এ নেশা কেমন নেশা!

100
এমা ওয়াটসন
এমা ওয়াটসন

এমার তখন পুতুল খেলার বয়স। অভিনয় করতেন শিশুশিল্পী হিসেবে। স্কুলের ফাঁকে ছুটির দিনগুলোতে নানা জায়গায় অডিশন দিতেন। টিকে গেলে কাজ করতেন। এভাবে চলছিল তাঁর পড়ালেখা আর অভিনয়। কিশোরী এমার জীবন বদলে দিয়েছিল যে জাদুর পরশ, বলা বাহুল্য সেটি ছিল ‘হ্যারি পটার’। কিন্তু আসলেই কি তা-ই? অনেকেই মনে করেন, এই ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ না পেলে কিছুই হতো না মেয়েটার। সত্যিই কি তাই?

আসল ঘটনা অন্যখানে। অদ্ভুত এক নেশায় পেয়েছিল এমাকে। সেই নেশা কিন্তু অভিনয়ের নয়, জ্ঞানের নেশা। ক্যারিয়ারে ব্রেক পেয়ে পড়ালেখা থামিয়ে দেননি এমা ওয়াটসন। বরং হারমিয়ন গ্রেঞ্জারের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে এমন অবস্থা হলো যে, স্কুলে পড়া জিজ্ঞেস করলে সবার আগে এমার হাত উঠে যেত। ক্যারিয়ার যখন তুঙ্গে, পড়ালেখা থামিয়ে দেননি তিনি। বরং স্কুল এবং কাজের মধ্যে চমৎকার সমন্বয় করতেন। কাজের সময় কাজ, পড়ার সময় পড়া। ওই সময়টাকে অবশ্য যুদ্ধের মতো মনে হতো এমার। কাজের পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে তাঁকে।

‘হ্যারি পটার’ ছবির শুটিং চলাকালীন নিয়মিত পাঁচ ঘণ্টা করে পড়তেন এমা। সেটা অবশ্য যথেষ্ট ছিল না তাঁর জন্য। তার পরও নিজের জন্য সময় বের করে নিতেন তিনি। পরীক্ষার পর দেখা গেল, সব কটি বিষয়ে ‘এ’ গ্রেড পেলেন। হাইস্কুল শেষ করে ভর্তি হলেন ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে। শুরু হলো ক্লাস। এমা তখন এক সাধারণ ছাত্রী। অন্য আর দশটা শিক্ষার্থীর মতো পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন, রাতভর লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করেছেন, ফাস্ট ফুড খেয়েছেন দিনের পর দিন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের হকি দলেও খেলেছেন। শুধু ফিল্ড হকিই নয়; টেনিস, রাউন্ডার আর নেটবল ভালো খেলেন এমা।

একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের হকি দলের ১০০ জনকে দাওয়াত দিয়েছিলেন তিনি। আড্ডা আর খাওয়ানোই মূল উদ্দেশ্য ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল লোক সংগ্রহ করা। ক্যাম্পাসে একটা নাটক মঞ্চস্থ করতে চেয়েছিলেন তিনি। দুঃখের বিষয়, অডিশন নিতে গিয়ে দেখলেন, এদের দিয়ে হবে না। এমা ভেবেছিলেন, অভিনয়ের মানুষ হকি খেলতে পারলে, হকি খেলোয়াড়েরা অভিনয় করতে পারবে না কেন? সবাই তো আর তাঁর মতো অলরাউন্ডার নয়।

পরীক্ষার সময় আসে। অথচ শুটিং, সহকর্মীদের সঙ্গে দেশ-বিদেশ ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়েন এমা। কিন্তু এই ক্লান্তিকে পাত্তা দেননি তিনি। ভ্রমণ-অবসাদকে বাঁ হাতে সরিয়ে রেখে নিয়েছেন পরীক্ষার প্রস্তুতি। পড়াশোনা চলাকালীন ‘দ্য পার্কস অব বিয়িং এ ওয়ালফ্লাওয়ার’ এবং ‘দ্য ব্লিং রিং’ ছবি দুটো করে ফেললেন ছাত্রাবস্থায়। ‘হ্যারি পটার’ সিরিজের শেষ ছবির শুটিং চলছিল যখন, তখন তাঁর পড়ালেখার প্রায় শেষের পথে। এমা পরিচালককে অনুরোধ করলেন, তাঁর ক্লাসের সময়ে যেন শুটিং রাখা না হয়। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব নয়। এমা জানিয়ে দিলেন, দরকার হয় এ সিরিজে তিনি কাজই করবেন না আর। কিন্তু সেটা তো আর হয় না। এমাকে ছাড়া ‘হ্যারি পটার’ ভাবাই যায় না। জে কে রাউলিং নিজে যাকে পছন্দ করেছেন, তাঁর কথা না শুনে পারা যায়? এমা জানতেন, সিরিজের ওই ছবিটির জন্য তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পড়ালেখাকেই সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এমনকি পরিচালকেরা শেষ পর্যন্ত তাঁর শর্ত মেনে নিয়েছিলেন।

এমা ওয়াটসন এখন পূর্ণবয়সী অভিনেত্রী। অভিনয়ের পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন মানবিক কর্মকাণ্ডে। জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে লিঙ্গসমতা এবং শিক্ষার সম-অধিকার নিয়ে কাজ করছেন তিনি। শুরুতে অবশ্য ‘সমতা’ শব্দটার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না তিনি। যে সমাজে তিনি বড় হয়েছেন, সেখানে এই শব্দগুলো তেমন উচ্চারিত হয় না। ফলে নতুন করে পড়ালেখা শুরু করলেন তিনি। এ কাজের জন্য একটা বুদ্ধিও বের করলেন। চালু করলেন নিজের বুক ক্লাব ‘আওয়ার শেয়ারড শেলফ’। এ ক্লাবের সদস্য প্রায় ২ লাখ। এখান থেকে বই নিয়ে লোকে পড়ে এবং ‘লিঙ্গ সমতা’ নিয়ে আলোচনা করে। এভাবে সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জানাটা সহজ হয়ে যায় তাঁর জন্য।

এমার জীবনকাহিনি মনে করিয়ে দেয়, শেখার জন্য, বেড়ে ওঠার জন্য আসলে ব্যস্ততা কোনো বাধা হতে পারে না। কেননা এক অদ্ভুত নেশায় আসক্ত এমা। এ নেশা কেমন নেশা? এই অভিনেত্রী একবার বলেছিলেন, ‘আমি শিখতে ভালোবাসি। জ্ঞানের নেশা আছে আমার। এই নেশা আমাকে আনন্দে রাখে, আমাকে উজ্জীবিত রাখে।’

মার্কিন লেখিকা লুইজা মে অ্যালকটের বিখ্যাত উপন্যাস ‘লিটল উইমেন’ থেকে নির্মিত হচ্ছে চলচ্চিত্র। শুরুতে এতে অভিনয়ের কথা ছিল এমা স্টোনের। তাঁর বদলে এতে অভিনয় করছেন এমা ওয়াটসন। আগামী মাসে শুরু হচ্ছে ছবির শুটিং।

এমা অভিনীত গত বছরের ছবি ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’ সারা পৃথিবী থেকে আয় করে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।