মজিদ মাহমুদ যেভাবে পাঠকের হৃদয়ে

0
135

আর আমাদের স্বীকার না করে উপায় নেই, নাগরিক জীবন প্রতিদিনই ক্লান্ত হয়। সংসার তাকে ক্লান্ত করে। অফিস তাকে ক্লান্ত করে। তাকে ক্লান্ত করে ট্রাফিকের লাল আলো, রাস্তার ভিখিরি, মোড়ের মুদি দোকানী, ফুটপাতের চা-ওয়ালা। ছেলেটার স্কুলের বেতন, মেয়েটার লাল ফিতের বায়না, বউয়ের নিরীহ মুখ, বন্ধুর আহ্লাদি আবদারও তাকে কম ক্লান্ত করে না। তাকে ক্লান্ত করে যাপিত জীবনের সমস্ত আয়োজন। আর তাকে ক্লান্ত করে কোনো এক বিপন্ন বিস্ময়! অন্তর্গত রক্তের ভেতর খেলা করা ক্লান্তি নিয়ে এক একটা মানুষ তবে দিনশেষে কী চায়? সে চায় ‘দু’দ- শান্তি’। তাই দীর্ঘ দুরুহ দিনশেষে আমরা ফিরে যাই কবিতার কাছেই। কবিতা, সেই-ই তো আমাদের অনন্ত শান্তির আধার।

কবিতা আমাদের শান্তি দেয়। কবিতা আমাদের স্বস্তি দেয়। কবিতা আমাদের দু’দ- ভুলিয়ে রাখে জীবনের কোলাহল। কবিতা আমাদের হাসায়, কাঁদায়, জাগায় এবং ভাসায়। তাই কিংবদন্তী কবি আবু জাফর ওয়ায়দুল্লাহ উচ্চারণ করেন, ‘যে কবিতা শুনতে জানে না/সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।’
আমরা মূলত ক্রীতদাসের জীবন চাই না। তাই নিজেকে সমর্পিত করি কাব্যদেবীর বেদিমূলে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, সব কবিতার পদতলেই কী নিজেকে সমর্পিত করা যায়? কদাচ নহে। কেননা, সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি এবং সব কবিতাই কবিতা নয়, কিছু কিছু কবিতা।

কর্মক্লান্ত মানুষগুলো তাই কিছু কিছু কবিতার তালিকা তৈরি করে, যে কবিতাগুলোর কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে পাওয়া যায় খানিকটা আরাম-বিরাম। রবীন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ, সুধীন্দ্র, শক্তি, শঙ্খ, সৈয়দ হক, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, শামসুর রাহমান, হেলাল হাফিজ, মোহাম্মদ রফিক, রফিক আজাদ তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে। এবং সেই তালিকায় অবধারিতভাবে ঢুকে পড়েন মজিদ মাহমুদের কবিতা।

মজিদ মাহমুদ? জানি আপনার ভুরুতে গিট পড়েছে, চোখে বিস্ময়। এ আবার কোন কবি? নাম শুনিনি তো!

নাম না শোনারই কথা। এ কবি প্রচারসর্বস্বতায় গা ভাসাননি যে! নিভৃতে করে গেছেন কবিতার চাষবাস। করছেন এখনো। তাই বাংলা কাব্যভূবনে টিকে আছেন দোর্দ- প্রতাপে। তবে হ্যাঁ, ভুলে গেলে চলবে না, ‘টিকিয়া থাকাই চরম স্বার্থকতা নহে।’ স্বার্থকতা তবে কী? স্বার্থকতা হচ্ছে, স্বার্থকভাবে টিকে থাকা। এবং মজিদ মাহমুদ স্বার্থকভাবে টিকে আছেন।

আপনারা জানেন, কবিতার জন্য অমরত্ব ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কিন্তু কবিতাই তাঁকে শেষমেশ অমরত্ব দিয়েছে। কারণ জীবদ্দশায় তিনি অনেক অনেক স্বার্থক কবিতার জন্ম দিয়ে গেছেন। ভাবছেন, কবিতা আবার স্বার্থক হয় কীভাবে? ব্যার্থই বা হয় কীভাবে?

