শ্মশানের ম্যানেজার ধর্মেন্দ্র বলছেন, “এই শ্মশানে প্রথম এতগুলি চিতা একসঙ্গে জ্বলছে”।

39

এত ধোঁয়া যে চোখ খুলে রাখা দায়। রীতিমতো জ্বালা করছে দু’চোখ। কান বন্ধ হয়ে আসছে কান্নার রোলে। উপস্থিত পরিবারের লোকজন বা প্রশাসনিক কর্তারা তো কোন ছাড়, এমন দৃশ্য কস্মিনকালেও দেখেননি খোদ ডোমরাই। শুক্রবার রাতে অমৃতসরের জোরা ফাটক এলাকার ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় মুহূর্তে লাশ হয়ে যাওয়া ৩১ জনের এ দিন দাহ হল শিবপুরি দুর্গিয়ানা শ্মশানে। সেখানে গিয়েই চোখে পড়ল এই দৃশ্য। সে দিন রাতের দুর্ঘটনা যদি হাড় হিম করা হয়, তাহলে এ দিনের আবহ মাথা অবশ করে দেয়। শ্মশানের ম্যানেজার ধর্মেন্দ্র বলছেন, “এই শ্মশানে প্রথম এতগুলি চিতা একসঙ্গে জ্বলছে”। উল্লেখ্য, শনিবার অমৃতসরে মোট ৩৮টি দেহ দাহ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৫টি দেহ ৩ থেকে ১৩ বছরের শিশুদের। পরিবারের ইচ্ছায় ৪টি দেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে উত্তরপ্রদেশে। মন্দির কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এইসব দাহের জন্য পরিবারগুলির থেকে কোনও টাকা নেওয়া হবে না।

জ্বলছে চিতা।
একটু দূরেই দেখা গেল শোকস্তব্ধ এক যুবক গৌরব দোগরাকে। হাত জোড় করে সামনের চারটি চিতার দিকে অপলক তাকিয়ে রয়েছেন তিনি। এই চিতাগুলির একটিতে তাঁর বোন, আরেকটিতে ভগ্নিপতি এবং বাকি দুটিতে তাঁর ভাগ্নে-ভাগ্নি। “আমাদের পরিবারটা পুরো শেষ হয়ে গেল, জানেন…বাচ্চাগুলো শুধু বলত, মামু শ্মশানে কখনও যায়নি একদিন যাব…” বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন গৌরব। কোনও রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে এরপর গৌরব জানালেন, লাশগুলো খুব বাজে অবস্থায় ছিল। এ জন্য তাঁরা প্রথমে শনাক্তই করতে পারছিলেন না। তারপর এ দিন সকালে শেষ পর্যন্ত দেহ চিনতে পেরেছেন। ইতিমধ্যে গৌরবের ভাই রাহুল উপস্থিত হয়েছেন। তিনি বলছেন, “আমার সঙ্গেই ওঁদের শেষ দেখা হয়েছে। দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই আমি গিয়েছিলাম দশেরার শুভেচ্ছা জানাতে। দিদি, জামাইবাবুকে বললেন আমার জন্য স্প্রিং রোল আর জিলিপি নিয়ে আসতে…বাচ্চাগুলোর গলার আওয়াজ, ওদের ‘মামু…মামু’ ডাক আমি এখনও শুনতে পাচ্ছি। কয়েক বছর আগে আমাদের বামা-মা চলে গিয়েছেন, এবার দিদির পরিবারও চলে গেল, এ দজতে আমাদের আর কেউ রইল না…”, এটুকু বলেই চোখ ভিজে গিয়েছে রাহুলের, তিনি আর কথা বলার মতো অবস্থায় নেই।

আরও পড়ুন- ‘‘এমার্জেন্সি ব্রেক ব্যবহার করেও সময়মতো থামাতে পারিনি, পাথর ছোড়া শুরুর পর ট্রেন চালিয়ে দিয়েছি’

গৌরব-রাহুলদের এই হা-হুতাশ শুধু একটি পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এদিন শিবপুরি দুর্গিয়ানা শ্মশানের যে কোনও দিকে চোখ মেললেই চোখ ভিজে যেতে বাধ্য। স্বজন হারানোর যন্ত্রণায় ক্ষোভে দুঃখে মানুষগুলো যেন উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন। এর মধ্যেই প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিলেন দুর্ঘটনায় মৃত ১৬ বছরের শচিনের বাবা নভজিত সিং। পুত্রশোকে আকুল বাবার প্রশ্ন, “জীবনে প্রথমবার আমার ছেলে মেলা দেখতে গিয়েছিল, কিন্তু আর ফিরল না। দেশের যাবতীয় নিরাপত্তা কি কেবল ভিআইপি-দের জন্যই? কেন ওইরকম একটা বিপদসঙ্কুল জায়গায় (রাবন দহনের) অনুমতি দেওয়া হয়েছিল? ওখানে আগুন এবং ট্রেন দুটিই ছিল, কেউ এটা দেখল না কেন”?

শোকার্ত পরিবার।
আরও পড়ুন- “সতর্ক করা হলেও প্রতি বছরই আমরা রেল লাইনের উপর দাঁড়াতাম”

শচিনের মা পরমজিত কৌর আবার ছেলের শেষ ইচ্ছাটা মেটাতে না পারার যন্ত্রণায় কাতর। তিনি জানাচ্ছেন, শচিন মেলায় যাওয়ার আগে তাঁর থেকে ১০ টাকা চেয়েছিল। কিন্তু, তিনি বলেছিলেন, টাকা নেই। এরপরই সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ শচিনকে ঘরে ফেরার জন্য ফোন করেন পরমজিত, আর ফোনটা ধরেন অন্য কেউ। তখনই সর্বনাশের কথা জানতে পারেন এবং দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যান। আর এরপর সব শেষ। নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে পরমজিত বলছেন, “আমি চাই না আর কারও সন্তান রাবণ দহন দেখতে যাক, তাহলে তারাও আর ফিরে আসবে না”।

আরও পড়ুন- রেল লাইনের পাশে দশেরা উদযাপনের কথা জানতই না রেল কর্তৃপক্ষ

শিবপুরি দুর্গিয়ানায় উপস্থিত হয়ে এ দিন বেশ বোঝা যাচ্ছিল যে শ্মশানের চিতায় যে ৩১টা লাশ পুড়ছে তা শুধু লাশ নয়, স্বপ্নের লাশ। আর সেই লাশ দহনের অভিঘাতে পৌরাণিক গল্প ও বিশ্বাসেও যেন ঘটে গিয়েছে উলাট পুরাণ। না হলে, যে রাবণ দহনকে শুভ শক্তির দ্বারা অশুভ শক্তির বিনাশের উদযাপন হিসাবে দেখা হয়ে এসেছে এতকাল, এবার তাতেই অংশ নিতে বারণ করছেন সন্তানহারা মা…