এভাবে আর কত বেঁচে মরে থাকি!

0
13

ছোটবেলায় পড়েছিলাম, ‘অন্যায় যে করে অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে’। পরীক্ষায় ভাবসম্প্রসারণ আসত। আমরা লিখতাম, অন্যায়কে সহ্য করা, প্রতিবাদ না করাটাও অন্যায়। তাতে অন্যায় বাড়তে থাকে। পরীক্ষার পরই আমরা ভুলে যেতাম সব। অন্যায় দেখে চুপচাপ মেনে নেওয়া, গা বাঁচিয়ে চলাটাকেই অভ্যাস করে নিয়েছি। প্রতিবাদ না করার যুক্তিটাও অকাট্য। উত্তরটা আগেভাগেই তৈরি। কী দরকার আগ বাড়িয়ে বিপদ বাড়ানোর? জানি তো লাভ হবে না।

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান আমাদের মতো ছিলেন না। তিনি হয়তো রবি ঠাকুরের কবিতা মনে মনে ধারণ করেছিলেন। কেবল ভাবসম্প্রসারণ লেখার জন্যই কবিতাটা পড়েননি। মনে মনে শপথ নিয়েছিলেন। অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদ করবেন। ঝাঁপিয়ে পড়বেন। প্রতিকার হয় কি না, পরে দেখা যাবে। পবিত্র কোরআন বা হাদিসও তো তাঁকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে। সৎ পথে চলতে বলেছে।

ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা একা নন। হঠাৎ করে কেবল নুসরাতকেই তিনি হেনস্তা করেননি। বছরের পর বছর তিনি যৌন নিপীড়ন করে আসছেন। তাঁর মতো আরও অনেকেই ভদ্রবেশে সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মুখোশ পরা এসব লোককে ভণ্ডামি করতে দেওয়াই এখন রীতি। নুসরাত সেই রীতির বাইরে গিয়েছিলেন। আওয়াজ তুলেছিলেন। কিন্তু বেঁচে থাকতে কেউ তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি। না প্রশাসন, না পুলিশ, না বন্ধু, না প্রতিবেশী। মৃত্যুর পর নুসরাতের জানাজায় হাজার মানুষের ঢল নেমেছে। আহা, তারা যদি জীবদ্দশায় প্রতিবাদী নুসরাতের পাশে দাঁড়াত! তাহলে হয়তো মরতে হতো না নুসরাতকে। খাতায় লিখতে হতো না, ‘একলা চলো রে’।

নুসরাত তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর দশজনের মতো চুপ করে থাকেননি। প্রতিবাদী, সাহসী নুসরাতকে তাই আগুনে পুড়তে হয়েছে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে চরম যন্ত্রণায় কাতরাতে হয়েছে। আমাদের মতো মানুষের বোবা অভিব্যক্তি দেখতে হয়েছে। আমরা যে প্রতিবাদীর পাশেও দাঁড়াতে জানি না। কেবলই ফেসবুকে স্ট্যাটাস আর দু–একবার আফসোস। এ ছাড়া প্রতিবাদের আর কোনো ভাষা জানা নেই। বরং বলতে পারি, নুসরাত মরে বেঁচেছে।

অন্যদিকে অন্যায়কারী সিরাজ উদ দৌলার জন্য মানববন্ধন হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার পরও সিরাজ উদ দৌলাকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। আগুন দিয়ে নুসরাতকে হত্যাচেষ্টা মামলার এজাহার থেকে প্রথমে তাঁকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পথে নুসরাতকে বকাঝকা করত অধ্যক্ষের অনুগতরা। সে সময়ও কেউ প্রতিবাদ করেনি। যারা করেনি, তারাই বেশ ভালো আছে। নিরাপদে আছে।

এই নিরাপদে তো আমরা সবাই থাকতে চাই। সন্তানকেও রাখতে চাই দুধেভাতে। ছোটবেলায় মা তাই মেয়েকে বলে দেন, ‘বখাটেরা কেউ কিছু বললে ফিরেও তাকাবি না। কিছু বলার দরকার নেই। চুপ করে চলে যাবি।’ কজন বাবা ছেলেমেয়েকে শেখান, ‘কেউ বিপদে পড়লে দৌড়ে যাবি। তাকে সাহায্য করবি।’ বাবারা ছেলেকে বলেন, ‘বাবা ঝামেলায় যাবে না।’ মায়েরা মেয়েকে বলেন, ‘বেশি রাগ দেখাবি না। মেয়েদের অনেক বিপদ।’ ছোটবেলায় শোনা কথাগুলোই তো সত্যি।

