪), নজরুল ইসলাম আজাদ (নারায়ণগঞ্জ-২), হাবিবুল ইসলাম হাবিব (সাতক্ষীরা-১), আখতারুজ্জামান খান (দিনাজপুর-৪), সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (ঢাকা-১৪), শাহজাহান চৌধুরী (কক্সবাজার-৪), রুহুল আমিন দুলাল (পিরোজপুর-৩), শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন (জামালপুর-৫), সাইফুল ইসলাম ফিরোজ (ঝিনাইদহ-৪), সাইফুল ইসলাম (রংপুর-৬) জেএসডির সাইফুল ইসলাম (কিশোরগঞ্জ-৩), মোস্তফা মহসিন মন্টু (ঢাকা-৭), অধ্যাপক আবু সাইয়িদ (পাবনা-১), এসএম আকরাম (নারায়ণগঞ্জ-৫), নুরুর রহমান জাহাঙ্গীর (বরিশাল-৪), মোস্তাফিজুর রহমান ইরান (পিরোজপুর-২), আহসান হাবিব লিংকন (কুষ্টিয়া-২), নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেও পরে আদালত কর্তৃক বাদ পড়া খোন্দকার আবু আশফাক (ঢাকা-১) বক্তব্য রাখেন।