রাজনীতির বরফ কি গলছে!

142
রাজনীতির বরফ কি গলছে!
রাজনীতির বরফ কি গলছে!

আগামী নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে বৈরিতার বরফ কি গলতে যাচ্ছে? শুক্রবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফের আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আসুন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ বের করি।’ আগের দিন বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপির সঙ্গে আলোচনার ইঙ্গিত দিলে বিএনপির পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল তার দলের ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরেন। এই অবস্থায় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, দেশের প্রধান দুই দলের মধ্যে সংলাপ বা আলোচনা কি হতে যাচ্ছে?

একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান ইস্যুতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বরাবরই বিদ্যমান সংবিধানের ভেতরে থাকার জন্য সুস্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছে। এর ঠিক উল্টো দিকে বিএনপির অবস্থান। তাদের দাবি সংবিধানের বাইরে গিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। দীর্ঘদিন থেকেই বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সরকারকে আলোচনার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বলা হচ্ছে- সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো সংলাপের সুযোগ নেই।

শুক্রবার বিকেলে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিন সিটি নির্বাচন নিয়ে সর্বশেষ দলের অবস্থা জানাতে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় ‘বিএনপি আগ্রহ প্রকাশ করলে নির্বাচন নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে।’ বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে দেওয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এমন ইঙ্গিতের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে মির্জা ফখরুলের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়। এর জবাবে বিএনপি মহাসচিব জানান ‘আমরা তো বরাবরই আলোচনা চেয়ে আসছি। একটা সুস্থ অবস্থায় যাওয়ার জন্য, সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ বের করতে তাদের (আওয়ামী লীগ) সঙ্গে আলোচনার আহ্বান সবসময় জানাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকে আপনাদের মাধ্যমে আবার আহ্বান জানালাম আসেন, আলোচনায় বসি, কথা বলি। কোথায় বসবেন? কী করবেন বলেন? আমরা সব সময় প্রস্তুত আলোচনার জন্য।’

আলোচনা চেয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদককে ফোন করবেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আইডিয়াটা আপনারা দিলেন, আমরা ভেবে দেখি। তবে তারা কল করলে, আমরা কলব্যাক করব।’

এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে জোট গঠনের তোড়জোড় চলছে রাজনীতির মাঠে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত কয়েক দিনে তৃণমূল বিএনপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নাজুমল হুদা, কৃষক, শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দীকি ও সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেছেন। এই অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাজধানীর এলেনবাড়ির বিআরটিএর সদর কার্যালয়ে আসন্ন ঈদযাত্রা নির্বিঘ্নে করতে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় সাংবাদিকরা জানতে চান নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আপনি বৈঠক করছেন। বিএনপির সঙ্গে কোনো সাক্ষাৎ বা আলোচনা হবে কি না?

এর জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘রাজনীতিতে বিরোধী পক্ষের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা থাকলে অনেক সমস্যার সহজ সমাধান হয়। আমি কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে গিয়েছি। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সাহেব আমরা একসঙ্গে রাজনীতি করেছি। নানান ব্যস্ততার জন্য তাদের অফিসে যাওয়া হয়নি। হয়তো যেতে চেয়েছি, তিনি তখন অফিসে নেই। কাল (বুধবার) তিনি অফিসে ছিলেন, আমি গিয়েছি। এটা সৌজন্য সাক্ষাতের অংশ।’