হয় হয়। কবিতাও ব্যার্থ হয়। আপনার চারপাশে তাকান, কী দেখছেন? রাশি রাশি ভারা ভারা কেবল ব্যার্থ কবিতারই উলুধ্বণি। কেননা, একজন কবি সারা জীবনে যত কবিতা লেখেন সব কবিতাই স্বার্থক হয় না। তিনি ব্যার্থ কবিতাই বেশি লেখেন। স্বার্থক কবিতা লেখেন অল্পবিস্তর। সুনীল কিংবা মজিদ মাহমুদ এখানেই উজ্জ্বল ব্যতিক্রম; তাঁদের ব্যার্থ কবিতা খুঁজতে গেলে শার্লক হোমস হতে হয় এবং গলদঘর্ম তদন্ত শেষে মাথা নিচু করে বলতে হয়, ‘সরি, কিছু পাওয়া যায়নি।’

এবার আসুন সকলে। যারা মজিদ মাহমুদের নাম শোনেননি এতদিন, তারা ঘন হয়ে বসুন। শুনুন-যা কিছু স্বার্থক, যা কিছু অবিনশ্বর, যা কিছু কালোত্তীর্ণ তার শিকড় থাকে মাটির গভীরে প্রোথিত আর উন্নত শির থাকে উত্তোলিত আসমানে। কবি মজিদ মাহমুদের কবিতার শরীর ব্যবচ্ছেদ করুন, দেখতে পাবেন তার অঙ্গে অঙ্গে বাংলার ধুলোমাটিকাদা, বাংলার মিথ। তাঁর কবিতার দর্শন আর অন্তর্গত বার্তা আমাদেরকে শেখায় দিগন্তবিহারী হতে, চিন্তায়-জীবনাচরণে; এমন শিক্ষা দেয় কেবল আর একজন যার নাম আকাশ। উদাহরণ চান? এই নিন-

আমার রক্তের মধ্যে দামোদর
আমার রক্তের মধ্যে মহিষ
মাগো তুই মহিষাসুর বধের মন্ত্র শেখা
আমি তোর কাছে যাবো।
[বল উপাখ্যান, বিদ্যাসাগরের মা ভগবতী দেবী]

দামোদর নদী, বিদ্যাসাগর, মহিষ-শব্দগুলো কি আপনার শিকড়কে মনে করিয়ে দেয় না? আপনি যখন পড়েন ‘মাগো তুই মহিষাসুর বধের মন্ত্র শেখা’ তখন কি হৃদয়টা আকাশ স্পর্শ করে না? আপনি যখন পড়েন ‘আমি তোর কাছে যাবো’ তখন মায়ের কাছে ফেরার ব্যাকুলতায় আপনার অন্তরাত্মা কি আর্দ্র হয়ে ওঠে না, ক্ষণিকের জন্য?

এর নাম কমিউনিকেটিং ইন্টারঅ্যাকশন। পাঠক-লেখক আন্তসংযোগ। যে লেখক পাঠকের ভাবনার সঙ্গে নিজের লেখার সংযোগ ঘটাতে পারেন তার লেখাই পাঠক দিনের পর দিন মনে রাখে। রবীন্দ্র, নজরুল, জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান প্রমুখ কবির কবিতা আজও পঠিত হয় ওই কমিউনিকেটিং ধর্মের কারণেই। মজিদ মাহমুদের কবিতাও আমরা মনে রাখি ঠিক এই কারণেই।

আরও একটা কারণ আছে বটে। মজিদ মাহমুদ আমাদের অন্তর দখল করে নিয়েছেন তাঁর স্বকাল সচেতনতার জন্য। আগামী দিনের পাঠকের অন্তরও যে তিনি শাসন করবেন তা আগাম বলে দেওয়া যায়। কেননা, যে সূত্র মেনে জীবনানন্দ-সুধীন্দ্র-সুকান্ত-অমীয়-শক্তি-সুনীল আজও আমাদের পাঠক হৃদয়ে জাগরুক আছেন তা-তো ওই স্বকাল সচেতনতার জন্যই। কবি মজিদ মাহমুদের কবিতায় কীভাবে সমকাল ধরা পড়েছে দেখুন-

বাগানের ভেতর শোভা পাচ্ছিল বসন্তের ফুল
গন্ধ ও রঙে আকৃষ্ট হয়ে উড়ে আসছিল মৌমাছি
আমারও ইচ্ছে খুব সে ফুলের সান্নিধ্যে যাবার
কিন্তু চারিদিকে শক্ত দেয়াল, ভেতরে নির্দয় মালি
[ব্যর্থতা : ভালোবাসা পরভাষা]

এই ‘চারদিকের শক্ত দেয়াল’ এবং ‘ভেতরের নির্দয় মালি’ই আমাদের স্বকাল, আমাদের বাস্তবতা। এই দেয়াল ও নির্দয়তা আমাদের সমাজের বুকে জগদ্দল পথে হয়ে বসে আছে দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী। সে বিভাজন তৈরি করেছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তাই ‘বসন্তের ফুল’ তার নিজস্ব ‘গন্ধ ও রঙে আকৃষ্ট’ করে মৌমাছির মতো কবিকেও সৌন্দর্য উপভোগের আয়োজনে শামিল হবার হাতছানি দিলেও কবির সেখানে প্রবেশানুমতি নেই। মজিদ মাহমুদ এভাবেই নিখুঁত শিল্পীর তুলির আঁচড়ে ফুটে তোলেন সমাজ বাস্তবতা।
মার্কিন কবি ভ্যালেরি বলেছেন, ‘কবিতার প্রথম পঙ্ক্তি আসে স্বর্গ থেকে।’ অর্থাৎ কবিতা এমন একটি জ্ঞান যা আহরণ করতে হয় সাত আসমানের ওপার থেকে। কিন্তু মজিদ মাহমুদের বেলায় আমরা দেখতে পাই, এই আপ্তবাক্য খাটছে না। তিনি কবিতার জ্ঞান আহরণ করেন তার চারপাশ থেকেই। দেখুন তাঁর কবিতার ভাষ্য-

কবিতা এমন একটা জ্ঞান যা ফুটপাত থেকে কুড়িয়ে নিতে হয়
কাগজ কুড়ানো শিশুদের পলিথিনের ব্যাগের ভেতর ঘুরে ঘুরে
কবিতাগুলো আবার আমার হাতেই ফিরে আসে
[কবিতা ২, সিংহ ও গর্দভের কবিতা]

মজিদ মাহমুদকে তাই বলতেই হয় সময়ের সন্তান। তিনি এই সময়ের, এই সমাজের, এই দেশের। তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে আপনি দেখতে পাবেন, তাঁর কবিতার শরীরজুড়ে কী নিবিড় মমতায় জড়াজড়ি করে আছে স্বদেশ, স্বকাল, স্বজাতি। তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে আপনি দেখতে পাবেন, ইতিহাস, মিথ, পুরাণ ও আধুনিকতা কীভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে নন্দনতত্ত্ব ছড়াচ্ছে। মজিদ মাহমুদের কবিতা আরও ছিড়েখুড়ে দেখতে চান? তবে নিবিষ্ট হয়ে বসুন সকলে। চোখের সামনে মেলে ধরুন মজিদের কবিতামালা-

সুউচ্চ পর্বতের শিখর থেকে গড়িয়ে পড়ার আগে
তুমি পাদদেশে নদী বিছিয়ে দিয়েছিলে মাহফুজা
আজ সবাই শুনছে সেই জলপ্রপাতের শব্দ
নদীর তীর ঘেঁষে জেগে উঠছে অসংখ্য বসতি
ডিমের ভেতর থেকে চঞ্চুতে কষ্ট নিয়ে পাখি উড়ে যাচ্ছে
কিন্তু কেউ দেখছে না পানির নিচে বিছিয়ে দেয়া
তোমার কোমল করতল আমাকে মাছের মতো
ভাসিয়ে রেখেছে
[নদী, মাহফুজামঙ্গল]

