মেয়র আনিসুল হক লন্ডনের কোন হাসপাতালে ভর্তি হননি!

0
144
Anisul-Haque
Anisul-Haque

বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন গুমোট। চাপা আতংক সরকারি দল এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে। সরকারের মুখপাত্ররা স্বীকার না করুক, দেশে সম্প্রতি একাধিকবার সামরিক ক্যু’র প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে। বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যূত করার নীল নকশা সফল হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর বাস ভবনে (গণ ভবনে) হামলার পরিকল্পনাও ভেস্তে গেছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, দেশে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র চরম আকারে পৌঁছেছিল। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এরপরও কী হতে পারে-সরকার কি চাপের মধ্যে আছে বা বিএনপি কি সরকারের অধীনে নির্বাচনে আসবে-এমন প্রশ্ন সর্বত্র।

রাজনৈতিক সচেতন এবং ব্যবসায়ী মহলে যখন এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে-তখন সরকারি দলের শীর্ষ নেতারা খুঁজছেন-সম্প্রতি দেশে একধিক ব্যর্থ সামরিক ক্যু’র নেপথ্যে কারা ছিলেন? ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক কি সত্যিই গুরুতর অসুস্থ? মূমূর্ষ অসুস্থ হয়ে থাকলে তিনি তবে লন্ডনের কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন?

সরকারের শীর্ষ নেতাদের কাছে তথ্য আছে-মেয়র আনিসুল হক লন্ডনের কোন হাসপাতালে ভর্তি হননি। তাঁর গুরুতর অসুস্থ হবার খবরটি সঠিক নয়। তাহলে কেন তিনি এমন সংবাদের জন্ম দেবেন? ইতিমধ্যে যে ক’টি সামরিক ক্যু ব্যর্থ হয়েছে-এর যে কোন একটি সফল হলে মেয়র আনিসুল হককে দেখা যেত-নতুন এক নাটকীয় ভূমিকায়-এমন নীল নকশার কথা সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলে চাপা ও ফিসফাস করে আলোচনা হচ্ছে।

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো সম্প্রতি দেশে সামরিক ক্যু হয়নি বলে দাবি করলেও গত কয়েক মাসে অন্তত ৫ দফা সামরিক ক্যু হতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে বলে অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে। এসব ক্যু’র কথা গোপনে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি’র চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া যখন লন্ডনে অবস্থান করছিলেন, তখন সেনাবাহিনীতে একাধিকবার ক্যু’র প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। সরকারের নীতি-নির্ধারকরা মনে করছেন-এর পেছনে বিএনপি’র শীর্ষ নেতা এবং দুটি দেশের বিশেষ সংস্থার একাধিক কর্মকর্তার যোগ-সাজশ রয়েছে। এ ছাড়া খোদ আওয়ামী লীগেরও একাধিক নেতা. দু-একজন শীর্ষ শিল্পপতি এবং সুশীল সমাজের কয়েকজনের ইন্ধন আছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে।

গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সফরকালেও একটি সামরিক ক্যু ব্যর্থ হয়। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৩দিন দেরিতে দেশে ফেরেন বলে রাজনৈতিক মহলে কানা-ঘুষা হয়েছে। সর্বশেষ গত ২১ অক্টোবর মহাখালীতে বর্তমান ও সাবেক ২০ সেনা কর্মকর্তার বৈঠক-সরকারের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করে। বর্তমানে কুমিল্লা এবং চট্টগ্রাম সেনানীবাসে শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার ক্ষমতা রহিতকরণের খবর পাওয়া গেছে। সরকার শক্ত হাতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও জানা গেছে। সরকারী নীতি-নির্ধারকদের কাছে তথ্য আছে যে, সেনা বাহিনীর ক্যু’র মূল লক্ষ্য ছিল বর্তমান সরকারকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেয়া। এমন ক্যু সফল করতে এবং পরবর্তীতে কীভাবে সরকার পরিচালিত হবে-এমন নীল নকশাও তৈরি করা ছিল। সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন-বর্তমান সরকারের পতনের লক্ষ্যে সংগঠিত সামরিক ক্যু’গুলোর নেপথ্যে ইন্ধনদাতা ছিলেন বিএনপি’র চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। তাদের কাছে আরো তথ্য আছে যে, সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে গৃহীত ভিন্ন ভিন্ন নীল নকশার ক্রীড়াণক-এর ভূমিকায় রয়েছেন প্রধান বিচারপতি এস.কে. সিনহা।, ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতা, সুশীল সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি। সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলে প্রধান বিচারপতি এস. কে. সিনহা’র ভূমিকা গভীর সন্দেহের সৃষ্টি হলে তাঁকে কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছিল।

এক সময় সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলের ইঙ্গিতে প্র্রধান বিচারপতিকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখতে বাধ্যতামূলক ছুটি এবং অষ্ট্রেলিয়া অবকাশ যাপনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এতেও সরকারকে ফেলে দেয়ার ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র সামরিক উপদেষ্টা তানভির সিদ্দিকী’র চৌকুষ তৎপরতা এবং যথা সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণে কথিত সামরিক ক্যু ব্যর্থ হয়। সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলের কাছে তথ্য চলে আসে-দেশে সামরিক ক্যু বা অরাজকতার সৃষ্টি হলে মাঠ গরম করবে বিএনপি। একটা পরিস্থিতিতে অন্তবর্তী সময়ের জন্য একটি ‘সরকার’ গঠন করা হবে বিগত ওয়ান ইলাভেন পরবর্তী সরকারের আদলে। এমন হলে এবার এই সরকারের প্রধান হতে পারতেন মেয়র আনিসুল হক। কারণ, তিনি নির্বাচিত মেয়র। এমন চিত্রনাট্য সত্যি-বা মিথ্যা-এর পক্ষে বিপক্ষে যথার্থ প্রমাণ না থাকলেও সরকারের নীতি-নির্ধারণী মহলে-এই নীল নকশার কথা ফাঁস হয়েছে। এমন তথ্য ফাঁস (সকলের কাছে নয়)হবার পর মেয়র আনিসুল হকের গুরুতর অসুস্থতার খবরটির সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা চলে। অবিশ্বাস্য শোনালেও, সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হলে জানা যায়, লন্ডনের কোন্ হাসপাতালে আনিসুল হক ভর্তি হননি। তারমানে আনিসুল হকের গুরুতর অসুস্থ হবার সংবাদটি নির্জলা মিথ্যা। এমন সংবাদ সরকারের শীর্ষ নেতাদের কাছে ফাঁস হওয়া ‘নীল নকশা’র সত্যতা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।

অক্টোবর মাসের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্ক থেকে লন্ডনে গিয়ে কয়েকদিন থাকেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মেয়র আনিসুল হক কোন হাসপাতালে রয়েছেন-এর খোঁজ-খবর নেন। তারা আনিসুল হকের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাননি। এরপর প্রধানমন্ত্রী মেয়র আনিসুল হকের দু’সন্তানকে (ছেলে ও মেয়ে) নিজের হোটেল কক্ষে ডেকে আনেন এবং আনিসুল হকের খোঁজ-খবর নেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছিলেন-লন্ডনে আনিসুল হক কোথায়? আনিসুল হক অসুস্থ হয়ে লন্ডনের হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন অথচ প্রধানমন্ত্রী তাঁকে দেখতে গেলেন না-এ নিয়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্ত প্রকৃত ঘটনা ছিল রহস্যাবৃত।