তিনি আরও বলেন- ‘আলোচনা হতে পারে। আলোচনা হতে তো আর সমস্যা নেই। প্রত্যেক দলেরই একটা সিদ্ধান্ত আছে। নেতারা আসবেন, অনেক নেতার সঙ্গেই আমার কথা হয়। আজকেও হবে। এ সপ্তাহেও হবে। কেউ আমাদের সঙ্গে আলোচনা করার ইচ্ছে প্রকাশ করলে আমরা আলোচনা করবো না! অবশ্যই করবো।’
আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, ‘রাজনীতিতে যতটা সম্ভব একটা ওয়ার্কিং আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকা দরকার। আমার সঙ্গে যে-ই কথা বলতে চেয়েছেন আমি তার সঙ্গেই কথা বলছি। আর মির্জা ফখরুল সাহেব আমার সঙ্গে কোনোদিনও কথা বলেননি, কাজেই আমি কীভাবে তাদের সঙ্গে কথা বলবো? তিনি সমস্যা হলে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে, পুলিশের আইজির সঙ্গে। তিনি একবারও আমার সঙ্গে কথা বলেননি। অবশ্য তার কিছু সমস্যা আছে, সেটা আমি বুঝি।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের এমন ইঙ্গিতের পরদিনই বিএনপির পক্ষ থেকে স্বাগত জানিয়েছেন দলের সিনিয়র নেতা নজরুল ইসলাম খান। গতকাল শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘ভালো। আলহামদুলিল্লাহ। আমরা তো বহুবার বলেছি। আমাদের নেত্রী সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন এবং আমরা বিবৃতি দিয়ে বলেছি, আমাদের কিছু দাবি রয়েছে, সেই দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করতে চাই।’

ওবায়দুল কাদেরের এ বক্তব্য প্রসঙ্গে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যদি আলোচনায় আসতে চায় তাহলে আমার মনে হয়, এটা একটা ভালো লক্ষণ। যুদ্ধ যখন চলে তখন আলোচনার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে। আর আমরা তো যুদ্ধ করছি না। আমরা আন্দোলন করছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আলোচনার মাধ্যমে সন্তোষজনক অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। তাই আমরা এটাকে স্বাগত জানাবো।’

আর এই সংলাপ বা আলোচনা নিয়ে গতকাল শুক্রবারও ওবায়দুল কাদের কথা বলেছেন। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মেট্রোরেলের কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘রাজনীতিতে ওয়ার্কিং আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের (সম্পর্ক) জন্য বিএনপির নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা হতে পারে।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বাকি আর মাত্র পৌনে তিন মাস। এর মধ্যেই আনুষ্ঠানিক সংলাপের কোনো প্রয়োজন নেই। সবকিছুই কি আনুষ্ঠানিক হতে হবে। চোখে দেখাদেখি না হোক, টেলিফোনে তো অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা হতে পারে। এতে করে নিজেদের দূরত্ব কমে যায়। টেলিফোনে কথা বললে সমস্যা কোথায়।’

রাজনীতিতে এ সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শান্তিপূর্ণভাবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার রদবদল করাই এ মুহূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডা। তাই সংলাপের মূল বিষয় হতে হবে গণতান্ত্রিক উপায়ে জনগণের ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা ও রাষ্ট্রযন্ত্রে তার প্রতিফলন। একমাত্র সাংবিধানিকভাবে নির্বাচনের মাধ্যমেই তা সম্ভব।

যদিও দেশের রাজনৈতিক সংলাপের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সাফল্যের নিদর্শন নেই বললেই চলে। সাফল্য তো অনেক পরের কথা, অতীতের সংলাপের উদ্যোগগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো রকম আস্থা পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারেনি। তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলাকালে শেষ দিকে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে কমনওয়েলথ-এর বিশেষ দূত হিসেবে স্যার নিনিয়ান স্টিফেন ঢাকায় এসেছিলেন। ১৯৯৪ সালের নভেম্বরে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে তিনি দফায় দফায় আলোচনাও করেছিলেন। কিন্তু তাতে কোনো ইতিবাচক ফল লাভ হয়নি। ২০০৬ সালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল এবং বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার মধ্যে সংলাপও ব্যর্থ হয়েছিল। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত হিসেবে ঢাকা সফর করেছিলেন অস্কার ফার্ন্দানেজ তারানকো। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পরেও তার মিশন ব্যর্থ হয়েছিল। ওই সময়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সংকট নিরসনে জাতিসংঘ মহাসচিব নিজে টেলিফোনে আলাপ এবং চিঠি পাঠিয়েছিলেন প্রধান দুই নেত্রীর কাছে। সর্বশেষ দশম নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার মধ্যে টেলিফোন সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবন গণভবনে খালেদা জিয়াকে সংলাপের আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু সে আমন্ত্রণে সাড়া দেননি খালেদা জিয়া। সেই টেলিফোন সংলাপও ব্যর্থ হয়েছিল।