মার্কিন বিমান বাহিনীতে যোগ দেওয়া হলো না বাঁধনের

0
71
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের তেলীপাড়া এলাকার বাসিন্দা এম হাসান রহমান বাঁধন। ছবি : সংগৃহীত
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের তেলীপাড়া এলাকার বাসিন্দা এম হাসান রহমান বাঁধন। ছবি : সংগৃহীত

গাজীপুরের সন্তান বাঁধন। ছোটবেলা থেকেই ডানা মেলে আকাশের অনেক উঁচুতে ওঠার স্বপ্ন ছিল মেধাবী এই তরুণের। স্বপ্নকে সত্যি করতে তাই সিদ্ধান্ত নেন, বড় হয়ে পাইলট হবেন। দূরন্ত বিমান নিয়ে মুক্ত আকাশের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে উড়ে বেড়াবেন।

স্বপ্নকে সত্যি করতে বাঁধন পাড়ি দেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে বিমান প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করেন। অদম্য ইচ্ছে আর মেধার ফলে সুযোগ পান যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীতে কাজ করার। তবে এত কিছুর পরও সেখানে যোগ দেওয়া হলো না ২৬ বছর বয়সী এই তরুণের। দুর্বৃত্তদের গুলি কেড়ে নিল তাঁর আকাঙ্ক্ষা।

ছেলে বাঁধনের স্বপ্নের কথা এভাবেই বলছিলেন প্রকৌশলী মুজিবুর রহমান। গত রোববার বেলা ১১টার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস অঙ্গরাজ্যে কয়েকজন বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হন বাঁধন। ২০১১ সাল থেকে সেখানেই বসবাস করছিলেন তিনি।

এম হাসান রহমান বাঁধনের বাড়ি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের তেলীপাড়া এলাকায়। মা হোসনে আরা বেগম বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তাঁরা।

মুজিবুর রহমান জানান, বাঁধন খুব মেধাবী ছিল। ছোটবেলা থেকেই তাঁর পাইলট হওয়ার এবং বিমান বানানোর প্রতি আগ্রহী ছিল। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের রাণী বিলাসমণি উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ও পরে রাজধানীর উত্তরা হাই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন বাঁধন। সবশেষে ঢাকা বিজ্ঞান কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি।

এরপর বিমান প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাসের উইচিটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন বাঁধন। পড়াশোনা চলাকালীন বিভিন্ন চাকরিও করেন তিনি। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ক্যাম্পাসের বাইরে চাকরি করার অনুমতি দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি মার্কিন বিমান বাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য পরীক্ষায় অংশ নেন বাঁধন। সেখানে ১০০-এর মধ্যে ৮৭ নম্বর পান তিনি।

পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর গত অক্টোবরে মার্কিন বিমান বাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল বাঁধনের। কিন্তু দেশটির সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে যোগদান প্রক্রিয়ায় কিছুটা দেরি হচ্ছিল। আর এমন সময়েই তাঁর প্রাণ কেড়ে নেয় ঘাতকের গুলি।

কারা বাঁধনকে হত্যা করতে পারে- এ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি তাঁর বাবা। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীরা উচ্ছৃঙ্খল ছিল। তাঁরা কোনো লেখাপড়া বা কাজ করত না। বরং অন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ছিনতাই করত। বাঁধন বিভিন্ন সময় ক্যাম্পাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে এসব কথা জানিয়েছে। বাঁধনের কোনো শত্রু নেই। শত্রুতা হওয়ারও কথা নয়। তাঁর সঙ্গে কারো শত্রুতা রয়েছে, এমন কথা সে কখনো বলেনি।’

ভাইয়ের শোকে মূহ্যমান বাঁধনের একমাত্র বোন আইইউবিএটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী মারজানা রহমান ভাবনা, বাকরুদ্ধ মা।

বাঁধনের মা হোসনা আরা বেগম জানান, প্রায় সাড়ে ছয় বছর আগে ২০১১ সালের জুনে আমেরিকায় পাড়ি দেন বাঁধন। এরপর আর কোনো ছুটি পাননি তিনি। ফলে দেশে আসতে পারেননি। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার পর মোবাইলে বাঁধনের সঙ্গে প্রায় ৩১ মিনিট কথা হয় তাঁর। সে সময় মাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে বেড়ানোর ইচ্ছের কথা জানান বাঁধন।

হোসনের আরা আরো বলেন, বাঁধন ও তাঁর ছোটবেলার বন্ধু নাঈম ক্যানসাসে একই সঙ্গে থাকতেন। পুলিশের বরাত দিয়ে হত্যাকাণ্ডের খবর সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাঁদের জানানো হয়।

বাঁধনের একমাত্র বোন মারজানা রহমান ভাবনা বলেন, ‘ভাইয়ার সঙ্গে আমার বয়সের পার্থক্য পাঁচ বছর। ভাইয়া আমাকে সন্তানের মতো দেখাশুনা করত। দেশে থাকতে কখন কী লাগবে সবকিছু ভাইয়া দেখত। আমার মাথায় চুল আঁচড়িয়ে দিয়ে ক্লিপ আটকিয়ে দিত। পড়াশোনার খোঁজ-খবর নিত।’

LEAVE A REPLY