গ্যাসের দাম বৃদ্ধি প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা

19

নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে গতকাল সোমবার থেকে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানি, যা চলবে আগামী ১৪ মার্চ পর্যন্ত। রাজধানীর কারওয়ানবাজারের ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) অডিটোরিয়ামে গতকাল সকাল ১০টায় এই গণশুনানি শুরু হয়।

প্রথম দিন বাংলাদেশ তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলার) প্রস্তাব উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে কার্যক্রমের শুরু হয়। এর পর বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন।

এ সময় বক্তারা বারবার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির জন্য পেট্রোবাংলার কড়া সমালোচনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বলেন, প্রতিবার এই মঞ্চে গনশুনানি হয়। আমরা আসি, বক্তব্য দেই। অন্যরা আসে গ্যাসের দাম না বাড়াতে প্রতিবাদ করে। কিন্তু লাভ হয় না। আগামী দিনেও হয়তো আসব। পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নাটক বলা যায়। কারণ কারও কথায় কিছু যায় আসে না। দাম ঠিকই বেড়ে যায়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলমও এই গণশুনানির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি এভাবে বারবার গ্যাসের দাম বৃদ্ধিকে অসাংবিধানিক উল্লেখ করে এই প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানান।

তিনি বিইআরসি আইনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আইনের ২ (ঝ) উপধারা ও ৩৪(৫) উপধারামতে, একবার দাম বৃদ্ধির গণশুনানির পর এক বছর অতিবাহিত না হলে আর দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। গত বছর এপ্রিলে গণশুনানি হয়। এখনো এক বছর পূর্ণ হয়নি, তাই এই শুনানির কোনো আইনগত বৈধতা আমি দেখছি না। এ ছাড়া এপ্রিলে উচ্চমূল্যের আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আসবে। তাই তার ভিত্তিতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিইআরসির আইনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

শুনানির প্রথম দিনে পেট্রোবাংলা জানায়, প্রতিদিন এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করলে বছরে ২৪ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা ঘাটতিতে পড়বে জ্বালানি খাত। সেই সঙ্গে আগামী এপ্রিল থেকে আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে। ফলে গ্যাসের দাম সমন্বয় করা দরকার।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বলেন, দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের জন্য এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখতে হবে। সঙ্গত কারণে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। ঘাটতি মেটাতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা দরকার ছিল বলে শুনানিতে পেট্রোবাংলা অভিযোগ করে।

কিন্তু অর্থ বিভাগ পেট্রোবাংলাকে কোনো অনুদান দেয়নি। পেট্রোবাংলা তার আবেদনে বলেছে, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া, বাণিজ্যিক ব্যাংকে পর্যাপ্ত ডলার সঞ্চিত না থাকায় বেসরকারি ব্যাংককে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এভাবে অর্থায়ন করলে আরও ৫ ভাগ খরচ বাড়বে। পেট্রোবাংলার লিখিত আবেদনে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের কোম্পানি বিজিএফসিএলের কাছ থেকে ৭৭২ এমএমসিএফডি গ্যাস ৭০ পয়সা হারে (ঘনমিটার); বাপেক্সের কাছ থেকে ৩ টাকা ৪ পয়সা হারে; এমএমসিএফডি, এসজিএফসিএলের কাছ থেকে ২০ পয়সা হারে; এমএমসিএফডি, আইওসির কাছ থেকে ২.৫৫ টাকা হারে ১৭১২ এমএমসিএফডি গ্যাস কেনা হচ্ছেÑ যার ইউনিটপ্রতি দাম পড়ছে গড়ে প্রায় সাড়ে ৬ টাকা। আর আমদানি করা এলএনজির দাম পড়বে ৩৯.৮২ টাকা।

বর্তমানে গড়ে প্রতিঘনমিটার গ্যাস ৭.১৭ টাকা দরে বিক্রি করছে। এর সঙ্গে এলএনজি চার্জ ৯.৫৫ টাকা হারে নির্ধারণ করার প্রস্তাব করেছে পেট্রোবাংলা। শুনানিতে সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স গ্যাসের দাম বাড়ালে আন্দোলনের হুমকি দেন। তিনি বলেন, আমরা এই প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। আশা করি আমাদের আবেদন বিবেচনা করবে বিইআরসি। এর পরও যদি শুনানি অব্যাহত থাকে, তা হলে আদালতে যেতে ও রাস্তায় নামতে বাধ্য হব। বিকালে কমিশনের সদস্য আব্দুল আজিজ খান গ্যাসের দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করলে হইচই শুরু হয়। অনেকে দাঁড়িয়ে তার বক্তব্যকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিহিত করেন। এ সময় তার পদত্যাগ দাবি করেন রুহিন হোসেন প্রিন্স। হইচই থামাতে ব্যর্থ হয়ে একপর্যায়ে কমিশনের চেয়ারম্যান গতকালের মতো সভা সমাপ্ত ঘোষণা করেন।

নাগরিক সমাজের বিক্ষোভ টিসিবি ভবনের ভেতরে যখন বিইআরসির গণশুনানি চলছে, তখন বাইরে গ্যাসের দাম আবারও বৃদ্ধির প্রস্তাব বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে নাগরিক সমাজ। সংগঠনের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিইআরসি আইনের ২(ঝ) উপধারামতে, ট্যারিফ অর্থ এনার্জি সরবরাহ বা এ সম্পর্কিত বিশেষ সেবার মূল্যহার এবং ৩৪(৫) উপধারামতে, কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ট্যারিফ কোনো অর্থবছরে একবারের বেশি পরিবর্তন করা যাবে না, যদি না জ্বালানি মূল্যের পরিবর্তনসহ অন্য কোনো পরিবর্তন ঘটে।

অন্য বক্তারা বলেন, গ্যাস কোম্পানিগুলো অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করে লোকসানের দায় জনগণের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। অথচ নিয়ন্ত্রক কমিশন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো জনগণের দুর্ভোগ বৃদ্ধির জন্য লুটপাটকারীদের প্রস্তাবের পক্ষে গণশুনানি করে একে জনগণের কাছে গণতামাশায় পরিণত করেছে।

মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন সিপিবির সম্পাদকম-লীর সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী, বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা রাজেকুজ্জামান রতন, দৈনিক বাংলার মুখের সম্পাদক সাইদুজ্জামান সেলিম প্রমুখ।