দালালকে মাথাপিছু ২৫ লক্ষাধিক টাকা দেয়ার পর বিভিন্ন দেশ ঘুরে মেক্সিকো হয়ে দুর্গম পথে স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় পদার্পণ করেও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না আরও ৮৬ বাংলাদেশি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেআইনি পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় মার্কিন সীমান্ত রক্ষী কর্তৃক গ্রেফতার হয়ে দু’বছরের বেশি সময় অভিবাসন দফতরের ডিটেনশন সেন্টারে থাকার পর এদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছে।

‘ইউএস ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট’ তথা আইসের পক্ষ থেকে গতকাল সোমবার এ তথ্য জানিয়ে বলা হয়, ‘এসব বাংলাদেশির সবাই রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু সে আবেদনের সমর্থনে কোন প্রমাণাদি প্রদর্শনে সক্ষম হননি কেউই। বাংলাদেশে তারা বিরোধী দল তথা বিএনপির কর্মী/সমর্থক হিসেবে ক্ষমতাসীন সরকার কর্তৃক অকথ্য নির্যাতনের শিকার, জেল-জুলুমের আশঙ্কা এবং প্রাণনাশের আশঙ্কা ছিল বলেই তারা সকলে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন বলে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এমন বক্তব্যের সমর্থনে কোন ডকুমেন্ট প্রদর্শনে সক্ষম হননি তারা। বাংলাদেশ থেকে প্রয়োজনীয় ডক্যুমেন্ট সংগ্রহের জন্যে বেশ কয়েক দফা সময় চেয়েও তারা তা আনতে সক্ষম হননি। অর্থাৎ তারা কেউই বিএনপির কর্মী/সমর্থক হিসেবে ক্ষমতানীর সরকারের নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার বলে অভিবাসন দফতরকে কনভিন্স করতে সক্ষম হননি।

প্রসঙ্গত, গত বছর দুই হাজারের অধিক বাংলাদেশি মেক্সিকো হয়ে বেআইনি পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় গ্রেফতার হন। এদেরকে টেক্সাস, আরিজোনা, আলাবামা, লুইঝিয়ানা, ক্যালিফোর্নিয়া, পেনসিলভেনিয়া, ফ্লোরিডাসহ বিভিন্ন রাজ্যের ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ছিলেন টেক্সাসের এল পাসো ডিটেনশন সেন্টারে। বছরাধিককাল অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও মুক্তি না পাওয়ায় গত বছরের শেষার্ধে এল পাসো ডিটেনশন সেন্টারের অর্ধ শতাধিক বাংলাদেশী অনশন ধর্মঘট শুরু করেছিলেন। তাদের সাথে ভারতীয় এবং পাকিস্তানীরাও অংশ নেন সেই ধর্মঘটে। টানা ৭ দিনের অনশনে বিচলিত বোধ করেন মার্কিন প্রশাসন।

ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় সেই ধর্মঘটের অবসান ঘটানো সম্ভব হলেও অধিকাংশকেই জামিনে মুক্তি দেয়া হয়নি। যারা বিভিন্ন শর্থে মুক্তি লাভ করেছেন তারাও কোর্টের নিয়ন্ত্রণে দিনাতিপাত করছেন। যারা মুক্তি পাননি তাদের মধ্যে দেড় শতাধিককে এ বছরের শুরুতে দু’দফায় বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে মার্কিন বিমানে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৮৬ জনের মধ্যে ৪৬ জনের একটি তালিকা মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। এরা বাংলাদেশী কিনা তা নিশ্চিত হতে চায় মার্কিন প্রশাসন। কারণ এরা বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করলেও নাগরিকত্ব সম্পর্কিত সঠিক কোন ডক্যুমেন্ট সরবরাহ করতে পারেননি। তারা অভিবাসন আদালতকে জানিয়েছেন যে, দুর্গম পথ পাড়ি দেয়ার সময় পাসপোর্ট খোয়া গেছে অথবা মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকিয়ে দেয়ার সময়েই তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়েছে দালালেরা।

আইসের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, ‘রাজনীতির নামে বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও জ্বালাও-পোড়াওয়ের অসহনীয় ঘটনাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে তাদের কাছে। বিএনপি এবং জামায়াত-শিবিরের সাথে সম্পৃক্ত অনেকেই ওইসব সন্ত্রাসের সাথে জড়িত বলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।’ কর্মকর্তারা আরও বলেন, ‘দালালকে যারা বিপুল অর্থ দিয়ে ভারত/দুবাই/কুয়েত/কাতার হয়ে সেন্ট্রাল আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ঘুরে মেক্সিকো এসেছেন, তারা রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রে যে যুক্তি দেখিয়েছেন, তার কোন সত্যতা মেলেনি। এমনকি তাদের অনেকেই বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সংগঠক হিসেবেও প্রমাণপত্র মেলেনি। এজন্যে অভিবাসন দফতরের পক্ষ থেকে ওদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার স্থির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে তারা যে বাংলাদেশেরই নাগরিক সেটি নিশ্চিত হলেও মার্কিন বিমানে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হবে।’

