স্বাধীনতাযুদ্ধের কৃতিত্ব জনগণকে ফিরিয়ে দিলেই দেশটা সভ্য হতে শুরু করবে

0
73
স্বাধীনতাযুদ্ধের কৃতিত্ব জনগণকে ফিরিয়ে দিলেই দেশটা সভ্য হতে শুরু করবে
স্বাধীনতাযুদ্ধের কৃতিত্ব জনগণকে ফিরিয়ে দিলেই দেশটা সভ্য হতে শুরু করবে

স্বাধীনতাযুদ্ধের কৃতিত্ব জনগণকে ফিরিয়ে দিলেই দেশটা সভ্য হতে শুরু করবে
মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের বিজয়ের ৪৫ বছর পূর্ণ হয়ে ৪৬ বছরে পা রাখতে যাচ্ছে। এ উপলক্ষে উন্নয়ন ও গণমাধ্যমকর্মী মোহাম্মদ গোলাম নবী আগামী ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জন-ব্যর্থতা ও করণীয় বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখছেন চ্যানেল আই অনলাইন পাঠকদের জন্য। পর্ব-১৩

একবার ৩০/৩২ বছর বয়সী এক ফেসবুক বন্ধু লিখল- কোন একটি সভ্য দেশে গিয়ে মরতে চাই। শহর থেকে গ্রাম। যেখানেই যাবেন সবার মুখে এক কথা। সুযোগ পাইলেই বিদেশ চলে যাবে। দেশ নিয়ে সবার মনে এক ধরনের অতৃপ্তি আর অসন্তোষ। এটা কেন?

৪৫ বছর আগে বাংলাদেশ নামের একটি দেশের জন্ম হয়েছিল জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। যুদ্ধে যে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিল তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ জনতা। যে তরুণরা সেদিন অস্ত্র হাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল তাদের বেশিরভাগ ছিল স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্র, শিক্ষক ও পেশাজীবি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যারা দেশটাকে যুদ্ধ করে স্বাধীন করল। যারা জীবন দিল দেশ স্বাধীন করার জন্য তারা হয়ে গেলো সংখ্যালঘু। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা আর পাত্তা পেলো না। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে নিলো রাজনীতিকরা, যারা স্বাধীনতার যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়নি। দ্বিতীয়ত প্রশাসনের দায়িত্ব নিলো পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা কিংবা স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সরকারের চাকরিতে যুদ্ধের নয় মাস চাকরি করা কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা। এদিকে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা ছাত্র ও শিক্ষকরা ফিরে গেলেন তাদের স্ব স্ব স্থানে। পাস করে দেখেন তাদের জন্য উপযুক্ত জায়গা নেই। হতাশাগ্রস্ত হয়ে সত্তরের দশকের প্রথমভাগে বিশেষ করে মেধাবী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একাংশ দেশ ছাড়লেন। আরেকদল তৈরি করল জাসদ নামে একটি বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। সবমিলিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা ও আশা নিয়ে একটা জনযুদ্ধ হয়েছিল, সেই যুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীরা দেশ মাতৃকায় তাদের ভূমিকা দেখতে না পেয়ে ধীরে ধীরে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়লেন।

স্বাধীনতাযুদ্ধের কৃতিত্ব জনগণকে ফিরিয়ে দিলেই দেশটা সভ্য হতে শুরু করবে
স্বাধীনতাযুদ্ধের কৃতিত্ব জনগণকে ফিরিয়ে দিলেই দেশটা সভ্য হতে শুরু করবে

ফেসবুকের সভ্য দেশে গিয়ে মরতে চাওয়া বন্ধুকে বললাম, “দেশটাকে সভ্য বানালেই তো হয়।” তার উত্তর ছিল, “একটা প্রজন্মকে পুরো জীবন দিয়ে খাটতে হবে। তারপরও বিফল হওয়ার রিস্ক থেকে যায়।” কিন্তু সেদিন সে আমার সঙ্গে একমত হয়েছিল আমরা যে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছি তারচেয়ে একটি ভালো বাংলাদেশ আমাদের সন্তানদের জন্য রেখে যাওয়া আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আমার কিশোরী মেয়ে একদিন আমাকে বলেছিল “এই দেশটাকে ধ্বংস করে নতুন করে শুরু করা না গেলে বাবা তোমার স্বপ্ন পূরণ হবে না।” আমার মেয়ের সেই কথায় আমি চমকে গিয়েছিলাম। তারপর দেখলাম এই কথা আরো অনেকেই বলে। বিষয়টি আমার কাছে অনেকটা সেই জামা পরার মতো। রাস্তায় বের হওয়ার পর দেখা গেলো ওইদিন ওই কালারের জামাই বেশিরভাগ মানুষ পড়েছে।

ফেসবুকের সেই বন্ধুর সঙ্গে আলাপচারিতা কিংবা মেয়ের সঙ্গে কথা বলা সবই ৭/৮ বছর আগের কথা। তারপর থেকে আমি ভাবছি, আর ভাবছি সমস্যার গোড়াটা কোথায়? বিশ্বাস করুন, আমি খুঁজে পেয়েছি সমস্যার গোড়াটা কোথায়। পাঁচটি পরস্পর সম্পর্কিত বিষয় আমাদের সামনে আগানোর গতি শ্লথ করে দিয়েছে।
এক. স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়লাভের জনযুদ্ধের কৃতিত্ব জনগণকে না দিয়ে ও তাদেরকে সর্বোচ্চ সম্মান না দিয়ে সবজায়গায় রাজনীতিবিদদের কৃতিত্ব দাবী করা;
দুই. স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হওয়া ৩০ লাখ মানুষের নাম ঠিকানা লিপিবদ্ধ করার মাধ্যমে তাদেরকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনে ব্যর্থ হওয়া;
তিন. স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে যে ১ লাখ ৭৮ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ভারত থেকে নিয়মিত ভাতা পেয়েছেন তাদের সঠিক তালিকা প্রকাশ না করে মুক্তিযোদ্ধার নতুন নতুন তালিকা প্রণয়ন করা। যেকারণে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার আধিক্য বাড়ছে এমনকি সচিবগণও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নিজেদের নাম উঠাচ্ছেন।
চার. স্বাধীনতার ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ না করা ও করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয়া। যার ফলে ইতিহাস বর্ণনা করার বিষয় হলেও স্বাধীনতার ইতিহাস প্রতিনিয়ত নির্মাণ করা হচ্ছে। এবং
পাঁচ. একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রবর্তন ও চর্চায় ব্যর্থ হওয়া অর্থাৎ যে গণজাগরণের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল সেই ধারাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়া।

উল্লেখিত ৫টি কারণের পেছনে আবার দুটো বড় কারণ রয়েছে- লোভ আর মিথ্যার সংস্কৃতি। তাহলে কি দাঁড়াল লোভ আর মিথ্যাকে আমরা যদি পরাজিত করতে পারি তাহলে আমরা স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৫টি বাধা দূর করতে পারব। এদিকে আমার বন্ধুদের যতো চেষ্টা থাকে আমার ধ্যান ধারণাগুলো কতোটা অবাস্তব সেটা প্রমাণ করা।

এক কলেজবন্ধু আমাকে একটা ধাঁধা দিল- একজন পুলিশ কমিশনার তার অধীনস্থ কয়েকজন ডেপুটি কমিশনারকে পৃথকভাবে ডেকে প্রতিমাসে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দাবী করলেন। সেই দাবী পূরণ করার জন্য তাদের কেউ কেউ তাদের অধীনস্থ থানাগুলোর ওসিদের ডেকে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দাবী করলেন। তবে তাদের দাবীকরা অর্থের পরিমাণ কমিশনারের দাবীকৃত অর্থের চেয়ে বেশি। ওসি সাহেবরা স্ব স্ব থানায় গিয়ে ডেপুটি কমিশনার সাহেবদের দাবীকৃত টাকা সংগ্রহের নামে কয়েকগুণ বেশি টাকা তুলতে শুরু করলেন। কোন কোন ওসি সংগ্রহকৃত অর্থ থেকে একটা অঙ্ক সরাসরি এলাকার এমপি এবং পুলিশ কমিশনারকে পৌঁছাতে লাগলেন। পুলিশ কমিশনার দেখলেন তার ডেপুটি যে টাকা দেয় তারচেয়ে ওসি সাহেব বেশি দেয়। ফলে ডেপুটির গুরুত্ব কমে গেলো, ওই ওসি সাহেবের গুরুত্ব বেড়ে গেলো। আগে যে ওসি সাহেব ডেপুটি কমিশনারকে দেখলে ভয়ে তটস্থ থাকত, সে এখন আর তাকে ভয় পায় না। এমপি সাহেবের কাছেও ওসি সাহেবের গুরুত্ব বেড়ে গেছে। লোভ ও মিথ্যার সংস্কৃতিতে চেপে ওসি সাহেবের ক্ষমতায়ন হয়েছে। বন্ধু আমার এইটুকু বলে থামল। বলল, কি ধাঁধা আরো জটিল করব নাকি এখানে থামব?

আমি বললাম, যথেষ্ট জটিল ধাঁধা দিয়েছিস। আরো জটিল করতে চাইলে কর। যতো কঠিন হবে সেটা খোলা ততো সহজ। কথাটা বলে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি দিলাম। বন্ধু আমার মুচকি হাসি দিয়ে বলল- থাক এটাই সমাধান কর। ধর তুই আইজিপি। কি করবি? আমি বললাম দেশের বর্তমান সংস্কৃতি অনুযায়ী এই সমস্যার সমাধান আইজিপি সাহেব করতে পারবেন বলে মনে হয় না। এজন্য প্রথমত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ লাগবে। আর সেসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পাশে লাগবে একটা দেশপ্রেমিক টিম। সেই টিমটা বর্তমানকে নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে একই ঘটনা না ঘটে সেই ছিপি বন্ধ করার জন্য কাজ করবে। আর সেজন্য দরকার হবে সকল স্তরের শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। সার্টিফিকেট সর্বস্ব লেখাপড়া শুরুতেই বন্ধ করতে হবে। সেসঙ্গে বন্ধ করতে হবে সংখ্যার খেলা তথা মিথ্যা পরিসংখ্যান দিয়ে জনগণকে ও বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করার সংস্কৃতি। আরো দরকার হবে তোষামোদকারী আর তৈলবাজদের গুরুত্বপূর্ণ সকল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া। জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে। জনগণ যেন ৩০০ দেশপ্রেমিককে নির্বাচিত করতে পারে সংসদের জন্য, ৪৫০০ দেশপ্রেমিককে নির্বাচিত করতে পারে ইউনিয়ন পরিষদের জন্য এবং ৫০০ জন দেশপ্রেমিককে নির্বাচিত করতে পারে উপজেলার জন্য সেই অধিকার তাদেরকে দিতে হবে এবং সেই অধিকার যাতে চর্চা করা যায় সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে থমাস আলভা এডিসনের সেই কথাটা আমরা স্মরণ করতে পারি: “আমি পৃথিবীর চাহিদা জেনে তারপর সেই চাহিদা পূরণের জন্য নতুন কিছু উদ্ভাবন করি।” আমাদের দেশের দায়িত্বশীল মানুষরা নিজেদের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে দেশের মানুষের চাহিদাকে উপেক্ষা ও অবহেলা করেন। যা অসভ্যতা।

স্বাধীনতাযুদ্ধের কৃতিত্ব জনগণকে ফিরিয়ে দিলেই দেশটা সভ্য হতে শুরু করবে
স্বাধীনতাযুদ্ধের কৃতিত্ব জনগণকে ফিরিয়ে দিলেই দেশটা সভ্য হতে শুরু করবে

খেয়াল করলে দেখবেন আমাদের দেশে অতীত ও ভবিষ্যৎ আলোচনা সবসময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সবসময় খুব উপেক্ষিত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই এমনটা চলে আসছে কিনা জানি না। তবে ১৯৯৩/৯৪ সাল থেকে তেমনটাই দেখে আসছি। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সুন্দর ভবিষ্যত নির্মাণ করার জন্য বর্তমানে কাজ করার কোন সুস্থ লক্ষণ আমরা দেখতে পাই না। বরং অতীতের কচকচানি আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা করে এক ধরনের শত্রু শত্রু খেলায় বর্তমানকে বিসর্জন দিতেই আমাদের যতো চেষ্টা। অতীত ও ভবিষ্যতের বর্তমানকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে বড় ধরনের অসভ্যতা মনে হয়। রাষ্ট্রীয় জীবনের এই ধরনের অসভ্যতার উদাহরণ অন্য কোথাও আছে কিনা জানি না।

আমাদের আরেকটি অসভ্যতা হলো কার্যকারণ অনুসন্ধান না করা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা খালি চোখে যা দেখা যায় সেটাকে ধরে নিয়েই বিচার করতে বসে যাই। সেই ঘটনা নিয়েই আমরা তোলপাড় করে ফেলি সবকিছু। ঘটনাটি কেন ঘটল এবং ঘটনাটি যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে তা নিয়ে আমাদের তৎপরতা থাকে না।

