সেলফি যখন সর্বনাশের কারণ

0
65

রাজধানীর বনানীতে রেইনট্রি হোটেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলার অন্যতম আসামি নাঈম আশরাফ। বহুল আলোচিত এই আসামি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছে। আদালত তাকে সাত দিনের রিমান্ডে দিয়েছে। তবে শো-বিজ ও মিডিয়ার নামীদামি ব্যাক্তিদের সাথে তোলা নাঈমের অনেক ছবি ও সেলফি এখন ওইসব ব্যাক্তিদের সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মিডিয়া আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে।

সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার গান্ধাইল গ্রামের দিনমজুর ও ফেরিওয়ালা আমজাদ হোসেনের একমাত্র ছেলে আব্দুল হালিম ওরফে এম এ হালিম ওরফে ইঞ্জিনিয়ার হালিম ওরফে টাউট হালিম ঢাকায় এসে অভিজাত সমাজে মিশে সে নাম ধারণ করে নাঈম আশরাফ। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করতে গিয়ে এই টাউট হালিম খ্যাত নাঈমের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে শো-বিজ ও মিডিয়ার অনেক মানুষের সঙ্গে সখ্যতা তৈরি হয়। মিডিয়ার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সে মিডিয়া সেলিব্রেটির সঙ্গে সেলফি তুলেছেন। সেইসব ছবি ও সেলফি ওইসব তারকা-সেলিব্রেটিদের জন্য সর্বনাশের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। বনানীতে ধর্ষণের ঘটনার পর থেকে নাঈম অশরাফের সঙ্গে কয়েকজন সেলিব্রেটির সেলফি দেখে ওইসব তারকা-সেলিব্রেটিদের নানাভাবে দোষারোপ করা হচ্ছে। অভিযুক্ত করা হচ্ছে নানা অমূলক ও অপব্যাখায়।

তবে ফেসবুকে এভাবে কারো সম্পর্কে না জেনে, বা বিষয়ের প্রেক্ষাপট নিয়ে মন্তব্য করাকে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারাহ দীবা। তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যম হলো এমন একটি মাধ্যম, যেখানে অনেকটা যা খুশি বলা যায়। এটি কোনো সমস্যা নয়। মানুষ কোনো কিছু দেখার পর নিজের জ্ঞান ও ধারণা থেকে কথা বলবে এটিই স্বাভাবিক। তবে ভালো বিষয় থেকে মানুষ খারাপ বিষয় নিয়ে বেশি মাতামাতি করতে আনন্দ পায়। তাই সাইকোলজি ভাষায় এটিকে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি বলে।

তবে নাঈম আশরাফের সঙ্গে সেলফি তোলা কয়েকজন বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না। কেউ কেউ তাদের মানহানি হয়েছে বলে মনে করে মামলা করারও চিন্তা করছেন। কোনো এক অনুষ্ঠানের সূত্রে নাঈম আশরাফের সঙ্গে সেলফি তোলা সঙ্গীত শিল্পী লোপা হোসেইন বলেন, আসামি নাঈম আশরাফের সঙ্গে আমার যে সেলফি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা আলোচনা হচ্ছে, সেটি আমার তোলা সেলফি না, এটি অন্য আরেকজনের মোবাইল ফোনে তোলা। আমরা যারা মিডিয়াতে কাজ করি, তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে হয় এবং সেসব অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পরিচিত ও অপরিচিত মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে হয় এবং অনুরোধে ছবিও তুলতে হয়।

অনেক ক্ষোভ নিয়ে ক্লোজআপ ওয়ান তারকা লোপা হোসেইন আরও বলেন, সম্প্রতি একটি অনলাইন পোর্টালে আসামি নাঈমের বেপোরয়া জীবন একটি নিউজ করেছে, সেখানে ছবি হিসেবে আমার ছবি ব্যবহার করেছে, মানুষ তো এখন ধারণা করে নিচ্ছে যে নিউজে যাদের ছবি আছে, তাদের সবার সঙ্গে নাঈমের সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টি দু:খজনক। আমার কথা যারা এই নিউজটি করেছে তারা এই সোর্স কোথায় পেয়েছে? কিসের ভিত্তিতে এমন নোংরা নিউজে আমার ছবি জুড়ে দিলো। একারণে সামাজিকভাবে আমার চরমভাবে মানিহানি হয়েছে। কেউ চাইলে আমার অর্জিত সম্মানটা এভাবে ক্ষুন্ন করতে পারে না। আমার একধরণের মানহানি ঘটানো হয়েছে।

মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ফারহানা নিশো ও নাঈম আশরাফের সেলফি নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে বির্তক সৃষ্টি হয়েছে। ফারহানা নিশোও বিষয়টি সঙ্গত কারণে সহজভাবে নিতে পারেন নি। নিশো তার ফেসবুকে লিখেছেন: আমার বিরুদ্ধে যে বা যারা বিভিন্ন ছবি সংযুক্ত করে মিথ্যা / ভিত্তিহীন অপবাদ দিয়ে লিখছেন বা আমাকে হেয় করার চেষ্টা করছেন কিংবা ওসব লেখা শেয়ার করছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ আপনারা আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে সেইসব লেখা ডিলিট করুন অন্যথায় আমি ৫৭ ধারায় আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হবো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারাহ দীবা সেলফিকাণ্ডের বিষয়ে বলেন, অনলাইন বা সামাজিক মাধ্যমে আমরা এখনও পুরোপুরি অভ্যস্ত নয়। তাই কেউ কোনো পোস্ট করলে নিজেদের জ্ঞান নিয়ে কমেন্ট করে বসি। তারা এটাও জানে না তার কোনো মানহানি ঘটবে কিনা। শুধু তাই নয়, খারাপ কমেন্ট করে বসে। এরা মূলত মানুষদের নিয়ে খারাপ কথা বলতে বেশি আনন্দ ও তৃপ্তি পায়। এবং শ্রেণীটি অশিক্ষিত। কারো সঙ্গে সেলফি তুললেই সেলফি তোলা চরিত্রদের মধ্যে কোনো সর্ম্পক আছে, এটা মনে করা অনেকসময় ‘মানসিক রোগ’ পর্যায়ে পড়ে।

সামাজিক মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও আচরণে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও এর অনেক ইতিবাচক প্রভাব আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর আগেও বড় ধরণের অনেক ঘটনা ঘটেছে, যা ফেসবুকে আড়োলন তোলার পর সবার সামনে এসেছে। তাই আমি মনে করি নেতিবাচক দিকটি নয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতিবাচক দিকে নিয়ে কথা বলা উচিত।

LEAVE A REPLY