কী হবে সাড়ে ৪ কোটি টাকার?

0
71

সৌদি আরবে পড়ে থাকা ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকার কী হবে
• মালয়েশীয় আইরিস করপোরেশনকে টাকা ফেরত দিতে হবে?
• অতিরিক্ত ৯ ডলার করে সার্ভিস চার্জ পাবে আইরিস করপোরেশন
সৌদি আরবে পড়ে থাকা রাষ্ট্রের ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকার এখন কী হবে? এই টাকা কি সৌদি আরবেই পড়ে থাকবে, না ঢাকায় ফেরত আনা হবে? নাকি মালয়েশীয় কোম্পানি আইরিস করপোরেশনকে ফেরত দিতে হবে? চার বছরেও এসব প্রশ্নের জবাব তৈরি করতে পারেনি সরকার।

Eprothom Aloঘটনাটি অবশ্য পাঁচ বছর আগের। সৌদি আরবে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) তৈরি করে দেওয়ার কাজ পায় মালয়েশীয় কোম্পানি আইরিস করপোরেশন। ২০১৪ সালের ১৪ জুন সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ১০৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের এ বিষয়ক প্রস্তাব অনুমোদন করে। অনুমোদনের শর্তে বলা হয়, পাসপোর্ট ফির বাইরে অতিরিক্ত ৯ ডলার করে সেবা মাশুল (সার্ভিস চার্জ) পাবে আইরিস করপোরেশন।

আইরিস করপোরেশন কাজ করে চলে গেছে চার বছর আগেই। কিন্তু পুরো পাওনা না নিয়েই কোম্পানিটি চলে গেছে। সেবা মাশুল হিসেবে তারা বাংলাদেশের কাছে পায় ১৯ লাখ ৭৭ হাজার ১৪০ সৌদি রিয়াল। প্রতি রিয়াল ২২ টাকা ৩৬ পয়সা দরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল, জেদ্দার নামে এই রিয়াল জমা রয়েছে। তাই এখন এ টাকার কী হবে, এ নিয়েই চলছে আলাপ-আলোচনা।

বিষয়টি প্রথম ধরা পড়ে স্থানীয়ভাবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের নিরীক্ষা আপত্তিতে। সেখানে বলা হয়, আইরিস করপোরেশনের আউটসোর্সিং ফি বাবদ যে রিয়াল জেদ্দায় আলাদা একটি হিসাবে গচ্ছিত রয়েছে, তা সরকারি কোষাগারে জমা পড়া আবশ্যক। নিরীক্ষায় এ-ও সুপারিশ করা হয়, আইরিস কোম্পানি পরে কখনো টাকা চাইলে তা পরিশোধ করতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে চার বছরে সাত দফা বৈঠক করেছে। সর্বশেষ গত বছরের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, পুরো ঘটনা জানতে মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়কে আরেকটি নিরীক্ষা চালাতে হবে। সেই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবেই দুই সদস্যের একটি নিরীক্ষা দল আগামী সপ্তাহে সৌদি আরব যাচ্ছে। দলটি প্রথমে সৌদি আরবের রিয়াদ ও পরে জেদ্দায় যাবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আরও ছয় দপ্তর। এগুলো হচ্ছে সিএজি কার্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, হিসাব মহা নিয়ন্ত্রকের (সিজিএ) কার্যালয় এবং বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সিএজি কার্যালয় সূত্রে এসব কথা জানা গেছে।

জানতে চাইলে সিএজি মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সৌদি আরবে একটি নিরীক্ষা দল যাচ্ছে। দলটির প্রতিবেদন থেকে বোঝা যাবে বাস্তবে ওখানে কী হয়েছিল। বিদেশে পড়ে থাকা সব অর্থই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।’

অর্থ মন্ত্রণালয় ২০১৪ সালের ২২ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেওয়া এক অনাপত্তিপত্রে উল্লেখ করে, সেবা মাশুল থেকে আদায় করা অর্থ করবহির্ভূত রাজস্ব (নন-ট্যাক্স রাজস্ব) হিসেবে বাজেটে দেখাতে হবে। আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তাদের পাওনা বাবদ যে অর্থ পরিশোধ করতে হবে, তা দেখাতে হবে ব্যয় হিসেবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ বলছে, আয়-ব্যয়ের হিসাব বাজেটে দেখাতে ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ দুটি অর্থনৈতিক কোড তৈরি করে। আবার নিরীক্ষার প্রয়োজনে আয়-ব্যয়ের সব তথ্য সংরক্ষণেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় এগুলো ঠিকঠাক পরিপালন করেনি।

পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে পাওয়া অর্থ বিভাগের এক কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, পুরো ঘটনা উদ্ধার করতে সৌদি আরবের জেদ্দা ও রিয়াদে কতগুলো পাসপোর্টের আবেদন পাওয়া গিয়েছিল, কতগুলো পাসপোর্ট সরবরাহ করা হয়েছে, পাসপোর্টপ্রতি কনস্যুলার ফি ও সেবা মাশুল বাবদ কত টাকা আদায় হয়েছে, আইরিস করপোরেশনকে কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আইরিস কাজ করেছে কি না-এসব জানা জরুরি বলে গত বছরের বৈঠকে সবাই একমত পোষণ করেন। জানা গেছে, অর্থ বিভাগ এক বছরেও এসব তথ্য কারও কাছ থেকে পায়নি।

প্রায় এক মাস হলো পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নতুন মহাপরিচালক (ডিজি) হয়ে এসেছেন মেজর জেনারেল মো. সোহায়েল হোসেন খান। তবে চিঠি চালাচালি ও সৌদিপ্রবাসীদের এমআরপি পাসপোর্ট দেওয়ার প্রায় পুরো সময়ে অধিদপ্তরের ডিজি ছিলেন মেজর জেনারেল মো. মাসুদ রেজওয়ান। আর আইরিস কাজ পাওয়ার সময় অধিদপ্তরের ডিজি ছিলেন আবদুল মাবুদ।

জানতে চাইলে মাসুদ রেজওয়ান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইরিস করপোরেশন চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ না করেই চলে গেছে। তারা সেবা মাশুলের একটি অঙ্ক পেতে পারে, তবে বাংলাদেশ সরকারও পাসপোর্ট ফি বাবদ তাদের কাছে ভালো অঙ্কের ডলার পাবে।’ সিএজি কার্যালয়ের যে তদন্ত দল সৌদি আরব যাচ্ছে, সেই দলটিকে যথাযথ সহায়তা করতে তিনি সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসকে অনুরোধ করেন।

সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের কনসাল জেনারেল, জেদ্দা এফ এম বোরহান উদ্দিনের কাছে গত ২৮ জানুয়ারি এক ই-মেইল বার্তায় পাসপোর্টের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের আবেদন, পাসপোর্ট সরবরাহের পরিমাণ, আইরিসের টাকা না নেওয়ার কারণসহ পুরো ঘটনার হালনাগাদ তথ্য জানতে চাইলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

পাসপোর্ট অধিদপ্তর, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আইরিস করপোরেশন মালয়েশিয়ার একটি বিতর্কিত কোম্পানি। কোম্পানিটি পাঁচ মাস দেরি করে কাজ শুরু করায় পুরো ব্যাপারটিই বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিকর হয়েছে। এ জন্য অনেক প্রবাসী যথাসময়ে পাসপোর্ট পাননি। সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ গত বছর সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করেছিলেন, ‘আইরিস অনেক দায়িত্বহীন।’

জানতে চাইলে সাবেক সিএজি এম হাফিজ উদ্দিন খান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘টাকাটা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আনাটা আগে জরুরি।’