আনিসুল হকের পরিবার থেকে জানানো হয়, তিনি (মষ্তিস্কে ক্ষরণে) দীর্ঘদিন জ্ঞান হারিয়ে হাসপাতালের ইনসেনটিভ কেয়ারে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ইনসেনটিভ কেয়ারে আছেন-অথচ তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে না-তিনি কোন হাসপাতালে রয়েছেন। এ্টিও রহস্য ও প্রশ্নের জন্ম দেয়। সর্বশেষ, গত ৩ নভেম্বর আনিসুল হকেরে একান্ত সচিব এ কে এম মিজানুর রহমান মিডিয়ায় প্রেরিত এক বিবৃতিতে জানান, তাঁর অবস্থার একটু উন্নতি হয়েছে। তিনি হাসপাতাল ছেড়ে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরিত হয়েছেন। তাঁকে ফিজিওথেরাপী সেন্টারে ভর্তি করা হয়েছে। এই বিবৃতিতেও হাসপাতাল বা ফিজিওথোরপি সেন্টারের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

আনিসুর হক লন্ডনের কোন হাসপাতালে আছেন বা চিকিৎসা নিয়েছেন-এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে আমাদের লন্ডন প্রতিনিধি গত ৩ নভেম্বর লন্ডন শহরের প্রায় সবকটি হাসপাতালে খোঁজ করেছেন। হাসপাতালগুলো থেকে জানা গেছে-আনিসুল হক নামে কোন রোগী হাসপাতালে নেই বা চিকিৎসা নেননি। এই হাসপাতালগুলো হচ্ছে-লন্ডনের রমফোর্ড এলাকার কুইন্স এলিজাবেদ হাসপাতাল, সেভেন কিংস এলাকার কিং জর্জ হাসপাতাল, হুইটসক্রস এলাকার হুইপসক্রস ইউনিভারসিটি হাসপাতাল, লেটোন স্টোন এলাকার রয়েল লন্ডন হাসপাতাল,

ইষ্ট লন্ডনে হোয়াই চ্যাপেল এলাকার সেন্ট থমাস হাসপাতাল, সংসদ ভবন সংলগ্ন ওয়েস্ট মিনিষ্টার হাসপাতাল, ম্যারিল্যান্ড এলাকায় ম্যারিল্যান্ড হাসপাতাল, বেটনাল গ্রীন এলাকায় বেটনাল গ্রীন হাসপাতাল, সিলভার ব্রাউন হাসপাতাল, হ্যাককেনী এলাকায় হোমারটোন হাসপাতাল, সেন্ট্রাল লন্ডনের লন্ডন ব্রিজ হাসপাতাল এবং লন্ডন সিটির সেন্ট ব্রাথোলম্যানুজ হাসপাতাল এবং ক্যান্সার ইনস্টি্টিউট। এই হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে-আনিসুল হক নামে কেউ ভর্তি হননি। মেয়র আনিসুল হকের গুরুতর অসুস্থতার কারণ জানতে লন্ডনে যারা বাসবাস করেন-তাদের মধ্যে কৌতুহলী অনেকে চেষ্টা করেছেন-তিনি কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তা জানতে। বিশেষ করে ইউকে আওয়ামী লীগের নেতারা আনিসুল হকের চিকিৎসার খোঁজ করেছেন। তারা আনিসুল হকের চিকিৎসার কোন খবর জানতে পারেননি। গত দু’সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাসিমের ছোট ভাই খালিদ হোসেন ইয়াদ (তিনি মাদারীপুর পৌরসভার মেয়র) লন্ডনে গিয়েছিলেন। তিনি ইউকে এবং ইউরোপীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে টানা ছয়দিন লন্ডনের বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে আনিসুল হকের খোঁজ করেছেন। এই তথ্য-তালাশ অভিযানে তার সঙ্গে ছিলেন ইতালী আওয়ামী লীগের প্রধান উপদেষ্টা আব্দুল হান্নান ও অপর নেতা সম্রাট, ইউকে আওয়ামী লীগের নেতা নেসার আহমেদ ও হানিফ চৌধুরী। তারা আনিসুল হকের কোন হদিস পাননি বলে জানান-আমাদের লন্ডন প্রতিনিধিকে। লন্ডন প্রবাসীদের কাছে প্রশ্ন উঠেছে-আনিসুল হক আসলে কোথায়? তিনি কি সত্যিই অসুস্থ? দিন যত যাচ্ছে-এই প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ছে তত-সর্বত্র।

LEAVE A REPLY