বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটতে যাচ্ছে

26

১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর ঢাকার আকাশ মিত্র বাহিনীর বিমানবাহিনী পুরোপুরি দখল করে নেয়। ৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাত একটায় বিমান হামলা শুরু করে বাংলাদেশ ও ভারতীয় বিমানবাহিনী। এদিন বাংলাদেশের আকাশে ২৩০ বার হানা দেয় বিমানবাহিনী। সিলেট সেক্টরে বোমাবর্ষণ করে তারা শত্রুদের বাঙ্কার উড়িয়ে দেয়। জামালপুরে হামলায় হানাদার বাহিনীর কয়েক শ সৈন্য নিহত হয়।

এদিকে নৌবাহিনীর যৌথ কমান্ডার চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে সব বিদেশি জাহাজকে বন্দর ছেড়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বিদেশি জাহাজগুলো এই সময় নিরাপত্তা চাইলে যৌথ কমান্ডার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

চট্টগ্রামে পাকিস্তান নৌবাহিনী ও যৌথ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলোর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। বখশীগঞ্জে যৌথ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুক্ত হয় পীরগঞ্জ, হাতিবান্ধা, পচাগড়, বোদা, ফুলবাড়ী, বীরগঞ্জ ও নবাবগঞ্জ। আর জীবননগর, দর্শনা ও কোট চাঁদপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মিত্র বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে টিকতে না পেরে আত্মসমর্পণ করে।

পৃথিবীর সব দেশ তখন বুঝতে পারে যে শিগগিরই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটতে যাচ্ছে। এদিন লেফটেন্যান্ট আরেফিনের নেতৃত্বে চালনা নৌবন্দরে এক তীব্র আক্রমণ সংঘটিত হয়। মুক্তিবাহিনীর এই আক্রমণের ফলে পাকিস্তানি বাহিনীর সব সৈন্য বন্দর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ব শিবির দুভাগে ভাগ হয়ে সংঘাতে জড়িয়ে যেতে পারে। আর জাতিসংঘে বাংলাদেশকে নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক।

বাংলাদেশকে নিয়ে মার্কিন সরকারের বিশেষ উদ্যোগে জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন বসে। এতে যুদ্ধবিরতির জন্য মার্কিন প্রতিনিধি সিনিয়র বুশের চেষ্টায় সোভিয়েত প্রতিনিধি কমরেড মালিক ‘ভেটো’ প্রয়োগ করেন। ‘ভেটো’ প্রয়োগের আগে কমরেড মালিক বলেন, ‘পাক সামরিক জান্তার নিষ্ঠুর কার্যকলাপের ফলেই পূর্ব বাংলার বর্তমান পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।’

বাংলাদেশকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূল লড়াইটা ছিল দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মাঝে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল বাংলাদেশের পক্ষে আর যুক্তরাষ্ট্র ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। আর বাংলাদেশ সম্পর্কে পরিষদে তৃতীয় প্রস্তাবটি পেশ করে বেলজিয়াম, ইতালি ও জাপান।

এদিকে জাতিসংঘে চীনের প্রতিনিধিরা বলেন, কোনো শর্ত ছাড়াই পাকিস্তান থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে। চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ভারতীয় হামলার মুখে পাকিস্তানকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়ার কথা বলেন।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে এ উত্তপ্ত অবস্থায় যাতে মুক্তিযোদ্ধারা মনোবল হারিয়ে না ফেলেন, সে জন্য মুক্তিবাহিনীর সেনাপতি জেনারেল ওসমানী জাতির উদ্দেশে বেতারে ভাষণ দেন।