ইতিহাসের বর্বরোচিত গণহত্যা

0
25

২৫ মার্চের ভয়াল কালরাত আজ ভয়াল ২৫ মার্চ, জাতীয় গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে মধ্যরাতে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের পূর্বপরিকল্পিত অপারেশন সার্চলাইটের নীলনকশা অনুযায়ী আন্দোলনরত বাঙালিদের কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার ঘৃণ্য লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরোচিত ও নিকৃষ্টতম গণহত্যা শুরু করে। একাত্তরের ২৫ মার্চের গণহত্যা শুধু একটি রাতের হত্যাকা-ই ছিল না, এটা ছিল মূলত বিশ্বসভ্যতার জন্য এক কলঙ্কজনক জঘন্যতম গণহত্যার সূচনামাত্র। বিস্তারিত জানাচ্ছেনÑ শামস বিশ্বাস কালরাত : ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমিয়ে দেওয়ার জন্য অপারেশন সার্চলাইট নামে একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দেশের প্রধান শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযান শুরু করার আগে বিদেশি সাংবাদিকদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। বাঙালিদের ওপর আক্রমণের পর গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ঢাকায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানে অন্তত ৫০ হাজার বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারায়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ২৫ মার্চের সংবাদ : বিশ্বের ইতিহাসে যত গণহত্যার ঘটনা আছে, নির্বিচারে অসহায় মানুষ হত্যার জঘন্য নজির আছে, তার মধ্যে ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ কতটা বর্বর ছিল, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সেই সময়ে প্রকাশিত খবরে তার বিবরণ পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক নির্মম গণহত্যার সংবাদ ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থেকে গেছে আন্তর্জাতিক গণমাধমে। দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ (যুক্তরাজ্য), দ্য টাইমস (যুক্তরাজ্য), দ্য সানডে টাইমস (যুক্তরাজ্য), নিউইয়র্ক টাইমস (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), দ্য নিউ নেশন (সিঙ্গাপুর), অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসসহ আরও কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে। ৪৮ বছর আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের চেহারা আজকের মতো ছিল না। বিদেশের খবর সংগ্রহ করে তা প্রকাশে দু-তিন দিন লেগে যেত। সেই সময় ২৫ মার্চের কালরাতের খবর ২৭ মার্চ থেকে শুরু করে এপ্রিল, মে ও জুন পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে। ২৫ মার্চে ঢাকায় অবস্থানকারী বিদেশি সাংবাদিকদের বাইরে বের হওয়ার নিষেধাজ্ঞা জারি করে পাকিস্তান সরকার। তখন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আরও কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে ছিলেন টেলিগ্রাফের সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা নিয়ে ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ তার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় টেলিগ্রাফে। খবরের শিরোনাম ছিল ‘ঞঅঘকঝ ঈজটঝঐ জঊঠঙখঞ ওঘ চঅকওঝঞঅঘ : ৭,০০০ ংষধঁমযঃবৎবফ, যড়সবং নঁৎহবফ’। সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদন শুরুতে লেখেনÑ ‘ঢাকা আজ এক বিধ্বস্ত ও ভয়ার্ত শহরের নাম। পাকিস্তানি বাহিনীর ঠা-া মাথায় ২৪ ঘণ্টার নির্মম গুলিবর্ষণে সাত হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছে বিশাল এলাকা এবং স্বাধীনতার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের সংগ্রামের নির্মম পরিণতি ঘটেছে।’ মূলত এই প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে পাকিস্তানের চালানো গণহত্যার খবর প্রথম জানতে পারে বিশ্ববাসী। বাংলাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতি নিয়ে ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ দ্য টেলিগ্রাফ সম্পাদীয়সহ চারটি সংবাদ প্রকাশ করে। