এই মানসিক আঘাত থেকে বের হতে সময় লাগবে : তামিম

12

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি ওভালে মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার অভিজ্ঞতা হামলা ভুলতে কিছুদিন সময় লাগবে বলে জানান বাংলাদেশ দলের ওপেনার তামিম ইকবাল। শনিবার দেশের উদ্দেশ্যে নিউজিল্যান্ড ছাড়ার আগে বিমান বন্দরে এ কথা বলেন তামিম।

তিনি বলেন, ‘যে ভয়ংকর ও দু:খ জনক অভিজ্ঞতা হলো সেই এই মানসিক আঘাত থেকে বের হতে আমাদের কিছু দিন সময় লাগবে। তবে এটা ভালো যে, পরিবারের কাছে যাচ্ছি। কারন সবারই পরিবার চিন্তিত। আশা করবো আমি কেবল আশা করব দেশে ফিরে সময় গড়ানোর সাথে সাথে যেন এই দু:স্মৃতি ভুলতে পারি।’

শুক্রবার স্থানীয় সময় বেলা দেড়টায় হ্যাগলি ওভালের আল নূর মসজিদে গুলিবর্ষণ করেন অস্ট্রেলিয়ান বংশোদ্ভূত ব্রেন্টন ট্যারেন্ট নামে এক সন্ত্রাসী। অনুশীলন শেষ করে ওই সময় ওই মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য যাচ্ছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলোয়াড়রা। কিন্তু স্থানীয়দের কাছ থেকে সন্ত্রাসী হামলার কথা শুনে আতঙ্কিত হয়ে মসজিদে না গিয়ে স্টেডিয়ামে ফিরে যান খেলোয়াড়রা। পরবর্তীতে জানা যায়, সন্ত্রাসীর হামলায় প্রায় অর্ধশত নিহত ও ২০জন আহত হয়।

এই ভয়ংকর সন্ত্রাসী হামলার পর বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার তিন ম্যাচের শেষ টেস্টটি বাতিল ঘোষনা করা হয়। আজ থেকে টেস্টটি শুরু হবার কথা ছিলো। তাই সফর শেষ না করে শান্তির দেশ থেকে অশান্তির স্মৃতি নিয়ে নিজে ভূমিতে ফিরছেন মাহমুদুল্লাহ-তামিমরা।

নিউজিল্যান্ডের মসজিদে সিনেমা স্টাইলে হামলা চালিয়ে ৪৯ মুসল্লিকে হত্যাকরা কট্টর ডানপন্থী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ক্রাইস্টচার্চে যে মসজিদে কাল সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, সেখানে জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। বাংলাদেশ দল নিরাপদে ফিরতে পারলেও হামলায় নিহত মানুষের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। এর মধ্যে তিনজন বাংলাদেশিও রয়েছেন। বাংলাদেশ দলের বাস আর পাঁচ মিনিট আগে মসজিদে পৌঁছালেই সর্বনাশ হতো। কারণ, ক্রিকেটাররা তখন সন্ত্রাসী হামলার সময় মসজিদের ভেতরেই থাকতেন। তাহলে কী হতে পারত, আর যা দেখেছেন—দুটি মিলিয়ে বাসের মধ্যে দলের অনেকেই অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন। বাসে থাকা মুমিনুল হক তখনকার ভয়ানক পরিস্থিতি খুলে বলেছেন সংবাদমাধ্যমকে। তার মুখেই শুনুন—

‘আমরা মধ্যাহ্নভোজ সেরে বের হয়েছিলাম। অনুশীলন ছিল ২টায়। দেড়টায় যাওয়ার কথা ছিল। (মাহমুদউল্লাহ) রিয়াদ ভাইয়ের সংবাদ সম্মেলনের জন্য একটু দেরি হয়েছে। মিনিট দশেক পর বের হয়েছি। মুশফিক ভাই, তাইজুল ও আমি মাঝে-মাঝে ড্রেসিং রুমে ফুটবল খেলি নিজেদের মধ্যে। এতে আরও দুই-এক মিনিট দেরি হয়েছে। মসজিদে পৌঁছানোর পর দেখি সবাই পরে আছে। ফোনে ব্যস্ত এক মহিলা বের হয়ে এসে ভেতরে যেতে নিষেধ করলেন। গাড়ি থেকে আরেক মহিলা চিৎকার করে একই কথা বললেন, ভেতরে যেও না, কে যেন গুলি করছে। আমরা তখনই বুঝে ফেলি কেমন পরিস্থিতি।’

‘আমরা বাসের মধ্যে পাঁচ-দশ মিনিট বসে ছিলাম। তখন পাইলট ভাই (ম্যানেজার) ফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলছিলেন। পেছন থেকে তামিম ভাই এলেন, আমরা বাসের ড্রাইভারকে জানালা খুলতে বলি। দেখলাম বেশ কিছু লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমরা বাসের পেছনের দরজা খুলে পার্কের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলে আসি। আমরা পাঁচ মিনিট আগে মসজিদে পৌঁছালে ভেতরে থাকতাম এবং সবাই শেষ হয়ে যেতাম। পরম করুণাময়ের অশেষ রহমত যে পাঁচ মিনিট দেরিতে পৌঁছেছি।’

‘মসজিদে গেলে আমরা পেছনের দিকেই বসতাম এবং সে আমাদের কাউকে জীবিত রাখত না। কোনো বাছবিচার ছাড়াই টানা গুলি করেছে। আমরা এত ভয় পেয়েছি যে বাসের মধ্যেই কেঁদেছি। এই ঘটনার মধ্যে আমরা বাস পেছাতে বলেছি ড্রাইভারকে। কিন্তু ড্রাইভার বলেছে তা সম্ভব না, এ ধরনের কোনো নির্দেশ নেই। আমি মুশফিক ভাইয়ের সাথে সম্ভবত দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সারিতে ছিলাম। বাস থেকে দেখেছি, মসজিদ থেকে সবাই বের হয়ে আসছেন এবং মেঝেতে পড়ে যাচ্ছেন। তাদের শরীর ছিল রক্তমাখা। এর আগে ক্রাইস্টচার্চে থাকতে আমরা এই মসজিদেই নামাজ পড়েছি।’

‘কাল রিয়াদ ভাই জানতে চেয়েছিলেন, নামাজ পড়ে খাব, নাকি খেয়ে নামাজ পড়তে যাব? আমরা সিদ্ধান্ত নিই অনুশীলন যেহেতু জুমার পর, তাই নামাজ পড়ে এসেই খাব। কিন্তু কোনোভাবে সিদ্ধান্তটা পাল্টে যায়, আমরা খেয়ে মসজিদে গিয়েছি এবং এ কারণেই হয়তো বেঁচে যাই। আমরা কী পরিমাণ ভীত ছিলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। নিজের চোখে এসব দেখতে কেমন লাগে, তা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।’

‘শুধু ভীত হয়ে পড়ার জন্যই আমরা কেঁদেছি। আসলে আমরা বেঁচে গেছি গাড়ির ভেতরে থাকা সেই মহিলার জন্য, যিনি আমাদের মসজিদের ভেতরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। প্রথম মহিলা বলার পর আমরা ভেবেছি তিনি অসুস্থ। কারণ নিউজিল্যান্ডে এমন কিছু ঘটতে পারে, আমাদের বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু গাড়ির মহিলা জানালা দিয়ে সাবধান করে দেয়ার সাথে জানান, তার গাড়িতেও বুলেট লেগেছে—ঠিক তখনই আমরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরেছি।’