পাকিস্তান-উত্তর কোরিয়া তলে তলে…

0
97
পাকিস্তান-উত্তর কোরিয়া তলে তলে...
পাকিস্তান-উত্তর কোরিয়া তলে তলে...

পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা নিয়ে বর্তমানে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। উত্তর কোরিয়া যুদ্ধ বাধানোর পাঁয়তারা করছে বলে পিয়ংইয়ংয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ। সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া সফলভাবে হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটি। এরপর থেকে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার ওপর নানা বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপে বিশ্ব জনমত তৈরির চেষ্টা করছে।

এ পরিস্থিতিতে আবার আলোচনায় এসেছে উত্তর কোরিয়া-পাকিস্তান সম্পর্কের বিষয়টি। অনেক দিন ধরেই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের পারমাণবিক ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে পশ্চিমা দেশগুলো। এসব অভিযোগ উভয় দেশ অস্বীকার করলেও নানা সময়ে তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক উঠেছে।

পাকিস্তানের পত্রিকা ডন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এরপর থেকে উভয় দেশ পারস্পরিক স্বার্থে বিভিন্ন বিষয়ে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। এ বিষয়টি পশ্চিমা বিশ্ব বরাবরই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছে। পাকিস্তানের স্বাধীনতার এক বছর পর ১৯৪৮ সালে দুই কোরিয়া পৃথক হয়ে যায়। তখন উত্তর কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়া’ (ডিপিআরকে) সরকার গঠন করে। কিন্তু ১৯৭০ সাল পর্যন্ত এই দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার সম্পর্ক তৈরি হয়নি। ১৯৭১ সালে উত্তর কোরিয়ার একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তান ১০ দিনের সফরে যায়। তখন উভয় দেশ একটি বিনিময় বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এরপর থেকেই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভ করে।

১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দুই দেশের মধ্যে দুটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। একটি পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহের জন্য এবং অন্যটি পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে। পরের বছর ৯ নভেম্বর দেশটি কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করে। ১৯৭৬ সালের মে মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর উত্তর কোরিয়া সফরকালে উভয় দেশের মধ্যকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার অধীনে উত্তর কোরিয়া পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ শুরু করে। এ চুক্তির ফলে তাদের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর হয়। ১৯৯৩ সালে প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো উত্তর কোরিয়ায় যান। তখন উত্তর কোরিয়া থেকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়, পারমাণবিক প্রযুক্তি বিনিময় এবং উত্তর কোরিয়ার শিক্ষার্থীদের পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ালেখার জন্য উৎসাহিত করতে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তখন উত্তর কোরিয়া দাবি করে যে তারা পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সহায়তা করেছিল। আর ইসলামাবাদ জানায়, পিয়ংইয়ংকে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে তারা সহায়তা করে।

বর্তমানে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে উত্তর কোরিয়ার একটি দূতাবাস ও অন্যান্য শহরে কনস্যুলেট অফিস রয়েছে। আর পিয়ংইয়ংয়ে পাকিস্তানের দূতাবাস রয়েছে। উত্তর কোরিয়া ও পাকিস্তানের এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে বরাবরই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে আসছে পশ্চিমা বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো। তাদের অভিযোগ, পাকিস্তান উত্তর কোরিয়ায় পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। যার ফলে দেশটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে পাকিস্তান।

পাকিস্তান-উত্তর কোরিয়া তলে তলে...
পাকিস্তান-উত্তর কোরিয়া তলে তলে…

সম্প্রতি বিবিসি উর্দুকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের প্রধান পরমাণুবিজ্ঞানী আবদুল কাদির খান বলেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক প্রযুক্তি পাকিস্তানের চেয়ে অনেক ভালো ও উন্নত। তিনিও ইসলামাবাদ থেকে পিয়ংইয়ংকে কোনো সহযোগিতার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক ক্ষেত্রে অনেক আগে থেকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। কারণ, তাদের উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন বিজ্ঞানীদের একটি দল ছিল।

উত্তর কোরিয়া সফলভাবে হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার এক দিন পরই এ মন্তব্য করেন পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির জনক কাদির খান। বিবিসিকে তিনি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির অধীনে তিনি দুইবার উত্তর কোরিয়া গেছেন এবং সেখানে তিনি দেখেছেন যে পাকিস্তানের তুলনায় তাদের অনেক উন্নত প্রযুক্তি রয়েছে। তাদের বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত সক্ষম এবং তাঁদের অধিকাংশই রাশিয়ায় পড়ালেখা করেছেন।

২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর কোরিয়া, লিবিয়া ও ইরানে পারমাণবিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবল সরবরাহের কথা স্বীকার করলেও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিতে পাকিস্তানের ভূমিকার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘এটা প্রশ্নাতীত বিষয়। তারা সামগ্রিক প্রযুক্তিগত দিক থেকে আমাদের তুলনায় অনেক ভালো। আমরা এখনো সেই একই পুরোনো এবং প্রচলিত প্রযুক্তি নিয়েই বসে আছি।’ তবে তিনি বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে উত্তর কোরিয়া ও পাকিস্তানের অবস্থান মোটামুটি একই পর্যায়ের।

উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে পাকিস্তানের পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে ইসলামাবাদের বিভিন্ন কূটনৈতিক সংকট দেখা দেয়। ২০০২ সালের অক্টোবরে কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, উত্তর কোরিয়ার গোপন পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য পাকিস্তান প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে। তবে তখনকার সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ এক সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘এ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। পারমাণবিক ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়াকে সহযোগিতার মতো কোনো বিষয় নেই। পাকিস্তান অনেকবার বলেছে এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে বলেছি যে পাকিস্তান কখনই পারমাণবিক প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করবে না এবং আমরা এই প্রতিশ্রুতিতে অনড় থাকব।’ একই বছরের নভেম্বরে মোশাররফ বলেছিলেন, পাকিস্তান পিয়ংইয়ংয়ের কাছ থেকে ক্ষুদ্র ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু তার দেশ এখন নিজেই তৈরি করতে পারে। তবে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোনো সহায়তার কথা অস্বীকার করেন। জাপানের সংবাদ সংস্থা কিউডোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট মোশাররফ নিশ্চিত করেছিলেন যে কাদির খান উত্তর কোরিয়াকে তাদের তৈরি যন্ত্র এবং নকশা সরবরাহ করেন। তবে এটা উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করেনি।

২০০৩ সালের মার্চ মাসে ক্ষেপণাস্ত্র খাতে বিনিয়োগের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার চেং ওয়াং সিনিয়ং করপোরেশন নামের একটি কোম্পানি খান রিসার্চ ল্যাবরেটরিজের (আবদুল কাদির খান) ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০০৪ সালে পাকিস্তানি পারমাণবিক বিজ্ঞানী আবদুল কাদির খান জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে জানিয়েছিলেন যে তিনি উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনে সহায়তা প্রদান করেছেন। পরে অবশ্য তিনি তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করে বলেন, তিনি ইসলামাবাদের চাপের মুখে পড়ে ওই বক্তব্য দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে কাদির খান এক প্রতিবেদনে জানান, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক সহায়তার বিষয়টি গোপন রাখার জন্য পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করেছে। কিন্তু ওই কর্মকর্তারা রিপোর্টটিকে অস্বীকার করে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করেন।

ওয়াশিংটন পোস্টের মতে, পরমাণুবিজ্ঞানী কাদির খান উত্তর কোরিয়ার জ্যেষ্ঠ একজন কর্মকর্তার ১৯৯৮ সালের একটি চিঠির অনুলিপি প্রকাশ করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সাবেক সেনাপ্রধানকে ৩০ কোটি ডলার এবং অন্য একজন সামরিক কর্মকর্তাকে পাঁচ লাখ ডলার ও কিছু গয়না দেওয়া হয়। তাঁরা দুজনই ওই চিঠির সত্যতা অস্বীকার করেন। ডনের খবরে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথে নিয়মিত চলাচলকারী সর্বশেষ মালবাহী জাহাজটি বন্ধ হয়ে যায়। জানা যায়, এখনো একটি প্রধান পাকিস্তানি কোম্পানি পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে নৌপরিবহন সেবা অব্যাহত রেখেছে।

সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। উভয়ই তাদের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করছে এবং সম্ভাব্য আক্রমণের জন্য একে অপরকে সতর্ক করে যাচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার ষষ্ঠ পারমাণবিক পরীক্ষার নিন্দা জানিয়ে ইসলামাবাদ বলেছে, ‘পাকিস্তান সব সময়ই বলে আসছে যে উত্তর কোরিয়াকে (ডিপিআরকে) জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে এবং সব পক্ষকেই উত্তেজক কর্ম থেকে বিরত থাকতে হবে।’

পাকিস্তানের সাবধানমূলক বিবৃতিটি এমন একসময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার সহযোগী বেইজিং ও মস্কো পিয়ংইয়ংকে সংযম দেখাতে অনুরোধ করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছে।

LEAVE A REPLY