চমকের নন-স্টপ ট্রেন প্রধানমন্ত্রীর

0
34

সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনেও চমক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চমকের এ ঝলকানির ঠিক আগের পর্ব ছিল উপজেলা নির্বাচনের মনোনয়নে। সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নের পর মন্ত্রিসভাতেও চমক দেখিয়েছেন তিনি। তার এ ম্যাজিক নতুন করে শুধু রাজনৈতিক মহলকেই চমকিত করেনি, তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও দিনকয়েক রীতিমতো থমকে গেছে। দেশি-বিদেশি অরাজনৈতিক মহলও নড়েচড়ে বসেছে। রাজনীতি, নির্বাচন, মনোনয়ন, সরকার গঠন এবং বিভিন্ন জটিল-কঠিন ইস্যু নিষ্পত্তি বা মোকাবিলায় শেখ হাসিনা ভিন্ন উচ্চতায় চলে গেছেন অনেক আগেই। উপজেলা ও সংসদের নারী আসনে সেই ধারাবাহিকতাই দেখালেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন নিয়ে তোড়জোড় চলছিল অনেক দিন থেকেই। আলোচনাও ছিল জম্পেশ। বিশেষ করে নায়িকা-গায়িকাদের নানামুখী দৌড়-ঝাঁপের খবর বেশ বিনোদন জোগাচ্ছিল। চলছিল সমালোচনাও। শেখ হাসিনা এ রেস কীভাবে মোকাবিলা করবেন, তা দেখার অপেক্ষায় ছিলেন অনেকে। সমালোচকরা বলছিলেনÑ গ্ল্যামার জগতের নায়িকা-গায়িকা, রাজনৈতিক নেতাদের আত্মীয়-স্বজন, মামি-চাচি, খালা-ফুপু, মা-বাপের বিবেচনা থেকে সংরক্ষিত আসনগুলোর রক্ষা নেই। নামে সংরক্ষিত হলেও এ আসনগুলোর বাজার বেশ রমরমা, ভ্যালু অনেক। সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে ফেলনা নন। সরাসরি নির্বাচিত সদস্যদের মতোই মর্যাদা ভোগ করেন। তিন কোটি টাকা দামের ট্যাক্স ফ্রি গাড়িসহ রাজকীয় তথা সাংবিধানিক অন্যান্য সুযোগ-আয়েশের হকদার তারাও। নিঃসন্দেহে মর্যাদা ও প্রাপ্তির প্রশ্নে এটি বিশাল। এ প্রতিযোগিতায় থাকাও একটা ব্যাপার। সবাই যে মনোনয়ন নিশ্চয়তার জন্য রেসে নেমেছিলেনÑ এমনও নয়। আলোচনায় থেকে ধন্য হতে চাওয়া নারীও কম ছিলেন না। তাই এ রকম লোভনীয় পজিশন কেনাবেচা নিয়ে অনেক ঘটনা-রটনা থাকাই স্বাভাবিক।
প্রধানমন্ত্রীর ম্যাজিকে ছিটকে পড়লেন কেনাবেচার আড়তদার-ফড়িয়াসহ ক্লায়েন্টদের অনেকেই। মন্ত্রিসভার মতো সংরক্ষিত আসনেও তার চমকে কপাল খুলেছে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত অনেকের। মনোনয়নপত্র তোলায় বাজিমাৎ শুরু করা গ্ল্যামার জগতের সাবেক-বর্তমানরা আচ্ছা রকমের ধাক্কা খেলেন। এই পালে মৌমাছির মতো শুধু ঝাঁকে ঝাঁকে নায়িকা-গায়িকা নেমেছিলেন বললে তা একতরফা কথা হয়ে যায়। এ প্রতিযোগিতায় হঠাৎ আওয়ামী লীগ হওয়া সুবিধাবাদীরাও ছিলেন। এই বিশাল বহর থেকে ৪৩ জন বাছাই করা কঠিন কাজ। সফলকাম হওয়া ৪৩ জনের মধ্যে দলের প্রতি কমিটেড ও পোড় খাওয়া অনেকে রয়েছেন। ঠিক উল্টোও রয়েছেন। এ কঠিন কাজটিই প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টারি বোর্ডকে দিয়ে চূড়ান্ত করে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন।
অনেক যোগ্যতা ও দলের প্রতি নিবেদিত থাকার পরও এখন পর্যন্ত এমপি হতে পারেননি বা ক্ষমতাসীন দলের মূল্যায়নের খাতায় যাদের নাম ওঠেনি, তারা নিশ্চয়ই সামনে মূল্যায়িত হবেন। বঞ্চিতরা ভিন্নভাবে মর্যাদা পাবেনÑ সেই আশা দেখানো হয়েছে। চমক হিসেবে পাকিস্তান গণপরিষদে প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপনকারী, একাত্তরের শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি ও মানবাধিকার নেত্রী আরমা দত্তও রয়েছেন। নরসিংদীতে আততায়ীর হাতে খুন হওয়া মেয়র লোকমানের স্ত্রী বুবলিকে সংরক্ষিত আসনে এমপি করা প্রশংসিত হয়েছে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে প্রথম বাংলাদেশের সংসদে সংরক্ষিত আসনব্যবস্থা চালু করা হয়, যেখানে ৩০০ সাধারণ আসনের সঙ্গে নারীদের জন্য ১০ বছরের জন্য অতিরিক্ত ১৫টি সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে আসনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৩০টি, এরপর ৪৫টি এবং ২০১১ সালের ১৫তম সংশোধনীতে এর সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়। তবে ১০ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০১৮ সালের ৮ জুলাই ১৭তম সংশোধনীতে আসন সংখ্যা ২৫ বছরের জন্য বাড়িয়ে ৫০টিতে উন্নীত করা হয়। এরশাদ আমলে সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপিদের নিয়ে ছিল নানা মন্দকথা। জাতীয় পার্টির ৩০ এমপিকে মশকারা করে ডাকা হতো ‘৩০ সেট অলঙ্কার’ নামে।
