তারেক রহমানের দণ্ড নিয়ে আইনমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া

18

একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি ৩জন আসামির মৃত্যুদণ্ডের জন্য আপিল করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বুধবার সকালে রায় ঘোষণার পর সচিবালয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ‘হামলার হোতা তারেকের মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মামলার বিচার শেষ হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘রায়ের কাগজপত্র পাওয়ার পরে আমরা চিন্তা-ভাবনা করব যে এই রায়ে তারেক রহমানকে এবং আরও দুজন- কায়কোবাদ এবং হারিছ চৌধুরীকে যে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে সেটার জন্য আমরা উচ্চতর আদালতে গিয়ে তাদের ফাঁসির জন্য আমরা…এনহান্সমেন্ট বলে সেটা আইনে… এনহান্সমেন্টের জন্য আমরা আপিল করব কি না।’

‘এই হামলার মূল নায়ক তারেক রহমান। তিনি আওয়ামী লীগকে ও জননেত্রী শেখ হাসিনাকে সপাটে শেষ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের নায়ক ছিলেন। মূল হোতা তারেকের মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল।’

২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন; আহত হন কয়েকশ নেতাকর্মী। সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু গ্রেনেডের প্রচণ্ড শব্দে তার শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়।

শেখ হাসিনাকে হত্যা করে দলকে নেতৃত্বশূন্য করতেই এই হামলা হয়েছিল এবং তাতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোটের শীর্ষ নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে এ মামলার রায়ে উঠে আসে।

ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন এই মামলার রায়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

এছাড়া এ মামলার আসামি ১১ পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে তখন জজ মিয়া নাটকের ব্যাপারটি উদ্ঘাটিত হলে আবার তদন্ত করা হয়। সুষ্ঠ তদন্তের পর যারা যারা এ মামলায় ষড়যন্ত্রে হত্যার কাজে এবং আলামত গুম করার জন্য দায়ী তাদেরকে বিচারে সোপর্দ করা হয়।’

পলাতক ১৮ আসামিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে বলেও তিনি জানান।

আরো পড়ুন : ২১ আগষ্ট মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়ার বিএনপির আইনজীবী যা বললেন
নিজস্ব প্রতিবেদক ১০ অক্টোবর ২০১৮, ১৭:৩৭

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার আসামীপক্ষের অন্যাতম আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এ মামলায় ১৯জন আসামীকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। আমি পূর্বেই বলেছি, এ মামলায় বিএনপি নেতা তারেক রহমান, আবদুস সালাম পিন্টু, লুৎফুজ্জামান বাবর, শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, হারিস চৌধুরীসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে এক মাত্র মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তি ব্যতীত অন্যকোনো সাক্ষী নেই। যার ওপর নির্ভর করে এসব বিএনপি নেতাকর্মীদের সাজা দেয়া যায়।

তিনি বলেন, আমি এখনো বিশ্বাস করি দেশের প্রচলিত আইনে এই মামলায় বিএনপি নেতাদের যে দণ্ড দেয়া হয়েছে তা আইনের পরিপন্থি। আগামী দিনে ইতিহাস একদিন বলবে, এই সাজা আইনের পরিপন্থী এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফলপ্রসুত।

বুধবার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণার পর খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বরবরোচিত এই সন্ত্রাসী হামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রচেষ্টা শুরু করে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে মামলার ৬১জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হওয়ার পর মামলার পুন:তদন্ত করা হয় একজন বিতর্কিত তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দিয়ে। যাকে বিএনপি সরকার চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে ছিল।

এরপর তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে ছিলেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছিলেন। তাকে এনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা সফল করার জন্য মুফতি হান্নানকে নির্যাতন ও রাজসাক্ষী করার প্রলোভন দেখিয়ে মিথ্যা স্বীকারোক্তি নিয়ে বিএনপি নেতাদের এ মামলায় আসামী করা হয়। মুফতি হান্নান পরবর্তীতে আদালতে লিখিতভাবে তার স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করে বলেছেন, তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে এই মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে।

এমনকি তার ভাই, ভগ্নিপতি এবং বোনকে প্রায় এক বছর কারাগারে রাখা হয়েছিল। তাই আমি বলতেচাই দেশের প্রচলিত আইনে কোনো আসামির শুধুমাত্র স্বীকারোক্তি দ্বারা অন্যকোনো আসামীকে সাজা দেয়া যায় না। যে স্বীকারোক্তি দিয়েছে শুধুমাত্র তাকেই সাজা দেয়া যায়।

তিনি আরো বলেন, আইনের বিধান মোতাবেক একজন আসামী বিচারের শেষ পর্যায়ে তার সাক্ষ্য প্রমাণ আদালতে দেয়া হয়েছে। সেই সাক্ষ্য প্রমাণ সঠিক কি না তা জাচাই করা ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৩২ ধারায় বাধ্যতামুলক। কিন্তু এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে দেশে যখন শত শত মৃত্যৃদ- প্রাপ্ত আসামী জেলে আছে, তাদের দ-ের ব্যাপারে শুরাহা না করে মুফতি হান্নান যাতে তার স্বীকারোক্তি মুলক জবানবন্দী নির্যাতনের কারণে তা যাতে ৩৪২ ধারায় জবানবন্দীর সময় বলতে না পারে। এজন্য অন্য একটি মামলায় তড়িঘড়ি করে তাকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে আসামীপক্ষের অপর আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, মুফতি হান্নান রিমান্ডে যে জবানবন্দি দিয়েছেন সে জবানবন্দি তিনি প্রত্যাহার করে বলেছেন, তারেক রহমান বা বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তার কোনদিন দেখাই হয়নি। অথচ আজকে অন্যায়ভাবে, বেআইনিভাবে তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে। লুৎফুজ্জামান বাবর এবং আবদুস সালাম পিন্টুসহ বিএপির বহু নেতাকে এ মামলায় মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বিএনপির যেসব নেতাদের আসামি করা হয়েছে তারা কেউ এ হামলায় জড়িত নয়। আবদুস সালাম পিন্টুর বাসা থেকে কোনও সাক্ষী এসে এ মামলার সাক্ষ্য দেয় নাই। তারা সেখানে বসে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা করেছে, তার কোনো সাক্ষী নাই। এ মামলায় আমরা ন্যায় বিচার পাইনি।

তিনি বলেন, তারেক রহমান যখন বাংলাদেশে ফিরে আসবেন তখন আমরা অবশ্যই এ মামলায় আপিল করব। তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু, হারিস চৌধুরীসহ কেই কোনো অন্যায় করে নাই। তারেক রহমান দেশের গণতন্ত্র রক্ষার জন্য, স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা করার জন্য, আইনের শাসনের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন এবং আরও করে যাবেন।

এ বিষয়ে পালাতক আসামী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আশরাফ-উল- আলম বলেন, আমার ধারণা এই আসামীকে সাজা দেয়ার মতো কিছু ছিল না। রায় না দেখে মন্তব্য করা যাবে না যে তাকে কি কারণে জড়ানো হয়েছে।

আদালতে আসামীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন, এসএম শাহাজাহান, মাসুদ রানা, আবদুর রশিদ মোল্লা, নজরুল ইসলাম, মাহবুবুর রহমান দুলাল প্রমুখ।