রাজনৈতিক সমঝোতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে বিএনপি

10

বাংলাদেশ রিপোর্ট ॥ সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারামুক্তির কোনো সম্ভাবনা দেখছে না বিএনপি। চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ক্ষমতাসীন দলের মনোভাব বিশ্লেষণ করে বিএনপির নেতারা মনে করছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় কিংবা রাজপথের কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলে দলের শীর্ষনেত্রীকে মুক্ত করা সম্ভব নয়; সমঝোতাই শ্রেয়তর।
উপায়ান্তর না পেলে শেষ পর্যন্ত যদি চিকিৎসার খাতিরেও সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়, আপত্তি করবে না বিএনপি। দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা সরকারের নানা পর্যায়ে ইতোমধ্যেই এ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যু নিয়ে সরকারের কোনো পর্যায়ের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে কিনা, এমন প্রশ্নে সায় দিয়েছেন বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে নানা পর্যায়েই আলোচনা চলছে।’
এদিকে কেন্দ্র ও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে যারা দলনেত্রীর ‘অন্ধ ভক্ত’, তাদের কারণে বেশ মানসিক চাপে রয়েছেন বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। এসব নেতাকর্মী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রাজপথে কঠোর কর্মসূচির দাবি তুলেছেন। তারা এক মুহূর্তও দেরি করতে চান না।
নেত্রীর ভক্ত নেতাকর্মীরা সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চলাকালে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য হরতাল-অবরোধসহ রাজপথে কঠোর কর্মসূচি দিতে প্রকাশ্যেই দাবি তুলেছেন, তুলছেন। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিএনপি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে নেতাকর্মীদের প্রবল চাপসহ এ সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা হয়।
দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যুতে ন্যূনতম কর্মসূচি না দিলে নেতাকর্মীদের শান্ত রাখা দুঃসাধ্য হবে। তাই নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এখন থেকেই মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচির মতো কিছু কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে স্বল্প বিরতি দিয়ে দিয়ে। সম্প্রতি খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে বিএনপি।
নতুন ও কঠোর কোনো কর্মসূচি না দিলেও নেতারা মনে করছেন, এই মানববন্ধনের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের কিছুটা হলেও শান্ত করা গেছে। এ নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা বলেন, যে কোনোভাবেই হোক আমরা খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। এ ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া এখন আমাদের সামনে আর কোনো উপায় দেখছি না। তবে সরকারের সঙ্গে আলোচনা যেমনই হোক, সূত্রের খবর, সমঝোতার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন খালেদা জিয়া নিজে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। এক বছর হয়ে গেল তিনি বন্দি। বহুবার আমরা তার জামিনের চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। সরকারের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই জামিনযোগ্য মামলাতেও তিনি জামিন পাচ্ছেন না। ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে এ মুহূর্তে মুক্ত করা সম্ভব নয়। কারাগারে তিনি সীমাহীন কষ্টে ভুগছেন।
যেভাবে চলছে, এভাবে চলতে থাকলে খুব স্বল্প সময়ে তার সুস্থতা অসম্ভব। এ অবস্থায় তাকে মুক্ত করতে প্যারোলের বিষয়টিও আমরা ভেবে দেখছি। গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি আছেন ৭৩ বছর বয়সী খালেদা জিয়া। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাকে প্রথমে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়। পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) রিভিউ আবেদনের পর আদালত সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করেন। এ মামলায় দন্ডিত হয়ে কারাগারে যাওয়ার আট মাসের মাথায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে আদালত সাত বছরের কারাদ- দেন। বিএনপি বরাবরই বলে আসছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভিত্তিহীন মামলায় খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় আমাদের সময়কে বলেন, রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে ভিত্তিহীন মামলায় আদালতকে ব্যবহার করে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়া হয়েছে। আমরা তার নিঃশর্ত মুক্তি চাই। দলটির নেতারা মনে করেন, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে তাদের হাতে মূল অস্ত্র ছিল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
এ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হোকÑ আন্তর্জাতিক মহলের এমন প্রত্যাশার কারণে এ নিয়ে সরকার বড় ধরনের চাপে ছিল। পরিস্থিতি অনুধাবন করে স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বরচন্দ্র রায় ওই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিরুদ্ধে ছিলেন। যদিও নির্বাচনের বিষয়ে দল ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তারা কোনো বিরোধিতাও করেননি। এ প্রসঙ্গে বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির দুটি জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০-দলীয় জোট সাত দফা দাবিতে কর্মসূচি দিয়েছিল। নিরপেক্ষ সরকার ও খালেদা জিয়ার মুক্তিই ছিল এসব দফার মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সরকার কোনো দাবি না মানলেও নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল বড় ভুল সিদ্ধান্ত। আসলে বিএনপি জোট যে নির্বাচনে অংশ নেবে, এটা সরকারের শীর্ষমহল আগেই নিশ্চিত ছিল বলে কোনো দাবিই মানেনি। খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রসঙ্গ টেনে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, শুধু চিকিৎসার কারণে হলেও খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। বাংলাদেশে আজ যিনি প্রধানমন্ত্রী, তার বেলায়ও এমন নজির রয়েছে। তিনি যখন কারাগারে বন্দি ছিলেন, চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে তিনি বিদেশে গিয়েছেন। তাই আমাদের প্রথম দাবি, খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে, যেন তিনি বিদেশে গিয়ে বা দেশে তার পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেন। সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, খালেদা জিয়া রিউমেটরিটক আর্থারাইটিস, ডায়াবেটিস ম্যারিটা, হাইপারটেনশন, অস্ট্রিও আর্থারাইটিস, টানেল সিসেড্রাম, ফ্রোজেন স্লোডার, লাম্বার স্টোনাইসিস, থাইটিকা, ক্রনিক হাইপো নিথ্রেমিয়া, ক্রোনিক কিডনি রোগে ভোগছেন। এসব রোগ এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। গতকালও মির্জা ফখরুল জানিয়েছেন, খালেদা জিয়া এখন এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন যে, সোজা হয়ে বসতেও পারছেন না। খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সরকারের সঙ্গে নেপথ্যে সমঝোতা করার যে গুঞ্জন রাজনৈতিক মহলে চাউর হয়েছে, এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলে বিএনপি মহাসচিব অবশ্য অস্বীকার করেন। বলেন, এগুলো স্রেফ গুজব। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশে এমন গুজব ছড়ানো হচ্ছে।