বলা হয়েছিল, ক্ষমতা দখলবাজরা তাদের পছন্দের অভিজাত রমণীদের দলে টেনে এমপি বানিয়েছেন। সে রকম মশকারা এখন নেই। কিন্তু ধারণা এখনো সুখকর নয়। সংবিধান সংশোধনের ধারাবাহিকতায় মহিলাদের জন্য সংসদের সংরক্ষিত আসন এখন সেই ১৫ থেকে ৫০টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি দল থেকে নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিটি দলের ছয়জনে একজন সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমপি পান। এতে আওয়ামী লীগ ৪৩টি আসনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের সুযোগ পেয়েছে। জাতীয় পার্টি পেয়েছে চারটি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যোগ দিলে পাবে একটি আসন। বাকিরা পাবেন দুটি আসন। ১৯৭২ থেকে শুরু করে ২০১৮ সালে এসেও সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা এবং এর মেয়াদ বাড়াতে দেখছি। আশা করা হয়েছিল, সংরক্ষিত আসনে আসা নারীরা একবার-দুইবার এভাবে এসে সংসদীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা নিয়ে পরে সরাসরি নির্বাচনে যাবেন এবং রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা করে নেবেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। অপ্রিয় সত্য হচ্ছে, সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের জন্য প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি একেবারেই অস্বচ্ছ। রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হলেও এটি নারীকুলের মর্যাদা-নিরাপত্তার সঙ্গে বেমানান-অপ্রাসঙ্গিক। প্রধানমন্ত্রী চাইলে এখানেও তার চমকের হাত বাড়াতে পারেন। তার সেই দক্ষতা-অভিজ্ঞতা, সাহসের কমতি-ঘাটতি নেই।
এদিকে কয়েক জায়গায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পরিবারের সদস্যদের মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা বাদ দিলে প্রথম পর্বের ৮৭ উপজেলা নির্বাচনের প্রার্থীর পরতে পরতেই চমক। তাদের ৩৪ জন বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান, বাকি ৫৩ জনই নতুন। দ্বিতীয় ধাপের ১২২ প্রার্থিতাও চমকে ভরপুর। আর ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদ উন্মুক্ত রাখা আরেক চমক। এ দুই পদের আগ্রহী প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন ফরম কেনার টাকা ফেরত দেওয়া হবে। ভাইস চেয়ারম্যান পদ উন্মুক্ত রাখা নিয়ে চারবার দলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ দুই পদে এখন দলের যে কেউ নির্বাচন করতে পারবেন। অর্থাৎ আগ্রহী সব প্রার্থীই এ পদে অংশ নিতে পারবেন। নির্বাচনকে একটু জমজমাট করার উদ্দেশ্যে এমন কৌশল নেওয়া হয়েছে। মনোনয়ন ঘোষণার সময় তৃণমূল বিএনপির অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে আসবেন বলে আভাস দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট আগামী ১০ মার্চ। দেশের ৪৯২টি উপজেলায় মোট ৫ ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ধাপে রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রাজশাহী বিভাগের ৮৭ উপজেলায় ভোট হবে। মার্চে চার ধাপের ভোটগ্রহণ হবে। দ্বিতীয় ধাপের ভোট ১৮ মার্চ। তৃতীয় ধাপে ২৪ মার্চ, চতুর্থ ধাপে ৩১ মার্চ ভোট হতে পারে। পঞ্চম ও শেষ ধাপের ভোট হতে পারে ১৮ জুন। স্থানীয় সরকারগুলোর মধ্যে উপজেলা পরিষদ নিঃসন্দেহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বলে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনও শেষ কথা নয়। যে হালে উপজেলা পরিষদের কার্যক্রম চলছে, তাতে সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারছেন না উপজেলা চেয়ারম্যানরা। শুধু তা-ই নয়, এমনকি পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছেও জিম্মি হয়ে পড়েছে উপজেলা পরিষদ। আইনি দুর্বলতাও একটি বিষয়। বিদ্যমান আইনে উপজেলা পরিষদ কাঠামো ত্রুটিপূর্ণ। বর্তমান অবস্থায় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের সামান্য ক্ষমতা থাকলেও ভাইস চেয়ারম্যানদের সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ বা দায়িত্ব নেই। এ ছাড়া সংসদ সদস্যদের পরামর্শ ছাড়া পরিষদ কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারছে না। আবার পরিষদকে সর্বাধিক সহায়তা দেওয়ার কথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার। কিন্তু বাস্তবে তারাও আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ষোলো আনাই প্রয়োগ করে ছাড়েন।
২০০৯ সালে উপজেলা নির্বাচনের পর থেকেই উপজেলা পরিষদকে কার্যকর করতে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানরা আন্দোলন করে যাচ্ছেন এবং সেই আন্দোলন এখনো অব্যাহত রয়েছে। উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী করতে একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশন। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন সংশোধন করে উপজেলা চেয়ারম্যানদের সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে না পারলে পরিস্থিতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। অথচ উপজেলা পরিষদ গঠন করা হয়েছিল প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্য সামনে রেখে। বলা হয়েছিল, স্থানীয় পর্যায়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে প্রধানমন্ত্রী এ ক্ষেত্রেও নতুন কোনো চমক দেখাতে পারেন।
মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক