খাসোগি হত্যার অডিও-ভিডিও থাকার দাবি তুরস্কের

34

ইস্তাম্বুলের সৌদি দূতাবাসের ভেতরে সাংবাদিক জামাল খাসোগির খুন হওয়ার মুহূর্তের অডিও ও ভিডিও রেকর্ড নিজেদের কাছে আছে বলে দাবি করেছে তুরস্ক। বিষয়টি তারা যুক্তরাষ্ট্রকেও জানিয়েছে।

তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টের বরাত দিয়ে টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানায়, দূতাবাসে ঢোকার পর সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে কীভাবে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদ, পরে নির্যাতন এবং শেষে খুন করা হয় তার অডিও এবং ভিডিও তুরস্ক কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে।

ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়, খুন করার পর জামাল খাসোগির দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, সৌদি আরব থেকে যে ১৫ জন বিশেষ চর জামালকে খুন করতে তুরস্কে এসেছিলেন তারাই তার টুকরো টুকরো দেহ গোপনে সৌদি আরবে নিয়ে গেছেন।

সাংবাদিক জামাল খাসোগি সৌদি নাগরিক। তিনি সৌদি রাজতন্ত্র এবং ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের কট্টর সমালোচক ছিলেন। সৌদি আরবে জীবনের হুমকি বোধ করায় বছরখানেক আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা নির্বাসনে যান। তিনি ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন। এ সব কলামেও সৌদি রাজতন্ত্রের সমালোচনা থাকতো। সৌদি সরকার নানা মাধ্যমে তাকে এ সব সমালোচনা থেকে বিরত থাকার হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু তাতে তিনি দমে যাননি।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এখন বলছেন, জামালকে ফুসলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে সৌদি আরবে নিয়ে গিয়ে আটক করার পরিকল্পনা করেছিল সৌদি সরকার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সৌদির এ পরিকল্পনায় বাধ সাধেন।

গত ২ অক্টোবর প্রথম স্ত্রীকে তালাকের কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে যান জামাল খাসোগি। তার তুর্কি প্রেমিকাকে বিয়ে করতে ওই কাগজপত্রের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দূতাবাসে ঢোকার পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ নেই।

সৌদি আরব বলছে, দূতাবাসে প্রবেশের এক ঘণ্টার মাথায় জামাল বের হয়ে গেছেন। কিন্তু দূতাবাসের বাইরে অপেক্ষারত তার বাগদত্তা ও প্রেমিকা হেদিসে চেঙ্গিস এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এদিকে ১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে জামালের নিখোঁজ থাকা নিয়ে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘এটা খুবই ভয়ঙ্কর অবস্থা। আমিও রহস্যের শেষ জানতে চাই।’ তবে সৌদি আরব এ ঘটনায় দোষি হলে তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অঙ্কের অস্ত্র বিক্রি চুক্তি বাতিল না করার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প।

আর মার্কিন সিনেটররা এ ঘটনার তদন্ত করতে ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন। একজন প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সিএনএনকে বলেছেন, ‘এ ঘটনার পেছনে যদি সৌদি আরবের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রমাণিত হয়, তাহলে তাদেরকে অত্যন্ত কঠিন শাস্তি পেতে হবে।’

সৌদি আরব প্রথম থেকেই জামালের অন্তর্ধানের ব্যাপারে নিজেদের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করে আসছে। দেশটি দাবি করেছে, জামাল দূতাবাসে ঢোকার কিছুক্ষণ পরই বের হয়ে গেছেন। কিন্তু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোয়ান বলেছেন, ‘শুধু এ কথা বলেই সৌদি আরব পার পেয়ে যাবে না। তাদের কথার সমর্থনে প্রমাণ হাজির করতে হবে।’

দিন যতই যাচ্ছে, এ ঘটনার পেছনে সৌদি আরবের সংশ্লিষ্টতার চিহ্ন ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পুরো ফিল্মি কায়দায় দূতাবাসের ভেতরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রথম থেকেই দাবি করে আসছে তুরস্ক। ঘটনার দিন দুপুরে হঠাৎ করেই দূতাবাসের তুর্কি সব কর্মচারীকে বাধ্যতামূলক ছুটি দেওয়া হয়। ঘটনার দিন দুটি ব্যক্তিগত বিমানে করে সৌদি আরবের ১৫ জন নাগরিক তুরস্কে আসেন। তারা চারদিনের জন্য হোটেল বুক করলেও কয়েক ঘণ্টা পরই তুরস্ক ত্যাগ করেন।

২ অক্টোবর যে সময় জামাল দূতাবাসে ঢুকেছেন, তার ঘণ্টা খানেক আগে কয়েকটি গাড়ি সৌদি দূতাবাসে ঢুকতে দেখা গেছে। বলা হচ্ছে, এই গাড়িগুলোতে করেই ওই ১৫ জন বিশেষ সৌদি নাগরিক দূতাবাসে প্রবেশ করেন। ওই দলে ছিলেন একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, যিনি সঙ্গে করে মানুষের হাড় কাটার করাত নিয়ে এসেছিলেন।

ধারণা করা হচ্ছে, জামালকে খুনের পর ওই করাত দিয়েই তার দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়। জামাল দূতাবাসে প্রবেশের দুই-তিন ঘণ্টা পর কালো কাঁচে ঢাকা পাঁচটি গাড়িকে দূতাবাস থেকে বের হয়ে যেতে দেখা গেছে। এ গাড়িগুলোর কয়েকটি সোজা বিমানবন্দরে যায়। গাড়িগুলো বিমানবন্দরে পৌঁছার কিছুক্ষণ পরই একটি ব্যক্তিগত বিমান ছেড়ে যায়। বাকি বিমানটি আরও কয়েক ঘণ্টা পর সন্ধ্যায় তুরস্ক ত্যাগ করে।