ব্রেক্সিট নিয়ে আরেকটি গণভোট না থেরেসা মের বিদায়?

0
24

ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে এখন টালমাটাল অবস্থা। এক দিকে ব্রেক্সিট নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মেকে পদত্যাগ করার জন্য তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের পক্ষ থেকে তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। অপর দিকে ব্রেক্সিট-বিরোধী লাখ লাখ মানুষ ব্রেক্সিট নিয়ে আরেকটি গণভোটের দাবিতে ২৩ মার্চ শনিবার সেন্ট্রাল লন্ডনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। প্রায় ১০ লাখ লোক এই সমাবেশে উপস্থিত হয়েছিলেন বলে জানা গেছে। ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত শতাব্দীর বৃহত্তম মিছিলের সাথে তুলনা করা হচ্ছে এই সমাবেশকে। সমাবেশে লন্ডনের মেয়র সাদিক খান স্কটল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী নিকোলা স্টার জিওন, লেবার দলের উপপ্রধান টম ওয়াটসনসহ ব্রেক্সিট-বিরোধী নেতারা বক্তৃতা করেন। এখন কোন দিকে যাবে ব্রিটেন? সরকার আরেকটি গণভোটের দাবি মেনে নেবে, নাকি মন্ত্রিসভার চাপে নতি স্বীকার করে থেরেসা মে বিদায় নেবেন?

মনে হচ্ছে, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেরেসা মের সময় শেষ হয়ে এসেছে। তার উত্থাপিত ব্রেক্সিট চুক্তি এর আগে দু’বার পার্লামেন্টে বিপুল ভোটে হেরে গেছে এবং তৃতীয়বারের মতো তিনি এটাকে পার্লামেন্টে পাস করনোর চেষ্টা করবেন- এই জল্পনা-কল্পনার মধ্যে কনজারভেটিভ পার্টিতে অসন্তোষ আরো তীব্র হচ্ছে।

গত ২৪ মার্চ রোববার যুক্তরাজ্যের জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রধান শিরোনাম ছিল প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে থেরেসা মেকে সরে যেতে বলেছে মন্ত্রিসভা। অবশ্য কোনো মন্ত্রী প্রকাশ্যে এমন খবরের সত্যতা স্বীকার করেননি। এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর অফিসও এই খবর নাকচ করে দিয়েছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে ব্রেক্সিট চুক্তি পাসের শর্ত বেঁধে দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু থেরেসা মের নিজ দলের কট্টর ব্রেক্সিটপন্থীরা এখনো চুক্তির বিরোধিতায় সোচ্চার।

জানা গেছে, থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেই ব্রেক্সিট চুক্তি পাসে প্রয়োজনীয় সমর্থন পেতে পারেন বলে জানিয়েছেন ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দলের সিনিয়র সদস্যরা। ইউ’র সাথে পরবর্তী দফা আলোচনার নেতৃত্বে থেরেসা মে থাকছেন না বলে জানালে অনিচ্ছা থাকলেও টোরি এমপিরা চুক্তিতে সমর্থন দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। মন্ত্রিসভার সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করছেন- ব্রিটেনের মিডিয়ায় এমন খবরের মধ্যেই রক্ষণশীল দলের এমপি ও সিনিয়র নেতাদের এই মনোভাবের কথা জানা গেছে।

ব্রিটেনের পত্রিকাগুলোর রিপোর্টে বলা হচ্ছে, মিসেস মের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হচ্ছে এবং মন্ত্রিসভা তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারে। এ দিকে ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড বলেছেন, মিসেস মেকে সরিয়ে দিলেও ব্রেক্সিট নিয়ে অচলাবস্থা ভাঙতে পারবে না। রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা মনে করছেন, থেরেসা মের পতন ঘটলে কনজারভেটিভ সরকারেরও পতন হতে পারে। বিবিসির রাজনীতি বিষয়ক সম্পাদক লরাকুয়েন্সবার্গ বলেছেন, মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের বড় ধরনের তোড়জোড় চলছে, যা গোটা পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।

পার্লামেন্ট কী চায় সেটি যাচাই করতে এরই মধ্যে ছয়টি ভিন্ন বিকল্প প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। বিষয়গুলো হলো- ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্ত বাতিল করা, আরেকটি গণভোট, প্রধানমন্ত্রী সম্পাদিত চুক্তির পাশাপাশি কাস্টমস ইউনিয়নের সুবিধা যোগ করা, এক বাজার সুবিধা যোগ করা, কানাডার মতো মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট কার্যকর করা।

পাঠকদের কেউ কেউ আবার ব্রেক্সিট কী এবং এর সুবিধা অসুবিধা জানতে চান। ব্রেক্সিট হলো : ব্রিটিশ এক্সিট- এটাকে সংক্ষেপে ব্রেক্সিট বলা হচ্ছে। প্রকৃত ব্যাপার হলো : ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়া। আমরা জানি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) হচ্ছে ২৮টি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট। এই জোটের সদস্য দেশগুলো নিজেদের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য করে থাকে। এসব দেশের নাগরিকেরা বিনা ভিসায় জোটভুক্ত যেকোনো দেশে গিয়ে থাকতে এবং কাজ করতে পারেন। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্য ইইউতে যোগ দেয়। তখন ইইউ’র নাম ছিল ইইসি (ইউরোপিয়ান ইকনোমিক কমিউনিটি)।

