এক দুর্ভিক্ষের ছবি এবং কেভিন কার্টার/ উদয় শংকর দুর্জয়

0
315

“The pain of life overrides the joy to the point that joy does not exist” -মৃত্যুর ঠিক আগে সুইসাইড নোটে এমনি হৃদয় বিদারক মূর্ছনা লিখে রেখেছিলেন কেভিন কার্টার।

উদয় শংকর দুর্জয়-লন্ডন থেকে:কেউ কি কখনও ভেবেছিল একটি মাত্র ছবি যা পুরো পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিতে পারে? ১৯৯৩ সালে সুদানের একটি দুর্ভিক্ষের ছবি যা কিনা মানুষকে রাতারাতি ভাবিয়ে তুলেছিল। দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস সেই ছবি প্রথম ছেপেছিল ২৬ শে মার্চ ১৯৯৩। তারপর থেকে হৈ চৈ পড়ে যায়; রীতিমত সাংবাদিক সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলো নেমে পড়ে ছবির নেপথ্যে।

(ইনসেটে কেভিন কার্টার)

কেভিন কার্টার (১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৬০-২৭ জুলাই ১৯৯৪)। কেভিন জন্মে ছিলেন সাউথ আফ্রিকার জোহানসবার্গের এক মধ্যবিত্ত শ্বেতাঙ্গ পরিবারে। তার এলাকার সবাই সাদা ছিল কিন্তু সেখানে কিছু অবৈধ কৃষ্ণাঙ্গরাও বাসবাস করত। কিন্তু তার মধ্যে কোনদিন কোনো বর্ণভেদ ছিল না। কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি তার কণ্ঠস্বর সব সময় সোচ্চার ছিল। এ জন্য অনেক সাদা সহপাঠীরা তাকে নিগার লাভার বলে ডাকত। সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় এক কৃষ্ণাঙ্গের উপর এক শ্বেতাঙ্গের দূরব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ছিল।

কেভিন স্কুল পাশ করে ফার্মাসিস্ট হওয়ার জন্য কলেজের পড়াশোনা বাদ দিয়ে দিল এবং একটা সময় সে সেনাবাহিনিতে যোগদান করল। ফার্মাসি শেষ করেছিল কিনা ঠিক জানা যায়নি। সেনাবাহিনীর শৃঙ্খল বদ্ধ জীবন তার ভালো লাগেনি তাই সে একদিন বেরিয়ে পড়ল কাউকে কিছু না বলে। এক প্রকার বাউন্ডুলে জীবন; জীবনের মানে না খুঁজে হারানোর মাঝে খুঁজেছেন নিজেকে। একদিন স্বাদ জেগেছিল মুক্ত পাখি হবেন, ছুটে যাবেন গ্রহ থেকে গ্রহন্তরে। কিন্তু পাখির ডানা এতটা রোদের উত্তাপ লুকিয়ে রাখতে পারে না। তাই ক্লাবের একজন ডি জে হয়েও ব্যর্থতার গান গেয়ে বিদায় জানালেন সে চাকরি। সেটা ১৯৮০ বা ১৯৮১ সালের ঘটনা হবে। হতাশার দ্বারপ্রান্তে যেন সব হারিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছেন। কিছু ইঁদুর মারা রাসায়নিক দ্রব্য খেয়ে নিজেকে বিদায় জানাতে যেয়েও ফিরে আসতে হল। মনে হয় মানুষকে কখনও কখনও মৃত্যুর পিছনে ছুটতে হয়। একদিন আরনেস্ট হেমিংওয়েকেউ ছুটতে হয়েছিল। কেভিনকে আবার ফিরে আসতে হল তার পুরনো জায়গায় সেই সেনানিবাসে। তারপর ১৯৮৩ সাল, কর্মরত অবস্থায় একটি বোম বিস্ফোরণে আহত হলেন। এবারো কোনমতে বেঁচে গেলেন এবং নিজেকে পূর্ণভাবে বাঁচিয়ে দিলেন সেনাবাহিনী থেকে।

