সময় যেন ‘আমাদের সময়’-এর হাতেই থাকে

0
19

আইএলও সাংবাদিকতাকে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছে। কোনো সন্দেহ নেই এতে। স্বদেশ কিংবা বিদেশ, বিশ্ব প্রেক্ষাপটÑ যে কোনো বিবেচনাতেই। বিশ্বের বিভিন্ন সাংবাদিকের নিরাপত্তাহীন জীবনের চালচিত্র দেখছি। বিশ্বজুড়েই ঘটছে সাংবাদিক হত্যা। গত বছর সারাবিশ্বে অসংখ্য সাংবাদিক নির্যাতন, সন্ত্রাসী হামলা এবং বিভিন্ন কালাকানুনের দাপটের শিকার হয়েছেন। আছে প্রাণনাশের হুমকি, লাঞ্ছনা, অপহরণ, গুম, পুলিশি নির্যাতনও। বিশ্বের কোনো জনপদই এখন সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকিহীন নয়। অসহিষ্ণু, অসহনশীল, অগণতান্ত্রিক পরিবেশে যেখানে সাংবাদিকদের একটি শব্দ লিখতে গেলে অন্তত তিনবার ভাবতে হয়, সেখানে স্বাধীন সাংবাদিকতা সারাবিশ্বেই একটি মিথ। তবে এসবের পাশাপাশি আশাবাদী হওয়ার মতো খবরও আছে। রাষ্ট্রের অন্যায় গোপনীয়তার বিরুদ্ধে এবং তথ্যের অবাধপ্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য আইকন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে অপরাহ উইনফ্রে আছেন কালপুরুষ নক্ষত্রের মতো। আমাদের বাতিঘর হয়ে আছেন মোনাজাতউদ্দীন। এমন সাংবাদিকদের কারণে পাঠক হিসেবে সংবাদমাধ্যমের কাছে আমাদের কিছু প্রত্যাশা তৈরি হয়। সংবাদপত্র সমাজের বাইরে নয়। সমাজের নৈতিক পতন ঘটলে সাংবাদিক ও সংবাদপত্রও তা থেকে মুক্ত থাকে না। ‘সাংবাদিকরা জাতির বিবেক’, ‘সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা’, ‘মিডিয়া সমাজের ওয়াচডগ’, ‘সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ’Ñ বাজারমনস্ক এমন সমাজে সংবাদপত্রের কাছ থেকে এতকিছু আশা করা যায় না। তবে কোনো সংবাদপত্র ভাষা আন্দোলনের সময় ‘আজাদ’ কিংবা ‘মর্নিং নিউজ’ হয়ে উঠবে অথবা মুক্তিযুদ্ধকালীন ‘সংগ্রাম’ হয়ে উঠবে, এতটা অধঃপতনও আমরা আশা করি না। আমরা পাঠকরা সংবাদপত্রকে সংবাদপত্র হিসেবে দেখতে চাই, বিজ্ঞাপনপত্র হিসেবে নয়। বিজ্ঞাপন ছাড়া যে সংবাদপত্র চালানো যায় না, তা একটি শিশুও বোঝে। কিন্তু যেভাবে সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় বিজ্ঞাপন পুরো ফোল্ডজুড়ে কভার হয়ে আসছে, তা পত্রিকাগুলো এড়াতে পারে কিনা? হয়তো এটি অনুত্তীর্ণ প্রশ্ন কিংবা প্রশ্ন হওয়ারই যোগ্যতা রাখে না। আবার বিজ্ঞাপনের টাকায় পত্রিকাগুলোর ভালোকাজের দৃষ্টান্তও কম নয়। সাহিত্যের পাঠক কম এবং সাহিত্য পাতা বের করা লাভজনক নয় জেনেও পত্রিকাগুলো ভর্তুকি দিয়ে হলেও সাহিত্য পাতা বের করছেÑ এটি নিশ্চয়ই ভালো। উপসম্পাদকীয় পাতার পাঠক কম হওয়া সত্ত্বেও কোনো পত্রিকাই উপসম্পাদকীয় পাতায় সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় না ছেপে বিজ্ঞাপন ছাপছে নাÑ এও কি কম? কঠিন পুঁজিতান্ত্রিক এই বাজারে সংবাদপত্রের এ এক উন্নততর নৈতিক দিক। সাংবাদিকদের সামনে অনেক লোভের টোপ থাকে, ক্ষমতাবানদের পক্ষ থেকে তাদের স্বার্থরক্ষার চাপ থাকে। এতকিছু মোকাবিলা করেও এবং বহুমাত্রিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সাংবাদিকরা যা করছেন, তা অনেক। কোনো বিশেষ ক্ষমতাকালকে ধরে এ কথা বলা হচ্ছে না। সব আমলেই সংবাদপত্রের ওপর এ চাপ ছিল। সেলফ সেন্সরশিপের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, সংবাদপত্রই নিজেকে সেন্সর করে। কিন্তু কেন করে? সেন্সরের পেছনে কোনো না কোনো চাপ তো থাকেই। বলা যায়, সংবাদপত্রই এখন পর্যন্ত মানুষের শেষ ভরসার জায়গা। এটি হতে পেরেছে সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিলের সিদ্ধান্ত জেলা প্রশাসকের আওতা থেকে মুক্ত হওয়ায়। ওই আইন যেন আর কখনো ফেরত না আসতে পারে, এ জন্য সাংবাদিকদের লড়াই করে যেতে হবে শেষ পর্যন্ত। সংবাদপত্র তো জনগণেরই প্ল্যাটফর্ম এবং শেষ পর্যন্ত এটিকে টিকে থাকতে হলে জনগণের ওপরই নির্ভর করতে হবে। এই জনগণ কোন জনগণ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। সংবাদপত্রের পাঠক আসলে কারা? তারা বাংলাদেশের ৫ শতাংশ শিক্ষিত জনগণ কিনাÑ এ প্রশ্নও পুরনো। তবে ৫ শতাংশের এই ভাবনার বৃত্ত থেকেও বের হওয়া দরকার বোধহয়। প্রত্যন্ত গঞ্জের প্রান্তিক একটি হাটেও পত্রিকা পাঠক দেখেছি। তাও এক-দুইজনও