আমাদের জাতীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে গ্রামের রাজনীতিতে পর্যন্ত উস্কানি একটি নিত্য ব্যবহার্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অন্যকে উত্তেজিত ও খোচাখুচি করার মধ্যে জাতীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মী পর্যন্ত বিমল আনন্দ পায়। টেলিভিশনে মুখোমুখি বসে দু’জন মানুষ ঝগড়া করছে এমন অনুষ্ঠান এই দেশের মানুষের কাছে খুবই প্রিয়। তথ্য উপাত্ত থেকে দেখা যায় বাংলাদেশের টেলিভিশনের টক শো জাতীয় অনুষ্ঠানের অন্যতম পথিকৃত ‘তৃতীয় মাত্রা’ অনুষ্ঠানটি দর্শক জরিপে দীর্ঘকাল ধরে সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের দুই বক্তার মাঝে উপস্থাপক বসে থাকেন আর তারা দু’জন যতোটা সম্ভব বাকযুদ্ধ করেন, অবস্থা অনেকসময় এমনও হয় যে মাঝে উপস্থাপক না থাকলে তারা হয়তো হাতাহাতি করতেন।

স্বাধীনতাযুদ্ধের কৃতিত্ব জনগণকে ফিরিয়ে দিলেই দেশটা সভ্য হতে শুরু করবে
স্বাধীনতাযুদ্ধের কৃতিত্ব জনগণকে ফিরিয়ে দিলেই দেশটা সভ্য হতে শুরু করবে

ঝগড়াঝাটি ও কলহ একটি দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পাওয়াটা অসভ্যতা নয় কি? লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশে যেভাবে দেশের শীর্ষ রাজনীতিকগণ খায়েশ, খামোশ, দেখে নেব জাতীয় শব্দ ব্যবহার করেন এবং উপস্থিত সুধীজন হাততালি দেন তাতে বুঝতে বাকি থাকে না মনন ও মস্তিষ্কে আমরা কি ধারণ করছি।

এই মুহুর্তে একটি সর্বোচ্চ প্রচারিত দৈনিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে জহির রায়হানের শহীদ হওয়া নিয়ে একজন সাংবাদিকের মৌলিক গবেষণা নিজেদের নামে চালানোর। শিক্ষিত মানুষের মধ্যে এই ধরনের অসভ্যতা আশা করা যায় কি? সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেকার দলাদলির কদর্য রূপ বাংলাদেশের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের সিবিএ সংগঠনের চেয়েও মারাত্মক। শ্রমিক সংগঠনের নামে কতিপয়ের লুটপাট ও অপরাধীদের অভয়রান্য তৈরির যে সংস্কৃতি তাকে অসভ্যতা বললে কম বলা হবে।

বাক স্বাধীনতার নামে অন্যের ধর্মকে আক্রমণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখা প্রকাশ করাকে সভ্যতা বলা যাবে কি? মধ্যযুগে একে অন্যের ধর্মকে আক্রমণ করার ঘটনাগুলো খুব বেশি দেখা যেতো। তারপর অনেক যুদ্ধ বিগ্রহের মধ্য দিয়ে মানুষ তথাকথিত সভ্যতা অর্জনের দাবী জানাচ্ছে। মোটামুটিভাবে সবাই মিলে সভ্যতার কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করে নিয়েছে। কিছু আন্তর্জাতিক সনদ তৈরি হয়েছে। সেগুলোকে সভ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে। যেমন, মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করা যায় যে, বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে প্রথম সারির দেশ হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশ আইন প্রণয়নে খুবই অগ্রগামী দেশ। কিন্তু আইনের বাস্তবায়নে নয়। আইনকে আইনের পথে চলতে না দেওয়াটাও কি অসভ্যতা নয়?