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ টাইমসে গণহত্যার সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ প্রতিবেদনের শুরুতে লেখা হয়, ‘দুই দিন, দুই রাত ধরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোলাবর্ষণে শুধু ঢাকা শহরেই মারা গেছে সাত হাজারের বেশি মানুষ। আমেরিকার সরবরাহ করা এম-২৪ ট্যাংক, আর্টিলারি ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই বৃহস্পতিবার রাতে হামলা চালায়, শহরের বিশাল অংশ ধ্বংস করে দেয়।’ ২৫ মার্চের গণহত্যা নিয়ে টাইমসের দ্বিতীয় প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় এপ্রিলের ২ তারিখে। সাংবাদিক লুইস হেরেনের প্রতিবেদনটির শুরুতে বলা হয়Ñ ‘পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে। এর উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে শেষ করা, যা ভালোভাবেই সম্ভব হাসিল হয়েছিল।’ ২৮ মার্চ নিউইয়র্ক টাইমস তিনটি সংবাদ প্রকাশ করে। সংবাদগুলোর শিরোনাম ছিলÑ ‘অৎসু বীঢ়বষং ৩৫ ভড়ৎবরমহ হবংিসবহ ভৎড়স চধশরংঃধহ’, ‘অৎঃরষষধৎু ঁংবফ’ ও ‘ঞড়ষষ পধষষবফ যরময’। বাংলাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতি নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস ২৯ মার্চ একটি সংবাদ প্রকাশ করে। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সাহায্য করলেও দেশটির সংবাদপত্রে বর্বরতার এই চিত্র ফুটে ওঠে। ২৫ মার্চের গণহত্যার খবর গুরুত্বসহকারে উঠে আসে অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের লেখা প্রতিবেদনে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন তিনি বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা ও অন্যান্য ঘটনা পর্যবেক্ষণপূর্বক বিশ্ববাসীর কাছে সর্বপ্রথম উন্মোচিত করেন। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে লেখেন, যা বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করে তুলতে সাহায্য করেছিল। পাকিস্তানের পক্ষে যায় এমন সংবাদ তৈরির উদ্দেশ্যে এপ্রিল মাসে পাকিস্তান থেকে মর্নিং নিউজ (পাকিস্তান) পত্রিকার সহকারী সম্পাদক মাসকারেনহাসসহ আটজন সাংবাদিককে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল। গণহত্যা নিয়ে সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে তাকে পাকিস্তান ছাড়তে হয়। ১৮ মে তিনি লন্ডনে চলে যান। তিনি সান ডে টাইমসের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনা তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশের আগ্রহ প্রকাশ করলে পত্রিকাটি তা গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালের ১৩ জুন সানডে টাইমসের প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম গণহত্যার খবর সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরবর্তীকালে বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সান ডে টাইমসের প্রথম পাতায় প্রকাশিত অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘জেনোসাইড’। প্রতিবেদনের শুরুতে তিনি লেখেন, ‘মার্চ মাসের শেষ দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তানের হাজার হাজার নিরীহ মানুষ মারছে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনারা।’ এ প্রতিবেদন বিশ্ববাসীর নজরে আসে এবং পাকিস্তানের চালানো গণহত্যা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পায় কূটনৈতিক বিশ্ব। ‘উঊঈঈঅ ইজঊঅকঝ ডওঞঐ চঅকওঝঞঅঘ’ শিরোনামে ২৭ মার্চ একটি খবর প্রকাশ করে অস্ট্রেলিয়ার দি এজ পত্রিকা। বাংলাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতি নিয়ে দি এজ চারটি সংবাদ প্রকাশ করে। ২৯ মার্চ সিডনি মর্নিং হেরাল্ড এ বিষয়ে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। এপ্রিলের ৬ তারিথে সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত দ্য নিউ নেশন পত্রিকায় বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা নিয়ে একটি সম্পাদকীয় ছাপা হয়। যার শিরোনাম ছিল, ‘পূর্ব পাকিস্তানে চলমান এই হত্যাযজ্ঞ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’ বুদ্ধিজীবীদের হত্যাযজ্ঞ : ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার সঙ্গে একসঙ্গেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা অপারেশন চলাকালীন খুঁজে খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে ২৫ মার্চের রাতেই হত্যা করা হয়। তবে পরিকল্পিত হত্যার ব্যাপক অংশটি ঘটে যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র দুদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর। যুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের প্রশিক্ষিত আধা সামরিক বাহিনী আলবদর ও আলশামস বাহিনী একটি তালিকা তৈরি করে, যেখানে এসব স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ধারণা করা হয়, পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে এ কাজের মূল পরিকল্পনাকারী ছিল মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি। কারণ স্বাধীনতার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত বঙ্গভবন (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হাউস) থেকে তার স্বহস্তে লিখিত ডায়েরি পাওয়া যায়, যাতে অনেক নিহত ও জীবিত বুদ্ধিজীবীর নাম পাওয়া যায়। ২৫ মার্চের গণহত্যার (অপারেশন সার্চলাইট) প্রথম পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষককে হত্যা করা হয়। অধ্যাপক ফজলুর রহমান এবং তার দুই আত্মীয় নীলক্ষেতের ২৩ নম্বর ভবনে নিহত হন। তার স্ত্রী দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে বেঁচে যান। পাকিস্তানি বাহিনী অধ্যাপক আনোয়ার পাশা ও অধ্যাপক রশিদুল হাসানের (ইংরেজি বিভাগ) বাসভবন আক্রমণ করে। তারা দুজনেই খাটের নিচে লুকিয়ে বেঁচে যান, কিন্তু পরবর্তী সময়ে আলবদর বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান। ২৪ নম্বর ভবনে বাংলা সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম থাকতেন। তার বাসভবনের প্রবেশমুখে দুজন আহত নারী তাদের সন্তানসহ কিছুক্ষণের জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের রক্তের দাগ লেগে ছিল মাটিতে। পাকিস্তানি বাহিনী যখন তার বাসভবন আক্রমণের জন্য আসে, তখন তারা রক্তের দাগ দেখে ধারণা করে নেয় অন্য কোনো ইউনিট হয়তো এখানে কাজ সমাধা করে গেছে, তাই তারা আর প্রবেশ করেনি। এভাবে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম নিতান্ত ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। ১২ নম্বর ফুলার রোডের বাসভবনে পাকিস্তানি আর্মি সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সায়েদ আলী নোকির বাসায় যায়। আর্মি তাকে ছেড়ে দিলেও ওই একই ভবনের ভূ-তত্ত্ববিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল মুক্তাদিরকে হত্যা করে। তার মতদেহ শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে (তদানীন্তন ইকবাল হল) পাওয়া যায়। পরে তার আত্মীয়েরা তাকে পল্টনে সমাহিত করেন। ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ক ম মুনিম, যিনি সেই সময় সলিমুল্লাহ হলের হাউস টিউটরের দায়িত্বে ছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে আহত হন। ঢাকা হলের গণিত বিভাগের অধ্যাপক আর খান খাদিম ও শরাফত আলীকে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনী জগন্নাথ হলে শিক্ষক নিবাসে আক্রমণ করে এবং অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মির্জা হুদা ও ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মফিজুল্লাহ কবিরকে লাঞ্ছিত করে। তৎকালীন হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাত্রদের আবাস জগন্নাথ হল আক্রমণের সময় হলের প্রভোস্টের বাসাও আক্রমণ করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনী ভূতপূর্ব-প্রভোস্ট এবং জনপ্রিয় শিক্ষক, দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক জিসি দেবকে হত্যা করে, সঙ্গে তার মুসলিম দত্তক কন্যার স্বামীকেও। এর পর পাকিস্তানি বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী বাসভবনে আক্রমণ করে এবং সেখানে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামানকে তার পুত্র ও আত্মীয়সহ হত্যা করে। জগন্নাথ হলে প্রভোস্ট অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে মারাত্মকভাবে আহত হন এবং পরে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার সঙ্গে অধ্যাপক মনিরুজ্জামানকেও রাখা হয় এবং পরে হত্যা করা হয়। সহযোগী হাউস