১৯৮৪ সাল, জোহানসবার্গে শুরু করলেন স্থিরচিত্রের কাজ। এখানে মোড় ঘুরে গেল কেভিন কার্টারের অস্থির জীবন যাপনের। মানুষ হতাশা আর অস্থিরিতার মাঝে একদিন খুঁজে পায় যা তার জন্য অপেক্ষা করছিল। আর যা কখনও কারোর জন্য অপেক্ষা করে না তা কখনও কারো হবার নয়। এবার ১৯৯৩ সাল, দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ মেঘ ভেঙে পড়ছে প্রতিদিন সুদানের ভুমিগ্রহে। খাদ্যের ওভাবে দিনের দিনের পর দিন মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রান্তের পর প্রান্ত, সমতল; কোথাও কোনো ফসলের ছিটে ফোটা নেই। শুধু আলোরে মিছিল পেরিয়ে যাচ্ছে সুদানের আয়দ গ্রামের বুক চিরে। উত্তাপ যেন কংকালসার মানুষের দেহকে পুড়িয়ে দিয়ে আনন্দে মেতেছে। সেখানকার প্রত্যেকটি মানুষই ত্রাণের খাদ্যের উপর। আর যে মানুষগুলো ত্রাণের অন্তর্ভুক্ত তাদের প্লাস্টিকের চুড়ির মতো পরানো থাকে।

কেভিনও একদিন সেই দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ক্যমেরার লেন্স ঘোরাতে ঘোরাতে আবিষ্কার করলেন এক কংকালসার ক্ষুধার্ত শিশু খাদ্য অন্বেষণে বেরিয়েছে কিন্তু সাধ্য নেই নড়বার। যেন মুখ থুবড়ে উপুড় হয়ে বসে আছে খা-খা রোদ্দুরের মাঝে। শিশুটির পিছিনে ঠিক কাছাকাছি হুডেড ভালটুর বসে আছে শিকারের অপেক্ষায়। কাভিনের ক্যামেরার লেন্স দারুনভাবে সতেজ হয়ে ওঠে; প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষা করে কেভিন কয়েকটি শট নিয়ে স্থান ত্যাগ করে এবং একটি গাছের নিচে বসে ধুম পান করতে করতে পরবর্তী কাজের জন্য তৈরি হতে থাকেন। কেভিন শুধু ভেবেছিল স্থিরচিত্র ধারন করাই তার কাজ, সে তখন
একটি কোম্পানির হয়ে কাজ করছিল।

ক্ষুধার্ত শিশুর ছবিটি ছাপা হল সারা পৃথিবী জুড়ে। মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে সমস্ত মানুষ সুদানের পাশে দাড়ানোর জন্য উদ্যত হল। এরপর এপ্রিল ১৯৯৪, কেভিন কার্টার এক ছবির বদলে উঠে এলেন আলোক সজ্জায়; পুলিতজার পুরস্কার জিতে নিল তার এই কালজয়ী ছবি। আর জয়ই তাকে মনে হয় কুড়ে কুড়ে শেষ করে দিল। দাড়াতে হল সারা বিশ্বের মুখোমুখি। কি হল সেই ক্ষুধার্ত শিশুটির? কিভাবে আপনি ফেলে আসতে পারলেন সে শিশুটিকে? এভাবে নানা প্রশ্নের জবাব তার কাছে বোবা পাথরের মত জমাট বাঁধতে শুরু করল। কেভিন নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন, ভুলে যাচ্ছিলেন তার দারুন দারুন শৈশবের দিনগুলো।

একদিন সব ভুলে গেলেন ঠিক ঠিক। ১৯৯৪ সালের ২৭ শে জুলাই ছিল কেভিনের শেষ সূর্য দর্শন। লিখে ফেললেন এক সুইসাইড নোট। জোহানসবার্গের ব্রামফনটিয়েসপ্রুইট ছোট্ট নদীর কিনারে লাল নিশান পিকাপ ট্রাকটি থামালেন শেষবারের মতো। এখানেই কেভিন একদিন খেলা করতেন, পড়াশোনা করতেন, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতেন। কার্বন মনোক্সাইড বিষ আহরণে নিজেকে নিভিয়ে দিলেন। সঙ্গীতপ্রিয় মানুষ কেভিন, গান শুনতে শুনতে তারাদের ছায়াপথে হেঁটে গেলেন আজীবনের জন্য।

কেভিনরা কোনো দিন নিভে যায় না, কোনোদিন পরাজিত হয় না। জ্বলে ওঠে দপ করে, জ্বালিয়ে দিয়ে যায়।

LEAVE A REPLY