ডাকসুতে ছাত্রদলের ‘লজ্জার’ কারণ কী

41

১৯৯০ সালের ৬ জুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্যানেল হল ও কেন্দ্রীয় সংসদ মিলিয়ে ১৮৮ পদের মধ্যে ১৫১টিতে জয়লাভ করে। এর পর ২৮ বছরের ব্যবধানে গত সোমবারের নির্বাচনে ছাত্রদল কোথাও কোনো পদে জয় তো দূরের কথা, ভোটপ্রাপ্তির হার প্রায় শূন্যের কোটায়।

এমনকি পূর্ণাঙ্গ প্যানেলও দিতে পারেনি তারা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, কম প্রচার, সংগঠনে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ না থাকা এবং ক্যাম্পাসে কোনো কার্যক্রম না থাকার ফলেই এমন লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ছাত্র সংগঠনটিকে। ডাকসুর ভিপি পদে ১১ হাজার ৬২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুর।

তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন পেয়েছেন ৯ হাজারের বেশি ভোট। আর ছাত্রদলের ভিপি পদপ্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান পেয়েছেন মাত্র ২৪৫ ভোট। একইভাবে জিএস পদে ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানী ১০ হাজার ৪৮৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। ছাত্রদলের প্রার্থী খন্দকার আনিসুর রহমান অনিক পেয়েছেন মাত্র ৪৬২ ভোট।

এজিএস পদে ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন জয়ী হয়েছেন ১৫ হাজার ৩০১ ভোট পেয়ে। ছাত্রদলের এজিএস প্রার্থী খোরশেদ আলম সোহেল পেয়েছেন ২৯৪ ভোট। বিভিন্ন হল সংসদ ও কেন্দ্রীয় সংসদের ভিন্ন পদে ছাত্রদলের প্রার্থীদের ভোটপ্রাপ্তিও প্রায় একই রকম। অথচ নব্বইয়ের নির্বাচনে ডাকসুতে পূর্ণ প্যানেলে বিজয়ী হয় ছাত্রদল। ডাকসুর ভিপি হন ছাত্রদল নেতা আমানউল্লাহ আমান ও জিএস হন খায়রুল কবির খোকন।

অবশ্য ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান এ বিষয়ে বলেন, ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন এক কলঙ্কের জন্ম দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নীলনকশার নির্বাচনে ছাত্রলীগ ব্যতীত আর কেউ-ই খুশি হয়নি। ছাত্রদলের বিশাল ভোটব্যাংক থাকার পরও ভোট দিতে না দেওয়ায় ফল এমন হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ১০ বছর ধরে ঢাবিতে অনুপস্থিত ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। নেই কোনো কার্যক্রম। সংগঠনে নেই নিয়মিত শিক্ষার্থীও। এবারের ডাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি পদের বিপরীতে ছাত্রদল ২১টিতে প্রার্থী দিয়েছিল।

এ ছাড়া বিভিন্ন হল সংসদে ১৩ পদের বিপরীতে তিন থেকে ছয়জন করে প্রার্থী দেয় তারা। পাঁচটি ছাত্রী হলের মধ্যে কেবল শামসুন্নাহার হলে ভিপি পদে প্রার্থী দেয় ছাত্রদল। মূলত নিয়মিত শিক্ষার্থীর অভাবে প্রার্থী দিতে পারেনি সংগঠনটি। জানা যায়, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের কারওই ছাত্রত্ব নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিরও একই অবস্থা। বিভিন্ন হলে আহ্বায়ক কমিটি থাকলেও নেতাদের ছাত্রত্ব শেষ অনেক আগেই।

বিভিন্ন সান্ধ্য কোর্সে ভর্তি হয়ে কয়েকজন ছাত্রত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। প্রার্থী সংকটের কারণেই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজকে ভিপি ও জহুরুল হক হলের যুগ্ম আহ্বায়ক অনিককে ডাকসুতে মনোনয়ন দেয় ছাত্রদল। তবে দীর্ঘদিন ধরে ঢাবিতে কোনো কার্যক্রম না থাকায় তারা ক্যাম্পাসে অনেকটা অপরিচিত। ফলে ৪৩ হাজার ভোটারের কাছে সংগঠন ও নিজেদের পৌঁছানো সম্ভব হয়নি তাদের পক্ষে।

প্রচারেও সংগঠনটি বেশ পিছিয়ে ছিল। প্রধান প্রতিপক্ষ ছাত্রলীগের কোনো বাধা না থাকার পরও তারা আশানুরূপ প্রচার চালাননিÑ এমন অভিযোগ খোদ সংগঠনটির প্রার্থীদের। নির্বাচন উপলক্ষে দীর্ঘদিন পর ক্যাম্পাসে আসার সুযোগ পেয়ে উৎফুল্ল ছিলেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। ফলে মধুর ক্যান্টিন আর হাকিম চত্বরে গল্পগুজব করেই সময় কাটে তাদের। স্বয়ং প্রার্থীরাও ক্যাম্পাসে এসে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আড্ডায় সময় পার করেছেন। প্রচার বলতে দুদিন দুটি মিছিল করার বাইরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোট টানার মতো কোনো উদ্যোগ ছিল না।

এমনকি অন্য প্রার্থীরা ডিজিটাল প্রচার চালালেও ছাত্রদল ছিল পিছিয়ে। অনেকের মতে, প্রচারে ভিন্নতা আনতে পারলেও অন্তত এমন লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না ছাত্রদলকে। এর বাইরে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হচ্ছেÑ ছাত্রদলের জুনিয়র পর্যায়ে অনেক পরিচিত মুখ থাকার পরও প্রার্থী করা হয় প্রভাবশালী একটি বলয়ের আশীর্বাদপুষ্টদের। এতে নাখোশ হয় ছাত্রদলের কয়েকটি গ্রুপ।

ফলে শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বাইরে সিনিয়র নেতারা ঢাবি ক্যাম্পাসে যাননি। শেষ দিকে সবাই ক্যাম্পাসে গেলেও তা কেবল আড্ডার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ ছাড়া ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ভোটের মাঠে কাজে লাগাতে পারেননি বিএনপিপন্থি শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও। নিষ্ক্রিয় ছিলেন বিভিন্ন হল ও বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির নেতারাও।

ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের বিপরীতে আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিল না ছাত্রদল। আর এই শূন্যস্থান পূরণ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা। ফলে ছাত্রদলের প্রতি আগ্রহ থাকা শিক্ষার্থীরাও ভোট দেয় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের। এর বাইরে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের শক্ত অবস্থানের বিপরীতে ছাত্রদল শেষ সময়ে সহাবস্থান পেলেও ডাকসু নির্বাচনের জন্য তা ছিল অপর্যাপ্ত। ফলে ক্যাম্পাসে এলেও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ধরেই নিয়েছিলেন নির্বাচনে তারা পরাজিত হবেন। জয়ের জন্য কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার উদ্যোগও নেননি সিনিয়র নেতারা।