রাজধানীতে সিন্ডিকেটের খপ্পরে সাত পশুরহাট

0
40
রাজধানীতে সিন্ডিকেটের খপ্পরে সাত পশুরহাট
রাজধানীতে সিন্ডিকেটের খপ্পরে সাত পশুরহাট

সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে রাজধানীর কোরবানির পশুর হাট। সিন্ডিকেটের কারণে এখনও সাতটি হাটের ইজারা হয়নি। ফলে পুন:দরপত্রের বিজ্ঞপ্তির মারপ্যাঁচে পড়েছে হাটগুলো। এমনকি সময় কম হওয়াতে এবার এই সাত হাট ইজারা দেওয়া সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তারা বলছেন, এ বিষয়টি সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে। হাটগুলোর ব্যাপারে তারা যে সিদ্ধান্ত দেবেন সিটি করপোরেশন তাই বাস্তবায়ন করবে।

দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, ২০টি অস্থায়ী হাটের মধ্যে সাতটির ইজারা এখনও সম্পন্ন হয়নি। অর্থাৎ কাক্সিক্ষত মূল্য না পাওয়ায় পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অথচ চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২২ বা ২৩ আগস্ট ঈদুল আজহা উদযাপিত হতে পারে।

ফলে ঈদের বাকি রয়েছে মাত্র ১২/১৩ দিন। রাজধানীর হাটগুলোতে কমপক্ষে সাত দিন আগে থেকেই আসতে শুরু করবে কোরবানির পশু। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গরু, ছাগল, মহিষ, উট এসে ভিড় জমাবে রাজধানীর হাটগুলোতে। কিন্তু যে হাটে পশু ওঠানো হবে সেই হাটের বড় একটি অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীনতায়। ঝুলে আছে পুন:দরপত্র বিজ্ঞপ্তির মারপ্যাঁচে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, টেন্ডারে অংশ নিলে নির্ধারিত সরকারি দরের বেশি দর দিয়ে হাট ইজারা নিতে হয়। এজন্য এবার সিন্ডিকেট করে কোন দরপত্রই জমা দেওয়া হয়নি। যাতে এক সময় সিটি করপোরেশন বাধ্য হয়ে খাস আদায়ে যেতে বাধ্য হয়। তখন এসব ব্যক্তিই যোগসাজশ করে কম দরে হাট নিজের অনুকূলে নিতে পারেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত কয়েক বছর ধরে একচ্ছত্রভাবে সিন্ডিকেট করে লোক দেখানো কৌশলী টেন্ডারের মাধ্যমে কুরবানির পশুরহাট ইজারা নিলেও এ বছর আরেক ধাপ এগিয়ে কোন রকম টেন্ডার ছাড়াই হাট বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এ কারণে সিটি করপোরেশন টেন্ডার আহবান করলেও তাতে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি অনেকে দরপত্র কেনার পরও তাদের জমা দিতে দেওয়া হয়নি। এতে বিপুল অংকের রাজস্ব হারাবে সরকার।

হাটের ইজারা সম্পর্কে উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়। জমা পড়া দরপত্রের কাগজপত্র ঠিক থাকলে শীর্ষ দরদাতাকে ইজারা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে কে কোন দল করে, তা বিবেচ্য বিষয় না। অবশ্য সরকারি দরের চেয়ে কম দর হলে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়। আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের আটটি হাটের মধ্যে সাতটির ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। শুধু উত্তরখানের হাটটি এখনও ইজারা হয়নি। সেটার জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যার প্রক্রিয়া এখনও চলমান।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মোট ২১টি স্থানে পশুর হাট বসানো হবে এবার। এর মধ্যে গাবতলী স্থায়ী হাট বাদে বাকি ২০টি ঈদের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে বসানো হচ্ছে। এসব হাটের জন্য মূল্য নির্ধারণ করে মাসখানেক আগেই পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এবার সেই নিয়মে দরপত্র আহ্বান করা হলেও সম্পন্ন হয়নি সব হাটের ইজারা।

এ বছর ডিএনসিসির সাতটি পশুর হাটের সরকারি ইজারামূল্য ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৮৫ লাখ ৫৩ হাজার ৭৭ টাকা। আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৩টি অস্থায়ী হাটের ইজারামূল্য ধরা হয়েছে ১২ কোটি ১৮ লাখ ৩৭ হাজার ৬৭৫ টাকা।

ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, যে সাতটি হাটের বিপরীতে কোনো দরপত্র জমা পড়েনি ওইসব হাটের জন্য দরপত্র বিক্রি হয় ২০টি। এর মধ্যে মেরাদিয়া বাজারসংলগ্ন খালি জায়গার হাটের জন্য সাতটি, ব্রাদার্স ইউনিয়নের বালুর মাঠ একটি, কমলাপুর স্টেডিয়ামের আশপাশের খালি জায়গার জন্য একটি, আরমানিটোলা খেলার মাঠসংলগ্ন খালি জায়গার জন্য ছয়টি, ধুপখোলা ইস্ট অ্যান্ড ক্লাব মাঠসংলগ্ন খালি জায়গার জন্য একটি, দনিয়া কলেজ মাঠসংলগ্ন খালি জায়গার জন্য চারটি দরপত্র কেনা হয়। তবে সাদেক হোসেন খোকা মাঠের আশপাশের খালি জায়গার হাটের বিপরীতে কোনো দরপত্র কেনেননি কেউ।