নন, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাঠক। আর ওই যে ৫ শতাংশ, তাদের বড় একটি অংশ ঝুঁকছে অনলাইনে। সংবাদ পাঠকদের এলিট শ্রেণি বলে গালি দেওয়া হলেও জনমত গঠনে সংবাদপত্রের দায় ও জনমতের চাপে সংবাদপত্রের পলিসি বদলের দৃষ্টান্তও আছে। ইরাক যুদ্ধের সময় দেখেছি, জনমতের চাপে বাধ্য হয়ে সংবাদপত্রগুলো আফগানিস্তানের পক্ষে এবং আমেরিকার বিপক্ষে সংবাদ ছেপেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে বিপরীতটি ঘটতে দেখেছি। যে পত্রিকাকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করে, তা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকে হয়তো। কিন্তু সেটি ষাটের দশকের ইত্তেফাক হতে পারে না। দুই একবার ভাবুন, রাষ্ট্র কখন তার নাগরিকদের ওপর সব অন্যায়-অবিচার ও শোষণ চালিয়েও বহাল থাকতে পারে? যখন রাষ্ট্রের হাতে একচেটিয়া চিন্তা বাক ও গণমাধ্যমের নিষেধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ওপর পেন্টাগনের কার্যক্রম নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশের জন্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও নিউইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। হাইকোর্টে গিয়েছিলÑ যেন পোস্ট ও টাইমসের পাতায় ওই ধারাবাহিক প্রতিবেদনটি বন্ধ হয়ে যায়। না, এখানেই শেষ নয়। প্রতিবেদনের নথিপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য সিআইএকে ব্যবহার করা হয়েছিল চতুরতার সঙ্গে। বাধ্য হয়ে নিউইয়র্ক টাইমস তাদের অফিস বন্ধ করে দেয়। সমুদ্রসৈকতে একটি হোটেল ভাড়া করে পত্রিকা চালানোর কাজ করতে হয়েছে তখন নিউইয়র্ক টাইমসকে। গোয়েন্দা সংস্থার দৃষ্টি এড়াতে ওই পত্রিকার সাংবাদিকরা পরিবার-পরিজনসহ সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে যেতেনÑ যেন তারা ছুটি কাটাচ্ছেন। রাতে অবশ্য ঠিকই হোটেল অফিসে এসে জড়ো হতেন এবং কাজ করতেন। তবে সমস্যা হলো, নিউইয়র্ক টাইমস আর ওয়াশিংটন পোস্টের মতো হাঁটুর জোর বিশ্বের সব পত্রিকার থাকে না। তিন প্রেসের শত্রু কে নয়? কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের প্রতিবেদন দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। উন্নয়নের রূপকার হিসেবে সমাদৃত মাহাথির মোহাম্মদের নামও আছে সেখানে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, চূড়ান্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই সাংবাদিকরা কাজ করছেন সারাবিশ্বে। কোনো রাষ্ট্র জনমতের তোয়াক্কা না করলে বিরামহীনভাবে সাংবাদিক নির্যাতনের পথ বেছে নেয়। এর মধ্যে টেলিফোনে আঁড়িপাতা থেকে শুরু করে সমালোচনামূলক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখার জন্য বিনা বিচারে আটক, নতুন কালাকানুন আরোপ, সংবাদপত্র বা সংবাদ সংস্থা বন্ধ ঘোষণা, বিজ্ঞাপন বন্ধের হুমকি প্রদর্শন, সাংবাদিক হত্যাÑ সবই আছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের কয়েক দশকের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন আমল ছিল ওই দেশের সাংবাদিকদের জন্য গ্রহণের কাল। ইরানের আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনির অবস্থান আরও উপরে। তার আছে একসঙ্গে ১৬টি পত্রিকা এবং মোট ৩০টি পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ার রেকর্ড। সবাই জানেন, তথ্য বিস্ফোরণের এ যুগে কোনো তথ্যই শেষ পর্যন্ত চেপে রাখা যায় না। এর পরও তথ্য গোপনের চেষ্টা থেমে থাকে না। রিপোর্টার্স সান ফ্রন্টিয়ার্স কানাডিয়ান জার্নালিস্ট ফর ফ্রি এক্সপ্রেশন এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের প্রতিবেদন অন্তত সেটিই বলে। চার ‘আমাদের সময়’ সব সময় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পক্ষে থাকুক এবং তাদের বঞ্চনার কথা বেশি করে ছাপা হোকÑ পাঠক হিসেবে দাবি এটি। আমাদের সময়কে হাঁটতে হবে অনেক দীর্ঘপথ, যেতে হবে বহুদূর। দূরের এই পথ যত কঠিনই হোক, আমাদের সময় যেন বিশেষ কোনো গোষ্ঠী বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির সময়ের স্বার্থে ব্যবহার না হয়। সময় যেন আমাদের সময়ের হাতেই থাকে। য় জয়া ফারহানা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক