প্রবাসীদের জন্য নতুন হাতছানি বাফেলো

0
125
বাফেলোতে ব্যবসারও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে
বাফেলোতে ব্যবসারও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে

দূর প্রবাসে নতুন সম্ভাবনার হাতছানিতে নিউইয়র্কের বাফেলো নগরীতে স্থানান্তরিত হচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এই সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। গত এক দশকে ব্যাপক বাংলাদেশি এসেছেন নিউইয়র্ক শহরে। এখানকার ব্যয়বহুল জীবনযাত্রা ও গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া প্রবাসীরা প্রতিদিন নতুন পথ খুঁজছেন।
এই অভিবাসীদের অনেকেই জীবনযাত্রাকে সহনীয় করার জন্য নিউইয়র্ক শহর ছেড়ে যাচ্ছেন বাফেলোতে। বাফেলোতে এরই মধ্যে পাঁচ থেকে সাত হাজার বাংলাদেশি বাস করছেন। এই দলে প্রায় প্রতিদিন নতুন পরিবার যোগ হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে এর মধ্যে বাফেলোতে বাংলাদেশিরা একধরনের চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন।
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের উত্তর-পশ্চিমের প্রান্তিক নগরী বাফেলো। প্রায় তিন লাখ লোকের বাস। কানাডা সীমান্তের নায়াগ্রা ফলসের অদূরে এই নগরী সাম্প্রতিক সময়ে অনেকটা পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল। একসময়ে শ্বেতাঙ্গ-অধ্যুষিত বাফেলোতে অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য কমে আসায় কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যাপক অভিবাসন ঘটে। গত দুই দশকে কৃষ্ণাঙ্গরাও বাফেলোবিমুখ হয়ে পড়লে বাড়িঘরের মূল্য তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এ সুযোগটি গ্রহণ করেন নতুন আসা অদক্ষ অভিবাসীরা। এশীয় অভিবাসীদের মধ্যে ভারতীয় ও পাকিস্তানিদের সঙ্গে বাংলাদেশিদের নতুন গন্তব্য হয়ে উঠেছে বাফেলো। অল্প মূল্যে বাড়ি কিনে অনেক বাংলাদেশি এখন বাফেলোতে ডজন ডজন বাড়ির মালিক। এসব বাড়ি ভাড়া দিয়ে মুনাফা করছেন অনেকেই। ফলে বাণিজ্য সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে এখানে।
নিউইয়র্কের অন্যান্য নগরীতে বাড়ির মালিক হওয়া, এমনকি ভাড়া দিয়ে পরিবার নিয়ে থাকা এখন খুবই কঠিন। এই সময়ে বাফেলোতে খুবই কম দামে কোনো ঋণ না নিয়েই বাড়ির মালিক হচ্ছেন বাংলাদেশিরা। কিছুদিন আগেও ২০ হাজার ডলারে বাড়ি কেনা যাচ্ছিল বাফেলোতে। এখন অভিবাসীদের ব্যাপক আগমনে বাড়ির দাম বাড়ছে। বাড়ি কেনা-বেচা, ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা করছেন বাংলাদেশিরা। অনেকেই স্বচ্ছন্দ জীবনযাত্রার জন্য যেমন বাফেলোতে যাচ্ছেন, আবার অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের হাতছানিতে এই জনপদকে বেছে নিচ্ছেন।