কবিতা পাঠ শেষ। জানি, আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে ভাসমান এক জীবন। এ জীবন আপনারই। কেননা আপনি আধুনিক মানুষ। একজন আধুনিক মানুষ হিসেবে আপনি স্বীকার করতে বাধ্য, অপনার মনন সতত সঞ্চরণশীল মাছের মতো। খুব বেশি থিতু নয় কোনো একক বিষয়ের প্রতি। আপনি খানিকটা অস্থির, দ্বিধাগ্রস্থ, অবষাদে ¤্রয়িমান কখনো কখনো। আপনার মনস্তত্ত্বে খেলা করে জটিল সব ভাবনা, আপনার ছুটে চলাই নিয়তি যেন। এসবই আধুনিক মানুষ, আধুনিক সমাজের বৈশিষ্ট্য।
বলা হয়, আধুনিকতার বৈশিষ্ট্যকে উপজীব্য করে লেখালেখির শুরু মূলত উনিশ শতকে, ফ্রানজ কাফকার হাত ধরে। মেটামরফোসিস নামক একটা গল্প লিখে তিনি বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দিলেন। সেই গল্পে ফুটে উঠল হতাশা, বিষণ্নতা, অবসাদ, স্বার্থপরতা, সম্পর্কের জ্যামিতিক বিশ্লেষণ ও যাপন করা জীবনের বহুবিধ সংগ্রাম। এক অদ্ভূত শৈল্পিক বর্ণনায় কাফকা যে জীবনের গল্প বলে গেছেন তা পাঠ করতে করতে পাঠক ঘোরগ্রস্থ হয়ে পড়েন। কারণ সরলরৈখিক পথে গল্প বলেন না কাফকা, নানান পথ ঘুরে এগিয়ে নিয়ে যান গল্পের কাহিনী। ফলে পাঠক বুঝে উঠতে পারেন না কোথাকার কাহিনী কোথায় যাচ্ছে। এক অদ্ভূত রহস্যময়তার জাদুজালে আটকা পড়ে থাকেন পাঠক। ফলে গল্প শেষ না করে উঠতেও পারেন না।

শিল্পসমালোচকরা বললেন, এটি একটি উত্তরাধুনিক গল্প। আপনি যখন মজিদ মাহমুদের কবিতা পড়বেন তখন আপনার ভেতরও একধরনের ঘোরলাগা বিপন্নতা বোধ কাজ করবে। কী বলতে চাইছেন কবি তা বোঝার আগেই শেষ হয়ে যাবে কবিতাখানি। আপনি আবার প্রথম থেকে শুরু করবেন কবিতাপাঠ। অতঃপর আপনি আবিষ্কার করবেন, আপাত সরল মনে হলেও সরলরৈখিক পথে হাঁটে না মজিদের কবিতা। আপনি আরও আবিষ্কার করবেন, আধুনিক জীবনের দ্বিধা-দ্বন্ধ তাঁর কবিতায় উপস্থিত-

মাঝে মাঝে মনে হয় মরে যাওয়া ভালো
মাঝে মাঝে মনে হয় বেঁচে থাকি।
[স্বজন, সিংহ ও গর্দভের কবিতা]

এসব দ্বিধা-দ্বন্ধকে আপনার নিজের বলে মনে হবে। কবিতাগুলোকে মনে হবে আপনার খুব আপন। আপনি সারা দিনের ক্লান্তি শেষে দু’দ- শান্তির খোঁজে মাঝে মাঝেই আশ্রয় চাইবেন মজিদ মাহমুদের কবিতার কাছে। সেখানেও আবিষ্কার করবেন আপনারই মতো হতাশাবাদী উত্তরাধুনিক মানুষ-

অথচ সুখ ও দুঃখ, কর্তনের বেদনা
কেবল আমার
আমি কি নিজের জন্য মরতেও পারব না?
[দাস, সিংহ ও গর্দভের কবিতা]

মনে হবে, এই তো হৃদয়ের কথা। এই তো একান্ত আপনার কথা। এক অদ্ভূত প্রশান্তিতে ভরে উঠবে আপনার মন। আপনি অবশ্য টের পাবেন না, এরই মধ্যে মজিদ মাহমুদ আপনার অন্তরের সিংহাসন দখল করে ফেলবেন!

LEAVE A REPLY