গল্পটি পুরুষের কিন্তু কোনো পুরুষ বুঝবেনা

0
359
গল্পটি পুরুষের কিন্তু কোনো পুরুষ বুঝবেনা
গল্পটি পুরুষের কিন্তু কোনো পুরুষ বুঝবেনা

‘আপনি কী লেখেন?’ একটি নারীকণ্ঠ পেছন থেকে মৃদুস্বরে জানতে চাইল।

আমার হাতে তখন টনি মরিসনের বিলাভেড। কয়েক পৃষ্ঠা বাকি আছে, যাত্রাপথে শেষ করে ফেলা যাবে ভেবে হাতে রেখেছি। বইটা দেখে হয়তো আমাকে লেখক বলে মনে হয়েছে। কিংবা প্রশ্নটা অন্য কাউকে উদ্দেশ করেও হতে পারে, আন্দাজ করে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম না।

‘আপনি লেখক, তাই না?’ নারীকণ্ঠটি এবার আরও স্পষ্ট করে জানতে চাইল। এখন আমি উত্তরটা দিতে পারি। একবার মনে হলো, পেছনে ফিরে নিশ্চিত হয়ে বলি। আবার মনে হলো, হুট করে সরাসরি একটা মেয়ের দিকে তাকানো কি ঠিক হবে?

‘কী লেখেন আপনি?’ আমার উত্তর দিতে দেরি হচ্ছে দেখে নারীকণ্ঠটি ফের জানতে চায়।

‘গল্প। লেখার চেষ্টা করি আরকি।’ জবাব দিই আমি।

‘আপনার জন্যই অপেক্ষা করছি। আমার একটা গল্প আছে। আপনাকে লিখতে হবে।’ নারীকণ্ঠ এবার অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার স্বরে কথা বলে, কিন্তু আমি কোনো উত্তর দিই না।

‘ঠিক গল্পও না, ঘটনা।’ নারীকণ্ঠটি ফের বলে।

মেয়েটা বড্ড নাছোড়বান্দা তো! কেন যে আজ ট্রেনটা এত দেরি করছে! মনে মনে ভাবি আমি। বইটা হাতে না রাখলেও পারতাম। আবার একবার মনে হলো, রাজশাহী আজ না গেলেও হতো। বা যাচ্ছিই যখন, বাসে গেলে কী এমন অসুবিধা ছিল?

‘জানি না কত দিন এভাবে এখানে বসে আছি কোনো লেখককে গল্পটা বলব বলে। আজ আপনি এলেন। আমার গল্প না শুনে আপনি উঠতে পারবেন না। আমি যেমন আটকে আছি এই স্টেশনে গল্পটা কোনো একজন লেখককে শোনাব বলে, গল্পটা না শোনা পর্যন্ত আপনিও তেমন এখান থেকে বের হতে পারবেন না। এমনকি এই চেয়ার থেকেও উঠতে পারবেন না।’ নারীকণ্ঠের স্বরে দৃঢ়তা। আমার হাসি পায় তার কথা শুনে।

‘ভয় দেখাচ্ছেন?’ আমি বলি।

‘লেখকেরা একটু আত্মভোলা প্রকৃতির হন ঠিক আছে, তাই বলে আমি বলব আর আপনি মানবেন, এমন বোকা আপনি নিশ্চয় নন?’ নারীকণ্ঠ বলে।

আমি একবার উঠে দাঁড়ানোর কথা ভেবে আবার থেমে যাই। দাঁড়ানোর পর মেয়েটি যদি হি হি করে হেসে ওঠে? যদি বলে, আপনি তো আসলেই বোকা! ধুর এত বোকা হলে লিখবেন কেমন করে? এই বলে অবশ্য উঠে গেলে রক্ষা। কিন্তু যদি না ওঠে!

‘তাহলে মেনে নিলেন; তাই তো?’ মেয়েটি আমার চুপচাপ বসে থাকা দেখে জিজ্ঞেস করে।

‘বলুন গল্পটা। যেকোনো সময় ট্রেন চলে আসতে পারে। ততক্ষণ শুনি।’ আমার কথা শুনে মেয়েটি হাসে নিঃশব্দে। আমি না দেখেও টের পাই। নিশ্চয় খুব সুন্দর হাসি। মনে মনে আমি ভাবি। কিন্তু এতক্ষণ যখন তাকাইনি, এখন আর তাকালে সেটা ভালো দেখাবে কি, নিশ্চিত হতে না পেরে দমে যাই।

‘আমার আলাপ থেকে যতটা হালকা ভাবছেন, গল্পটি ততটা হালকা না। অনেক কষ্টের একটা গল্প।’

‘শুনলেই আমি বুঝতে পারব।’ একটু বিরক্তের সঙ্গে বলি আমি।

‘না, আপনি বুঝবেন না। আপনাকে আমি যতই বিশদে বিস্তারিত করে বলি না কেন, আপনি বুঝবেন না এই গল্পের কষ্ট।’ নারীকণ্ঠটি বলে ওঠে আগের চেয়ে আরও দৃঢ়ভাবে।

‘অবশ্যই আমি বুঝব। আমি সাহিত্যের ছাত্র। বিশ্বের প্রখ্যাত গল্পকারদের গল্প আমি পড়ি এবং কখনো কখনো বিশ্লেষণও করি।’ বিরক্তটা এবার রাগ হয়ে প্রকাশ পায়।

‘একজন নারীর ধর্ষিত হওয়ার কষ্ট একজন পুরুষ কেমন করে বুঝবে? আপনি যত পণ্ডিতই হোন না কেন, আপনি কী বুঝবেন ধর্ষণের শিকার একজন নারীর কষ্ট?’ নারীকণ্ঠটি জিজ্ঞেস করে। একেবারে অনাকাঙ্ক্ষিত এই প্রশ্নে আমি দপ করে নিভে যাই। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বলি, ‘ঠিক আছে, কোনো নারী লেখককে আপনার গল্পটা শোনান তবে। আমার ট্রেনও চলে আসবে এখন।’

‘কিন্তু এই তীব্র কষ্টের যন্ত্রণা পুরুষ যত দিন না অনুভব করছে—যেমন করে একজন নারী অনুভব করে—তত দিন ধর্ষণের শিকার হব আমরা। আপনাকে শুনতেই হবে এবং আপনাকে ধর্ষণের শিকার নারীর কষ্ট সমানভাবে অনুভব করতে হবে। পৃথিবীর কোথাও কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে যেন আপনিও ব্যথায় কুঁকড়ে যান। শঙ্কায় রাতের পর রাত কেটে যায় নির্ঘুম। আতঙ্কে প্রতিটা স্বপ্ন রূপান্তরিত হয় দুঃস্বপ্নে। আপনি প্রস্তুত তো? যতক্ষণ আমার গল্প শেষ না হচ্ছে, আপনি এখান থেকে উঠতে পারবেন না। যেখানে ধর্ষক মানেই পুরুষ, সেখানে ধর্ষণমুক্ত পৃথিবীর জন্য একজন পুরুষকে এটুকু করতে বলা নিশ্চয় বেশি বলা হলো না?’

এবার আমি সত্যি সত্যি রেগে যাই। ইচ্ছে হয় ওর মুখের ওপর হুট করে দাঁড়িয়ে বলি, চললাম। কিন্তু মনে-প্রাণে আমি চাই, পৃথিবীর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব পুরুষ এই পাপ থেকে মুক্তি পাক।

বাসটির নাম ছিল ‘নিরাপদ’। নারীকণ্ঠটি গল্পে প্রবেশ করে। বাসের ঠিক পেছনে ইংরেজিতে লেখা ছিল, ‘গড ব্লেইস ইউ’। ড্রাইভারের মাথার কাছে হয়তো ছোট্ট করে লেখা ছিল ‘বিসমিল্লাহ, আল্লাহর নামে চলিলাম’। অন্যদিনকার মতো সেদিনও নিরাপদে পৌঁছেছে বাসটা। নিরাপদে পৌঁছেছে বাসের ড্রাইভার, কন্ডাক্টর আর হেলপার। বাসটা রাস্তার কোথাও এতটুকু টলেনি, ধাক্কা খাইনি কোনো গাছ কিংবা বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসা কোনো গাড়ির সঙ্গে। তারপরও, বাসে মাত্র একজনই যাত্রী ছিল—সে মৃত। রক্তাক্ত। বাস থেকে তার ক্ষতবিক্ষত নিষ্প্রাণ শরীরটা ছুড়ে ফেলা হয়েছে জঙ্গলে। এরপর বাসটা পৌঁছে গেছে তার গন্তব্যে, নিরাপদেই! নারীকণ্ঠটি থামে। বড় করে শ্বাস নেয়।