৪০ বছরের বেশি সময় ইইউ’র সাথে থাকার পর ২০১৬ সালের ২৩ জুন যুক্তরাজ্যে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে নাগরিকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়- ব্রিটেনের ইইউতে থাকা উচিত কি উচিত নয়? ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট পড়েছিল ৫২ শতাংশ এবং বিপক্ষে ছিল ৪৮ শতাংশ ভোট। এর পর থেকেই ব্রেক্সিট চুক্তি এবং ব্রেক্সিট কিভাবে কার্যকর হবে তা নিয়ে যুক্তরাজ্যে পক্ষ-বিপক্ষ ও নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ব্রেক্সিট নিয়ে যুক্তরাজ্যে এখন যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে শেষ পর্যন্ত ব্রেক্সিট হয়তো বাতিল হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে ব্রেক্সিট ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে।

২০১৬ সালে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দেয়ার পর ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ড নাটকীয়ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে অর্থনীতিতে স্থবিরতা ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের মতে, ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্ত নেয়ায় যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি এ দুই বছরের মধ্যে ২ শতাংশ সঙ্কুচিত হয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে ইইউতে থাকার পক্ষে থাকলে এই ক্ষতি হতো না। ব্রেক্সিটের পক্ষে গণভোটের পর প্রতি সপ্তাহে দেশটির উৎপাদন কমেছে ১০০ কোটি ডলার। এখন পর্যন্ত ইইউ বাণিজ্য সম্পর্কে কাঠামোগত পরিবর্তন আসেনি। তার আগেই ক্ষতির পরিমাণ এ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্রেক্সিট কার্যকর হলে ভবিষ্যতে কী হবে? বাণিজ্যের ধরন ভবিষ্যতে কী হবে তা স্পষ্ট না হওয়ায় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো পরিকল্পনা করতে পারছে না।

ব্রিটেনের রাজনীতি এখন বিশৃঙ্খলার মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। ক্রান্তিকালীন চুক্তি ছাড়াই ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বলেছে, পরিস্থিতি সে রকম হলে তার পরিণতি ২০০৮ সালের আর্থিক সঙ্কটের চেয়েও ভয়াবহ হবে। কনফেডারেশন অব ব্রিটিশ ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড দ্য ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস এ পরিস্থিতি নিয়েই বেশি চিন্তিত। তারা বলছে, রাজনীতিবিদেরা চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিটের ব্যাপারে রাজি হলে যুক্তরাজ্য জাতীয় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তারা বলেছে, ব্রিটেনের কোম্পানি ও সমাজ এ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত নয়। এতে অর্থনীতিতে যে ধাক্কা লাগবে, তার রেশ কয়েক প্রজন্মকে বয়ে বেড়াতে হবে। পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় অনেক বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি যুক্তরাজ্য থেকে তাদের ইউরোপীয় কার্যালয় সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। সনি ও প্যানাসনিক ইতোমধ্যে নেদারল্যান্ডসে কার্যালয় সরিয়ে নিয়েছে। জাপানি গাড়ি কোম্পানি নিশানও যুক্তরাজ্যে তাদের বিলাসবহুল গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা বাতিল করেছে।

আগেই উল্লেখ করেছি, ব্রেক্সিটের চূড়ান্ত চুক্তির ওপর নতুন করে গণভোটের দাবিতে ব্রেক্সিট-বিরোধী ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থক প্রায় ১০ লাখ মানুষ লন্ডনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। এ ছাড়াও ব্রেক্সিট বাতিল করে ইইউতে থেকে যাওয়ার পক্ষে ৫০ লাখের বেশি মানুষ ব্রিটিশ সরকারের কাছে অনলাইন পিটিশন করেছে। ব্রেক্সিট নিয়ে যখন মন্ত্রিসভার ভেতরে-বাইরে এতই বিতর্ক, যা দেশটির রাজনীতি ও অর্থনীতিকে অচল করে দিয়েছে। সে কারণে এখন আবার জনগণের কাছে ফিরে গিয়ে নতুনভাবে গণভোটের আয়োজন করে- জনগণের ম্যান্ডেট নেয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। দ্বিতীয় গণভোটের রায়ই ব্রিটেনকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগাবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে। থেরেসা মে যত তাড়াতাড়ি বাস্তবধর্মী এই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন তত দ্রুত দেশটির সঙ্কট ও অচলাবস্থা নিরসন ঘটবে বলে আমরা মনে করি। ব্রেক্সিট নিয়ে ব্রিটেনের এই জটিল রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে থেরেসা মে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যাবেন, নাকি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু থেকে ছিটকে পড়বেন- ভবিষ্যৎই তা বলে দেবে।