পরোপকার, প্রতিবাদ, ন্যায়বিচার—এসব তো কেবলই কেতাবি কথা। নুসরাতরা এগুলো বাস্তবেও বিশ্বাস করেন। বিশ্বাস করেন বলেই তো তাঁদের আগুন পুড়তে হয়। আর সিরাজ উদ দৌলারা বহাল তবিয়তে পুলিশের নাকের ডগায় বছরের পর বছর অপরাধকর্ম চালিয়ে যান। তাই তো ছাত্রীদের শ্লীলতাহানি, আর্থিক দুর্নীতি এবং নাশকতা ও পুলিশের ওপর হামলা–মামলায় তিন দফা কারাভোগের পরও কেউ টুঁ শব্দটি করতে পারত না সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে। মাদ্রাসার আর সব ছাত্রী চুপ করে সয়েছে। সয়েছেন মাদ্রাসার অন্য শিক্ষকেরা। জেনেও না জানার ভান করেছে প্রশাসন। তাদের কারও ক্ষতি হয়নি। হলো কেবল প্রতিবাদী নুসরাতের। এই চুপ করে থাকাটাই কি তবে নিরাপদ?

নুসরাতের শিক্ষক ছিলেন সিরাজ উদ দৌলা। মাদ্রাসায় তাঁকে সবাই ‘হুজুর’ ডাকত। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর। কেউ খোঁজ রাখে না শিক্ষকের নৈতিকতাই টলমলে। সব জেনেও, সব বুঝেও চোখ–কান বুজে চলে সবাই। শিক্ষার্থীরা সিরাজ উদ দৌলার অধীন। মাদ্রাসায় তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য। তাই সুযোগ পেলেই ছাত্রীদের ওপর যৌন নিপীড়ন চলে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেওয়ার লোভও দেখানো হয়। এসব থেকে বাদ যাননি নুসরাতও। হেনস্তার পর নুসরাত প্রতিবাদ করেছিলেন। পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন। পরিবারকে জানিয়েছিলেন। যৌন নিপীড়নের অভিযোগে গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে মামলা করেন নুসরাতের মা। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করলেও পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। বরং মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ আসতে থাকে। মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় অধ্যক্ষের পক্ষের লোকজন পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতরেই নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। হামলাকারীদের চারজনই ছিল বোরকা পরা।

আগুন দেওয়ার ভয়ংকর ওই সময়েও নুসরাত কিন্তু দমেননি। বলেছিলেন, তিনি যে অভিযোগ করেছেন, তা সত্য এবং ‘শেষ নিশ্বাস’ পর্যন্ত তিনি এর প্রতিবাদ করবেন। এরপর ওই ছাত্রীদের কেউ তাঁর হাত, কেউ পা ধরে এবং গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারপর তো সবটাই যন্ত্রণার। সোনাগাজী থেকে ঢাকায় আসার পরও অগ্নিদগ্ধ নুসরাত চিৎকার করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করব।’

প্রতিবাদ করতে করতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন নুসরাত। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা নুসরাতের মুখ নিষ্পাপ। কাদাময় মানুষের থেকে মুখ ফিরিয়ে ঘেন্নায় যেন চোখ বুজেছেন তিনি। নুসরাতের সারা শরীরে ব্যান্ডেজ। ওই ব্যান্ডেজ তো বাংলাদেশের শরীরময়। বাংলাদেশই তো শুয়ে আছে হাসপাতালে। ঘুমিয়ে আছে। দাপুটে সিরাজ উদ দৌলারা ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। আমরাও তো ঘুমাচ্ছি। এমন ঘুমই তবে নিরাপদ? তবে তা–ই হোক। আমরা তবে বেঁচে মরে থাকি।

শুভা জিনিয়া চৌধুরী: সাংবাদিক