ড্রিম কটেজ রিয়্যালিটির কর্ণধার মাহবুবুর রহমান দীর্ঘ পঁচিশ বছর নিউইয়র্ক প্রবাসী। নানা ধরনের কাজ করেছেন, ব্যবসা করেছেন অভিবাসন জীবনের পুরোটা সময়ে। সাবেক ছাত্রনেতা মাহবুবুর রহমান এখন বাফেলো নগরীতে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় নেমেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাফেলোতে এক পরিবারের বাড়ি পাওয়া যাচ্ছে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলারে। দুই ফ্যামিলি থাকার জন্য বাড়ি পাওয়া যাচ্ছে ৪৫ হাজার থেকে ৭৫ হাজার ডলারে। যাঁরা শুধু নিজের পরিবার নিয়ে থাকার জন্য ভাবছেন, তাঁরা এক পরিবারের বাড়ি কিনছেন। দুই পরিবারের বাড়ি যাঁরা কিনছেন, তাঁরা এক ইউনিটে বসবাস করছেন। অন্য ইউনিট ভাড়া দিয়ে মাসে সহজেই ৬০০ ডলার আয় করছেন।
নিউইয়র্কের অ্যাস্টোরিয়া, জামাইকায় এখন বাড়ির দাম পাঁচ লাখ ডলার দিয়ে শুরু। ভাড়া বাসায় যাঁরা থাকেন, এক রুমের জন্য তাঁদের দিতে হয় কমপক্ষে ১ হাজার ৮০০ ডলার। বাসা ভাড়ায় হিমশিম খাওয়া এই প্রবাসীদের অনেকেই এত দিন দূরের রাজ্য মিশিগানে যাচ্ছিলেন। এখন যাচ্ছেন নিউইয়র্ক শহর থেকে মাত্র চার শ মাইল দূরে বাফেলোতে।
মাহবুবুর রহমান জানালেন, বাফেলোতে মধ্যপ্রাচ্য ও পাকিস্তান থেকে অভিবাসীদের ব্যাপক আগমন ঘটছে। বহু মসজিদ ও মাদ্রাসা গড়ে উঠছে। বড় বড় স্থাপনা, ভবন নামমাত্র দামে কিনে গড়ে তোলা হচ্ছে মসজিদ ও মাদ্রাসা। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা এখন বাফেলোতে। উচ্চশিক্ষার জন্য বাফেলো ইউনিভার্সিটি নিউইয়র্কের মধ্যে অন্যতম বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কম টিউশন ফি দিয়ে নগর ও রাজ্যের টিউশন সুবিধা নিয়ে সহজেই সন্তানদের উচ্চশিক্ষা দেওয়ার অবকাশ রয়েছে।
বাফেলোতে প্রায় ১৫ বছর আছেন আখতার হোসেন শাহিন। নিজে এখন বাড়ি কেনাবেচা, ভাড়া দেওয়া, ভাড়া আদায় করার কাজ করেন। তিনি জানালেন, যেকোনো বাংলাদেশি পরিবার বাফেলোতে স্বাগত জানানোর জন্য তাঁরা প্রস্তুত। শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা নয়, স্বদেশিদের একে অন্যকে সহযোগিতা করার ব্যাপক আয়োজন চলছে। এর মধ্যে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশি গ্রোসারি স্টোরগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে আসা মাছসহ অন্যান্য সামগ্রী। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, বাংলাদেশিদের মধ্যে সিলেট ও নোয়াখালী অঞ্চলের প্রবাসীদের অনেকেই যাচ্ছেন বাফেলোতে।
আখতার হোসেন জানালেন, লোকজন গরমের সময় আঙিনায় সবজি চাষ করে পুরো বছরের সবজির চাহিদা পূরণ করছেন। যাঁরা এখানকার সাধারণ কাজ যেমন ম্যাকডোনাল্ড বা ডানকিন ডোনাটে কাজ করছেন তাঁরাও রাজ্য ঘোষিত সর্বনিম্ন মজুরি পাচ্ছেন। এ টাকা দিয়ে বাসা ভাড়া করে পরিবার নিয়ে স্বচ্ছন্দে থাকতে পারছেন বাফেলোতে। যাঁরা পরিবার নিয়ে অভিবাসী হয়েছেন, তাঁদের জন্য এ এক বিরাট সুযোগ এবং স্বস্তি বলে তিনি মনে করেন।
রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান জানালেন, বাফেলোর মেয়র বায়রন ব্রাউন অভিবাসীবান্ধব হিসেবে পরিচিত। যেকোনো প্রয়োজনে নগর অফিস থেকে দ্রুত সহযোগিতা পাওয়া যায়। বাফেলো নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বলা যায়, শান্ত নগরী বাফেলো অভিবাসীদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

LEAVE A REPLY