একটু এদিক-সেদিক করলে এটা চমৎকার একটা জাদুবাস্তব গল্পের সূচনা হতে পারে। কিন্তু রুপা কোনো জাদুবাস্তব গল্পের চরিত্র নয়, এত দিনে আমরা জেনে গেছি। ‘নিরাপদ’ বাসটা এখন বাংলাদেশের অতিবাস্তব মেটাফর। নিরাপদেই চলছে দেশ। হয়তো গন্তব্যে পৌঁছেও যাচ্ছে অক্ষত, প্রতিনিয়ত। কথা রাখছে বাস, কথা রাখছে বাসের ড্রাইভার-হেলপার-কন্ডাক্টর। শুধু গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না একা এক নারী।—আমি মোবাইলে এভাবেই নোটটা নিয়ে নিলাম। আরেকটু গুছিয়ে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেওয়া যাবে। মেয়েটা যেভাবে শুরু করেছে, তাতে একটা গল্পও লেখা সম্ভব।

বাসের পেছনের ‘গড ব্লেইস ইউ’ লেখাটার কথা মনে করে কিংবা না করে বিশ্রীভাবে হাসি দিচ্ছিল বাসের চালক ও তার সাগরেদরা। একা সেই নারী সেটা বুঝতে পেরে কিংবা না পেরে অন্যদিকে আশ্রয় খোঁজে। একবার সে বিশ্বাস করে অলৌকিক কোনো পাখি এসে উঠিয়ে নেবে তাকে। ভাবে, পাড়ার যে ছেলেটা তাকে পছন্দ করত—বলবে বলবে করে বলতে পারেনি অনেক দিন—সে কি আসবে সিনেমার নায়কদের মতো তাকে উদ্ধার করতে? আবার সে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে চায়, টারজানদ্যওয়ান্ডারকারসিনেমার মতো বাসটা নিজেই জেগে উঠে ওকে রক্ষা করবে। সে কেবলই প্রার্থনা করে মুহূর্তটা যেন দুঃস্বপ্ন হয়।

নারীকণ্ঠটি আমার পেছনের আসন থেকে নির্বিকার স্বরে বলে যায়। এতক্ষণে ঘোষণা হয় রাজশাহীগামী ট্রেনটা কমলাপুর থেকে ছেড়েছে, অল্পক্ষণের মধ্যেই এয়ারপোর্ট স্টেশনে এসে পৌঁছাবে। আমি ব্যাগটা হাতের কাছে টেনে নিই। নারীকণ্ঠ বলে চলে।

একবার সে ভাবে, জানালাটা সরিয়ে লাফ দেবে বাইরে। আবার ভাবে, বেঁচে থাকবে নিজের স্বপ্নপূরণের জন্য। শুধুই কি স্বপ্ন? বাবা-মরা মেয়ে, অভাবের সংসারে ভাইয়ের প্রচেষ্টায় পড়াশোনা শেষ হয়েছে। বয়স হয়েছে মায়ের, চিকিৎসার অভাবে কত রোগ জমা হয়েছে শরীরে! এই দায়িত্ববোধকে অবহেলা করে লাফ দেওয়াটা কি ঠিক হবে? ছোটখাটো আরও কত সাধ ওর—বাড়ি ফিরেই মাকে চমকে দেবে বেতন বৃদ্ধির খরবটা দিয়ে, এই ঈদে পাড়ার শিশুদের নিয়ে হইহল্লা করবে, নতুন নোটে দু টাকা, পাঁচ টাকা করে ঈদ বোনাসও দিতে পারবে। ঈদের পর পাড়ার ক্রিকেট-পাগল ছেলেদের সঙ্গে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার শেষ টেস্টটা দেখবে। যদি সিরিজটা সত্যিই বাংলাদেশ জিতে যায়—ভেবেই ওর মনটা মুহূর্তের জন্য চাঙা হয়ে ওঠে। নারীকণ্ঠ এবার থামে, একটু কাঁপে, ফের বলা শুরু করে,Ñততক্ষণে ওর শরীরটা অবশ হয়ে গেছে নৃশংস থাবায়। এখন আর লাফ দিতে চাইলেও সম্ভব নয়। এখন তার মৃত্যু-বেঁচে থাকা কতগুলো পুরুষরূপী পশুর এই মুহূর্তের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু কী আশ্চর্য, যাদের সে চেনে না, কখনো চিনবেও না, পুরো জীবনটাই এখন তাদের হাতে! কোনো অধিকারবলে কেউ কি বলতে পারে? কেবল সে নারী আর ওরা পুরুষ বলে? নারীকণ্ঠটি প্রশ্ন করে সরাসরি, ‘আপনি পারবেন? আপনি তো লেখক। আবার আপনি পুরুষ। আপনার জানা উচিত।’

প্রশ্নের সম্ভাব্য জবাবগুলো আমি ভাবতে থাকি।

নারীকণ্ঠ আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে বলে, ‘জানেন, মেয়েটা একটা ছেলেকে পছন্দ করত। এবার বলবে বলে ঠিক করেছিল—ফোনে নয়, চিঠিতে। কয়েক দিনের কসরতে খসড়াটাও দাঁড়িয়ে গিয়েছিল মনে মনে। গাঁয়ে ফিরে কোনো এক মোরগডাকা ভোরে লিখে ফেলত। ওই ঘটনার পর মেয়েটির অনেক কথাই আপনারা জেনে গেছেন। এই কথাটা আপনি গল্পে লিখবেন না, এইটুকু মেয়েটার একান্ত কথা হয়ে থাক।’ নারীকণ্ঠটি বলে।

‘আচ্ছা লিখব না।’ আমি কথা দিই।

‘কাউকে ভালোবাসার কথা বলতে পারা খুব আনন্দের; তাই না?’ নারীকণ্ঠ জিজ্ঞেস করে। মেয়েটা বলতে পারেনি। মেয়েটা আরও অনেক আনন্দের স্বাদ নিয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল। একটা মেয়ে সমুদ্র না দেখেই চলে গেল; ভাবতে পারেন? পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুলটাকে একদিন সে নিজের গর্ভে ধারণ করবে ভেবে আনন্দে উল্লসিত হয়েছে। আপনি পুরুষ, ওই সুখের শিহরণ বুঝবেন না। আপনি নারীর অনেক কিছু ঠিকঠিক বুঝবেন না।

ট্রেনের লম্বা হুইসেল। রাজশাহীমুখী ট্রেনের স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণা আসে। আমি ব্যাগটা শক্ত করে ধরে বলি, ‘ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে, আমাকে উঠতে হবে। বাকিটা আমি আপনার মতো করে কতকটা বানিয়ে কতকটা কল্পনা করে লিখে ফেলত পারব।’

‘আপনি লেখক, বানিয়ে-কল্পনা করে অনেক কিছু লিখতে পারবেন; কিন্তু এই গল্পটা পারবেন না। নারীর অনেক কিছুই আপনি বানাতে পারবেন না।’ নারীকণ্ঠটি থামে। একটু ভেবে কিংবা কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বলা শুরু করে, ‘আমার গল্পটা না শেষ করে আপনি উঠতেও পারবেন না।’ মেয়েটার এই আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বরের প্রতি-উত্তর হিসেবে আমি ব্যাগটা ধরে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করি। চেয়ারটা সামান্য কাঁপে। এর বেশি সাধ্য হয় না আমার। অবশ একটা শরীর নিয়ে বসে আছি আমি, এতক্ষণে টের পাই।

শেষবারের মতন চিৎকার করেছে মেয়েটা—এবার আর বাঁচার জন্য নয়, সৃষ্টিকর্তা কিংবা মানুষ কারও কাছে কোনো প্রত্যাশা নিয়ে নয়—ধিক্কারে, নিজের নারীজন্মের ধিক্কারে। ধিক্কার দিয়েছে পৃথিবীর সুন্দর-অসুন্দর সমস্ত কিছুকে। ধিক্কার দিয়েছে আপনার মতো বিচক্ষণ পুরুষদের, যারা নারীর সবচেয়ে আনন্দের এবং সবচেয়ে বেদনার মুহূর্তটি অনুভব না করেই নারীকে বুঝতে পারে এমন একটা ভান করে। যত দিন পুরুষদের এই বোধ তৈরি না হবে, তত দিন আমরা ধর্ষিত হব। ধর্ষিত হব, জীবিত কিংবা মৃত। নারীকণ্ঠটি কিছুক্ষণ দম নিয়ে বলে, ‘গল্পটা রুপার নয়, আমার। তনু, রুপা, আমি, Ñআমরা—কেউই বিচ্ছিন্ন নই, চলমান ধর্ষকামী ইতিহাসের একেকটা শিকারমাত্র। আপনাদের কাছে ওটা একটা মুহূর্ত, বড়জোর ক্ষণিক দুঃস্বপ্ন; কিন্তু আমাদের জন্য জীবন! আমার গল্প শেষ। আপনি চাইলে এবার উঠতে পারেন। আর মুক্তি ঘটল আমারও। যে ট্রেন আসবে, সে ট্রেনেই এখন উঠে যেতে পারব।’ নারীকণ্ঠটি বলে।

‘আপনার গন্তব্য ঠিক নেই?’ আমি প্রশ্ন করি।

‘আমি নারী, সব ট্রেনই আমাকে একই গন্তব্যে পৌঁছে দেবে।’ নারীকণ্ঠ এবার আবৃত্তির ঢঙে বলে, ‘সব ট্রেনই গন্তব্যে ফেরে আবার সব ট্রেনই গন্তব্য থেকে ছিনিয়ে আনে। আপনি লেখক, আপনার সেটা জানা উচিত। কিন্তু আপনি পুরুষ, চাইলেও পারবেন না। আপনি নারীর অনেক কিছুই বুঝতে পারবেন না।’

মেয়েটা উঠে পড়ে, আমি টের পাই। উঠে দাঁড়াব কি না, কী বলে ওকে বিদায় জানাতে পারি—ভাবতে থাকি এসব। ভাবতে ভাবতে পেছন ফিরে দেখি, সিটটা ফাঁকা পড়ে আছে। খানিকটা দূরে দুই দিকে হেঁটে যাচ্ছে দুজন নারী। একজন শাড়ি পরে, ত্রিশোর্ধ্ব; অন্যজন সালোয়ার-কামিজে, তরুণী। দুজনের যে কেউ হতে পারে। কিংবা আরও খানিকটা দূরে যে মেয়েটা বোরকা পরে হেঁটে যাচ্ছে শরীরটা টান করে, বয়স বোঝা যাচ্ছে না চলন দেখে, হতে পারে সে-ও।

আমার আর রাজশাহী যাওয়া হলো না। ফিরে এলাম বিষণ্নœমনে। রাতে খেয়ে টেলিভিশনের সামনে বসেছি। চোখ আটকে গেল সংবাদের স্ক্রলে। বিকেলে সিলেটগামী চলন্ত ট্রেনে এক নারীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। লাশের পরিচয় মেলেনি।

‘কী পোশাক পরেছিল জানা দরকার।’ আমি বলি।

‘পোশাক দিয়ে তুমি কী করবা? তোমার পরিচিত কেউ কি ওই ট্রেনে ছিল?’ নীরা, আমার স্ত্রী, সহসা নড়েচড়ে জানতে চায়।

‘না। এমনি।’ চাপাস্বরে বলি আমি।

‘প্রতিদিন একটা করে ধর্ষণের খবর শুনি আর একটু একটু করে কুঁকড়ে যাই বিষাদে। রাতে ঘুমাতে পারি না।’ নীরা বলে।

‘তুমি তো আর একা একা দূরে কোথাও যাচ্ছ না!’ ওকে আশ্বস্ত করতে জবাব দিই।

‘তুমি পুরুষ মানুষ, বুঝবে না।’ বলে এক ঝটকায় চ্যানেলটা বদলে ফেলে নীরা।

LEAVE A REPLY