মায়ের মৃত্যুতে কার্লোসের কান্না

0
111
মায়ের মৃত্যুতে কার্লোসের কান্না
মায়ের মৃত্যুতে কার্লোসের কান্না

Monija Rahman: NewYork: জীবনে এই প্রথম কেউ কার্লোসকে কাঁদতে দেখল। সাধারণ কান্না নয়। রীতিমত হাউমাউ করে কান্না। জেল খাটা আসামী, দিন নেই-রাত নেই বারে-ক্লাবে মদ খেয়ে চুর হয়ে পড়ে থাকা কার্লোসও যে কাঁদতে পারে এই প্রথম জানলো সবাই। ওর কান্না আশেপাশের মানুষের মনকেও আর্দ্র করল। সবাই ওকে ধরাধরি করে গাড়ীতে জ্যাকসন হাইটস থেকে ব্রংকসে ওর বাসায় পৌঁছে দিয়ে এল। এতখানি মনোযোগ জীবনে কোনদিন পাইনি ও।
মেক্সিকোর কোন এক পাহাড়ী গ্রামে থাকত কার্লোসের মা। হার্ট এ্যাটাকে হঠাৎ মৃত্যু হয় তাঁর। কার্লোস তখন জ্যাকসন হাইটসে এক দোকানে কাজ করছিল। দোকানটা আমার প্রতিবেশী ভাইয়ের। ২০০৪ সাল থেকে ওই দোকানের কর্মচারী সে। কেউ মোবাইলে কার্লোসকে মায়ের মৃত্যু সংবাদ জানানোর পরে ওর হাউহাউ করে কান্নায় সবাই চমকে যায়। মনে হচ্ছিল বুকের একদম গহিন ভেতর থেকে উঠে আসছে সমস্ত আবেগ। জীবনের বহু বঞ্চনা আর চাপা কষ্ট। কোনভাবে নিজেকে সংবরণ করতে পারছিল না ও।
আজ থেকে ১৪ বছর আগে পায়ে হেঁটে মেক্সিকান সীমান্ত পার হয়ে স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় এসেছিল কার্লোস নামে ২২ বছর বয়সী এক তরুণ। তারপর বহু ঘাতপ্রতিঘাত সয়ে শেষ পর্যন্ত থিতু হয় এই নিউইয়র্কে। ঝঞ্ঝামুখর জীবনে দিন শেষে কার্লোস ভাবতো একদিন ফিরবে ওর পাহাড়ী গ্রামে। যেখানে ওর মা আছে। আছে ওদের ছাগল-ভেড়ার পাল। কিন্তু সেই ফেরা আর হয়নি।
কিভাবে ফিরবে কার্লোস? ওর তো কোন কাগজপত্র নেই। ও তো এই দেশে অবৈধ। পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই দালালের সাহায্য নিয়ে কার্লোসের মতো হতদরিদ্র মেক্সিকানরা জীবন বাজি রেখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মেক্সিকো ঢোকে। আমেরিকান সুশিক্ষিত সীমান্তপ্রহরীদের চোখ ফাঁকি দেয়া সহজ নয়। হেলিকপ্টার পাহাড়া দেয় ওপর থেকে। তবু মেক্সিকানরা উত্তাল নদী পার হয়ে, দিগন্ত বিস্তৃত গম ক্ষেতের মধ্য দিয়ে কিংবা সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে আমেরিকায় ঢোকে।
ভিসেন্তে মোরালেস কার্লোসও তাদের একজন।
কার্লোসের অনেক দোষ। প্রচন্ড মদের নেশা। মাঝে মাঝে এজন্য কোন খবর থাকে না ওর। একবার আমার সেই ভাইয়ের মোবাইলে ফোন এল। ‘বস আমাকে নিয়ে যান।’ আমার ভাই বলল- ‘তুই কই?’ কার্লোসের উত্তর –‘আমি তো জেলখানায় বস।’
সেবার মারামারি করার কারনে, আরেকবার একই নামে দুটি ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স রাখার জন্য পুলিশ ওকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়। দুইবারই আমার সেই ভাই বন্ড সই করে আড়াই হাজার ডলার জরিমানা দিয়ে ওকে ছাড়িয়ে আনে । পরে কার্লোস কাজ করে সেই অর্থ শোধ করে।
মনে আছে, প্রায় তিন বছর আগে যখন নিউইয়র্কে প্রথম আসি আমাদের সেই ভাইয়ের গাড়ী চালিয়ে কার্লোসই আমাদের নিয়ে এসেছিল এয়ারপোর্ট থেকে। তারপর বাসায় পৌছানোর পরে ভারী ভারী ব্যাগগুলি ওপরে তুলে দেয়।
যে জন্য নিউইয়র্কে আসার প্রথম দিন থেকে কার্লোসকে চিনতাম। ওই ভাইয়ের দোকানে গিয়ে কার্লোসের খোঁজ করতাম। ভাই আর ভাবীর ভাষায় কার্লোস ছিল অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ‘কেষ্টা বেটা’র মতো। সারাদিন ওকে গালাগালি দিচ্ছেন, আবার শত দায়িত্বহীনতা সত্তেও ওকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন না।
একবার শুনলাম চার ছেলে মেয়ে কার্লোসের বউ চলে গেছে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে সন্তানের বাপ হয় কার্লোস। কিন্তু তাতে কি? পরিবারের ব্যাপারে ও প্রচন্ড উদাসীন। এই যে বউ চলে গেল, এক বছর দুজনে আলাদা, এ নিয়ে ওর কোন ভাবান্তর নেই। পুরো সপ্তাহের বেতন এক রাতে মদ আর জুয়া খেলে উড়িয়ে দিয়েও কোন অনুশোচনা নেই। ওকে মনে হত বোধবুদ্ধিহীন একটা জড়পদার্থ।
কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পরে ওর অঝোরে কান্না জানান দিল কার্লোসেরও একটা নরম-কোমল মন আছে। ওরও একটা স্বপ্ন আছে। ওর মধ্যেও প্রচন্ড কষ্ট আছে ১৪ বছর ধরে ছেলের অপেক্ষায় থাকা মায়ের শীর্ণ মুখটা না দেখার।
আমাদের বাঙ্গালী মায়ের মতোই কার্লোসের মা নানাজনের হাত দিয়ে অনেককিছু পাঠাতেন ছেলের জন্য। ছাগলের দুধ। সূর্যমুখী ফুল, মিষ্টি কুমড়া, লাউয়ের বিচি। ঝিঁঝি পোকা ভাজা। মাটির ভিতরে জমিয়ে রাখা টাকিলা মদ। কিছুদিন পরে ক্রিসমাস আসবে। কিন্তু কেউ ছেলের কথা ভেবে পাহাড়ী গ্রাম থেকে আর কিছু পাঠাবে না।
ওয়েস্টার্ণ বইয়ে পড়তাম আউট ল’দের দলে সবসময় একজন মেক্সিকান থাকে। সে মাটিতে পায়ের ছাপ দেখে পুরো দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু গানফাইটে কখনও অংশ নেয় না। কারন ওরা প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতির মতোই সরল। মানুষের রক্তে হাত লাল করা ওদের কাজ না। এই মহাদেশের ভূমিপুত্র ওরা।
ওই সমস্ত আউট ল’দের বংশধর, মেক্সিকানদের ভিটেমাটি ছাড়া করে, ওদের লক্ষ লক্ষ একর জমি দখল করা শ্বেতাঙ্গ সেটলারদের যোগ্য বংশধর আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্র্রাম্প। যিনি কার্লোসদের মতো সব অবৈধদের এই দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে চান। তিনি চান মেক্সিকান সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ করতে। কারণ ট্রাম্পের চোখে এই সমস্ত মেক্সিকানরা- ‘ধর্ষক’, তারা ‘সন্ত্রাসী’।
এভাবেই বুঝি যুগে যুগে মহারাজরা ‘সাধু’ হয় আর দরিদ্র মানুষেরা হয় ‘চোর’।
– মনিজা রহমান, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, নিউইয়র্ক
(ছবিতে মেক্সিকোর গ্রামের বাড়ীতে কার্লোসের মা। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তোলা ছবি।)

LEAVE A REPLY