টিউটর অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকেও ছাত্রাবাসেই হত্যা করা হয়। অধ্যাপক আনোয়ার পাশার উপন্যাস ‘রাইফেল, রোটি, অওরাত’ থেকে এ তথ্য জানা যায়। অধ্যাপক পাশা পরবর্তী সময়ে ডিসেম্বরে আলবদর বাহিনীর হাতে নিহত হন। তিনি তার এই জনপ্রিয় উপন্যাসটি ১৯৭১-এর যুদ্ধকালীন নয় মাসে রচনা করেন। ছাত্রহত্যা : অসহযোগ আন্দোলন মূলত গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের (তদানীন্তন ইকবাল হল) ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন পরিষদ’কে কেন্দ্র করে। তাই পাকিস্তানি বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম লক্ষ্য ছিল এ হলটি। অধ্যাপক ড. ক ম মুনিমের মতে, এ হলের কমবেশি ২০০ জন ছাত্রকে পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করে। রাত ১২টার পর পাকিস্তানি সেনারা জগন্নাথ হলে প্রবেশ করে এবং প্রথমে মর্টার আক্রমণ চালায়, সেই সঙ্গে চলতে থাকে অবিরাম গুলি। তারা উত্তর ও দক্ষিণের গেট দিয়ে ঢুকে নির্বিচারে ছাত্রদের হত্যা করতে থাকে। সেই আঘাতে ৩৪ জন ছাত্র প্রাণ হারান। জগন্নাথ হলের কয়েকজন ছাত্র রমনা কালীবাড়ির বাসিন্দা ছিলেন। সেখানে পাঁচ-ছয়জনকে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে কেবল একজনের নাম পরবর্তীকালে জানতে পারা যায়। ছাত্রদের কাছে আসা অনেক অতিথিও এ সময় প্রাণ হারান। তৎকালীন ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাডের বই ‘দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ থেকে জানা যায়, ছাত্রীনিবাস রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং ছাত্রীরা আগুন থেকে বাঁচতে হলের বাইরে আসা শুরু করলে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। পাকিস্তানি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে আর্মি ইউনিট ৮৮-এর কথোপকথন থেকে জানা যায়, আনুমানিক ৩০০ ছাত্রীকে সে সময় হত্যা করা হয়। ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক অপারেশন সার্চলাইটে নিহত ও আক্রান্তদের স্মরণে ২০১৭ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ১৪৭ বিধির আওতায় ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব আনেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সংসদ সদস্য শিরীন আখতার। পরে সংসদ কক্ষে রাখা বড় পর্দায় একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার বিভিন্ন চিত্র, ভিডিও দেখানো হয়। শরণার্থীদের দেশত্যাগ ও হত্যাকা-ের ছবি দেখানো হয়। এই আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বের যত গণহত্যা হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশের ২৫ মার্চের হত্যাকা- ছিল সবচেয়ে মর্মান্তিক। এদিন জাতীয় সংসদে সরকার ও সংসদে বিরোধী দলের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রস্তাবটির ওপর দীর্ঘ ৪ ঘণ্টার সাধারণ আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় অর্ধশত সংসদ সদস্য অংশ নেন। সংসদের তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা রওশান এরশাদ বলেন, ২৫ মার্চের হত্যাকা-ের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিকে মেধাশূন্য করা। এ ছাড়া দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যা’ দিবস হিসেবে পালনের জন্য জাতিসংঘে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরে প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম উল্লেখ করেন। সংসদে দীর্ঘ সময়ের আলোচনায় প্রত্যেক সংসদ সদস্যই ২৫ মার্চকে জাতীয় গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তবে শিরীন আখতারের প্রস্তাবের ওপর সামান্য সংশোধনী আনেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার জন্য যে কোনো সংসদ সদস্য ১৪৭ বিধিতে প্রস্তাব আনতে পারেন। বাংলাদেশে দিবস পালন সাধারণত সরকারের নির্বাহী আদেশে হয়ে থাকে। কিন্তু ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস পালনের বিষয়টি আইনে পরিণত করার জন্যই সংসদের মাধ্যমে এ প্রস্তাব আনা হয়েছে বলে এর আগে তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মোজ্জামেল হক গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।