এদিকে যে ছয়টি হাটের বিপরীতে দরপত্র জমা পড়েছে সেখানে অনেকে দরপত্র কিনে জমা দিতে পারেননি। কামরাঙ্গীরচর হাটের জন্য তিনটি দরপত্র কিনলেও জমা পড়ে মাত্র একটি, শ্যামপুরে হাটের জন্য পাঁচটি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়ে একটি, রহমতগঞ্জ হাটের জন্য চারটি বিক্রি হলেও জমা পড়ে তিনটি, পোস্তাগোলা হাটের জন্য সাতটি বিক্রি হলেও জমা পড়ে পাঁচটি, জিগাতলার জন্য সাতটি বিক্রি হলেও জমা পড়ে পাঁচটি। তবে শাজাহানপুর হাটের জন্য চারটি দরপত্রের সবগুলোই জমা পড়েছে।

একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রথমে সাতটি হাটের টেন্ডার আহ্বান করলেও একটি হাটের বিপরীতে কোনো দরপত্রই জমা পড়েনি। অন্যগুলোতেও অল্পসংখ্যক দরপত্র জমা পড়ে।

হাটবাজার বরাদ্দ নীতিমালা-২০১১ অনুযায়ী, আগের বছরের ইজারার সঙ্গে ২৫ শতাংশ মূল্য বাড়িয়ে সর্বনিম্ন দর নির্ধারণের নিয়ম পাল্টে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। এতে ইজারাদারের মুনাফা অর্জনের পথ আরও সহজতর হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানি পশুর হাটের ইজারা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকা শহরকে মেলানো যাবে না। গ্রাম, উপজেলা বা জেলার ক্ষেত্রে গত বছর জারি করা প্রজ্ঞাপনের যৌক্তিকতা থাকলেও রাজধানী ঢাকা বা মহানগরগুলোর ক্ষেত্রে এ নিয়ম ঠিক নয়। ঢাকা শহরের ইজারাদাররা ইজারামূল্যের চেয়ে ৮-১০ গুণ বেশি মুনাফা করেন। অথচ এসব হাটের ইজারামূল্য আরও কমানো হয়েছে। এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।

এ প্রসঙ্গে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আব্দুল মালেক আজকালের খবরকে বলেন, নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। নিয়ম মেনে যদি সব হাট কোনো দলের লোক পেয়ে যায়, তাহলেও কিছু করার নেই। আমাদের ১৩টি অস্থায়ী হাটের মধ্যে সাতটি ইজারা হয়েছে, বাকি ছয়টির জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। তারা যেভাবে বলবে সেভাবেই বাকি হাটগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। তিনি আরও বলেন, এইর মধ্যে সিটি করপোরেশন থেকে আমাকে বদলি করে বিজি প্রেসে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে এর বেশি আর কিছু বলতে পারছি না।

এদিকে ঢাকা শহরে কোরবানির হাটের সংখ্যা বৃদ্ধি চেয়ে মেয়রের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন রাজধানী ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণের জনগণ। কোরবানির হাট অপ্রতুল থাকায় তাদের এলাকাগুলোতে জনগণ কি সমস্যায় পড়ছে তা-ও চিঠিতে উল্লেখ করেন তারা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ উভয় সিটি করপোরেশনের মেয়র বরাবর গত মঙ্গলবার এই চিঠি পাঠানো হয়।

রাজধানী উত্তরের রামপুরা থানার জনগণ চিঠিতে জানান, কয়েক বছর পর্যন্ত হাটের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে। ঢাকা উত্তরে মোট জনসংখ্যা এক কোটি; কিন্তু হাটের সংখ্যা মাত্র সাতটি। ফলে গড়ে ১৩ লাখ জনগণের জন্য হাটের সংখ্যা মাত্র একটি। চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রতি হাটে এক সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হওয়ায় বেপারিরা গরুর দাম বাড়িয়ে দেয়, ফলে পশুর মূল্য মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। ফলে অনেকেই কোরবানি দিতে পারেন না। মেয়রের কাছে তারা হাটের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দ্রুত সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান।

এ বছর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের গাবতলী স্থায়ী হাটসহ আটটি স্থানে হাট বসবে। এর মধ্যে রয়েছে- উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের ২ নম্বর ব্রিজের পশ্চিমে গোলচত্বর পর্যন্ত সড়কের উভয় পাশের ফাঁকা জায়গা, মিরপুর ডিওএইচএসের উত্তর পাশের সেতু প্রোপার্টি সংলগ্ন খালি জায়গায়, মিরপুর সেকশন-২ (ইস্টার্ন হাউজিং) এর খালি জায়গা, মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবী সড়ক সংলগ্ন (বছিলা) পুলিশ লাইনের খালি জায়গা, আশিয়ান সিটি হাউজিং, খিলক্ষেত বনরূপা আবাসিক প্রকল্পের খালি জায়গা, ভাটারা (সাঈদ নগর) হাট এবং গাবতলী স্থায়ী পশুরহাট।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৩টি স্থানে অস্থায়ী পশুর হাট বসানো হবে। এসব হাটের মধ্যে রয়েছে- মেরাদিয়া বাজার সংলগ্ন খালি জায়গা, উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজারের মৈত্রী সংঘের মাঠ সংলগ্ন খালি জয়গা, ব্রাদার্স ইউনিয়নের বালুর মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা, কমলাপুর স্টেশনের আশপাশের খালি জায়গা, জিগাতলার হাজারীবাগ মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা, রহমতগঞ্জ খেলার মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা, কামরাঙ্গীরচর ইসলাম চেয়ারম্যানের বাড়ির মোড় থেকে দক্ষিণ দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর বাঁধ সংলগ্ন খালি জায়গা, আরমানিটোলা খেলার মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা, ধূপখোলা ইউ অ্যান্ড ক্লাব সংলগ্ন খালি জায়গা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন খালি জায়গা, দনিয়া কলেজ মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা, শ্যামপুর খালি জায়গা সংলগ্ন খালি জায়গা, সাদেক হোসেন খোকা মাঠের পাশে ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল সংলগ্ন খালি জায়গা।

LEAVE A REPLY