আইস কর্মকর্তারা জানান, ‘ইতোপূর্বে যাদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়, তারা কেউই সরকারের রোষানলে পড়েনি কিংবা এয়ারপোর্ট থেকে নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছার সময়েও কোন হামলা/নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানা যায়নি। অর্থাৎ তারা যে সব যুক্তি দেখিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন, তা সঠিক ছিল না।’

অপরদিকে, ইউএস সিআইএস-এর পক্ষ থেকে জানা গেছে, রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীদের মধ্যে যারা যথাযথ ডক্যুমেন্ট প্রদর্শনে সক্ষম হয়েছেন তাদেরকে জামিনে মুক্তি দেয়ার পর ‘ওয়ার্ক পারমিট’ ইস্যু করা হয়েছে। কেউ কেউ ইতিমধ্যেই গ্রিনকার্ড প্রাপ্তির অনুমতিও পেয়েছেন।

ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিব সূত্রে জানতে পেরেছে যে, ৮৬ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পত্র পাঠিয়েছে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস। ওই পত্রে চার্টার্ড বিমানে করে দুই ট্রিপে ওই ৮৬ বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এদেরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের চূড়ান্ত আদেশ জারি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ তালিকা উপযুক্ত নথিপত্র সহ ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাছে জমা দিয়েছে। পাশাপাশি ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসে তালিকাভুক্ত বাংলাদেশি ব্যক্তিদের ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করতেও অনুরোধ করেছিল মার্কিন সরকার। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছে চলতি মাসেই দুটি ফ্লাইটে এদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে। তবে আগে থেকেই যারা অবৈধভাবে বসবাস করছেন, তারা এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়।

বহিষ্কারের অপেক্ষায় থাকা তালিকাটি এখানে দেয়া হলো : হাসান মাহমুদ, মোহাম্মদ উদ্দিন, মো. আলম, সোহরাব হোসেন, মো. মোহসিন, বাচ্চু মিয়া, জাহাঙ্গীর আলম, মোজাম্মেল হোসেন, গাজী কবির, আহম্মদ রুমন, আবুল কাশেম, মো. রহমান, এনামুল ইসলাম, মো. শিপন আহম্মেদ চৌধুরী, আবু বক্কর, মো. আজিজুর রহমান, রিপেন নজরুল, জাহিদুর রহমান, সাবুল হাসাইন, সৌরভ দেব, বিবেক কান্তি দাস, আব্দুল মাসুদ, সাব্বির আহমেদ, জয়নাল আবেদীন, মামুন আলম, মোহাম্মদ শাহাদত, হেলাল উদ্দিন, আলমগীর হোসেন, মনিরুল মুন্না, বি. হুসাইন, মো. আরাফাত, তাজুল ইসলাম, সোহরাব হোসেন, সামসুদ্দিন, আব্দুর রহীম, মোহাম্মদ ইসলাম, আকতার হুসেইন, শাহীন আহম্মেদ, নাসির উদ্দিন, ফারুক আহমদ, মোহাম্মদ রহিম, মোহাম্মদ সোহেল, আহমদ শেখ সিব্বিন, শিব্বির আহমদ, আব্দুর রহমান, মোহাম্মদ ইব্রাহীম, মোহাম্মদ ইসলাম, মো. ইসলাম, রাশেদুল ইসলাম, জাহেদ আহমদ, আবু সাঈদ, মোহাম্মদ ভূঁইয়া, হাসান মোহাম্মদ, শরিফুল হাসান, মো. ওহিদুর রহমান, মোহাম্মদ উদ্দিন, এনায়েত করিম, রিপন সর্দার, ফয়েজ মোল্লাহ, আব্দুস সামাদ, বশির বাবু, মোহাম্মদ হুদা, মোহাম্মদ রহমান, মাইনুল ইসলাম, অহিদুল ইসলাম, সুলতানুল আরফিন, মিনহাজুর রহমান, হুমায়ুন কবির, নাসের এম. ডাবু, আব্দুল রহমান, মোহাম্মদ ইসলাম, মামুনুর রশীদ, রুহুল আমিন, কালু চৌধুরী, নূরল আলম, শরীফ উল্লাহ, মালিক খসরু, আকরাম হোসেন, আব্দুর রাজ্জাক, মোহাম্মদ আল আমিন, অসীম চন্দ্র দাস, আসাদুল সিদ্দিকী, মিল্টন রোজারিও, ইকবাল হোসেন ও মো. শফিকুল আলম। মার্কিন প্রশাসনের কাছে এদের ঠিকানা নিয়ে সন্দেহ-সংশয় থাকলেও অধিকাংশই সিলেট ও নোয়াখালী অঞ্চলের বলে জানা গেছে। সকলেরই বয়স ২৮ বছরের নিচে। সকলেই উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি পাশ বলেও শোনা গেছে।

LEAVE A REPLY