সভ্য সমাজে কিছু প্রতিষ্ঠান থাকে যারা মন্দের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সমাজে সত্যকে সমুন্নত রাখে। আমাদের দেশে এমন প্রতিষ্ঠান নব্বইয়ের দশকের আগে থাকলেও এখন আর আছে কিনা সেটা বড় ধরনের প্রশ্নসাপেক্ষ ও বিতর্কের বিষয়। ফলে বাংলাদেশের সভ্যতা যে ইতোমধ্যেই হুমকির সম্মুখীন সেটা বলাই বাহুল্য। এমন একটি দেশে সরকারি কর্মকর্তারা ঘুষ খাবেন, ছাত্রনেতারা টেন্ডারবাজি করবেন, এলাকার সরকার দলীয় নেতারা সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল করবেন এবং অন্যরা এসব স্বাভাবিক বলে মনে করবেন। ইতোমধ্যে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সত্য-মিথ্যার বাক্সে পরিণত হয়েছে। মিথ্যা বলতে বলতে একসময় মিথ্যাকেই মানুষ সত্য বলে ধরে নেয় যদি তাহলে অসভ্যতার ষোলকলা পূর্ণ হয় আর কি।

এদিকে বাংলাদেশের ৯৯.৯ ভাগ অপরাধের জন্য দায়ী আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-র রাজনৈতিক চর্চা। ১৯৯১ সাল থেকে এই দু’টি দল পালাক্রমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ফলে দেশের অপরাধের দায়ভারও যে তাদের সে নিয়ে বিতর্ক করার কোন সুযোগ নেই। কারণ দেশের সব কয়টা গ্রামে, ইউনিয়নে, উপজেলায়, জেলায় এমনকি বিভাগীয় শহরে সকল অপরাধী ভাগাভাগি করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-র নেতাদের আশ্রয়ে থাকে। আবার বাংলাদেশে এমন একটি উপজেলা পাওয়া যাবে না যেই উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-র প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে আত্মীয়তা নেই। হয় তারা রক্তের সম্পর্কের ভাই। কিংবা চাচা ভাতিজা। মামা ভাগ্নে। বাবা ছেলে। বাবা মেয়ে। কিংবা বিবাহসূত্রে স্বামী স্ত্রী। কিংবা বেয়াই। বা অন্য কোন আত্মীয়। ঘুরেফিরে কিছু পরিবার জাতীয় পর্যায় থেকে একদম গ্রাম পর্যন্ত রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। যাদের দলীয় পরিচয় আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি। আর সামাজিকভাবে তারা আত্মীয় স্বজন।

ছোট বেলায় স্কুলের শিক্ষকদের দেখতাম বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নিতেন। রাস্তাঘাটে অসদাচরণ করতে দেখলে হয় সেখানেই বকে দিতেন কিংবা বাসায় গিয়ে অভিভাবকদের জানাতেন। আর অভিভাবকরা শিক্ষককে অনুরোধ করতেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। শিক্ষকদের সেই মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়া দরকার। আমাদের এখন এমন মাস্টারসাব দরকার যারা এলাকার মন্ত্রী এমপিদেরও ধমক দেওয়ার নৈতিক সাহস রাখেন। বাস্তবতা হলো সমাজটা মুরব্বিবিহীন হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে রাজনীতি বটবৃক্ষের মতো সামাজিক বেয়াদপদের ছায়া দিয়ে যাচ্ছে।একটা সময় ছিল গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতেন। এখন তারা নিস্ক্রিয়। তাদের জায়গা দখল করে নিয়েছে রাজনৈতিক দলের গুন্ডা পান্ডারা। এরা কেউ চেয়ারম্যান, কেউ সদস্য, কেউ সংসদ সদস্য, কেউ বা দলের উপজেলা সভাপতি, মেয়র, সাধারণ সম্পাদক কিংবা অন্য কোন পদবী ধারণ করে দৈত্যের ভূমিকায় অবর্তীন হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হতে হতে হারিয়ে যেতে বসেছে।

অথচ সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগেই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। আজ স্বাধীনতার ৪৫ বছর পূর্তিতে আসুন আমরা আমাদের সমাজের মূল শক্তিতে ফিরে যাই। সাধারণ মানুষকে তাদের সম্মান ফিরিয়ে দেই। সকল কর্মকান্ডে তাদেরকে গুরুত্ব দেই। আমরা কথায় কথায় বাঙালি সংস্কৃতির কথা বলি অথচ গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত আমাদের আবহমান বাংলার সংস্কৃতি বড়দের সম্মান করা ও ছোটদের স্নেহ করার বিষয়টি অনুপস্থিত। আসুন, আমরা পরিবার ও সমাজের মুরব্বীদের আবারও তাদের স্ব-স্থান ফিরিয়ে দেই। আমরা আমাদের পুরোনো সত্যবাদী সমাজের দিকে ফিরে আসি। মিথ্যাকে বর্জন করি। শুধু খাদ্য নয় সমাজকেও ভেজালমুক্ত করার দিকে অগ্রসর হই। এলক্ষ্যে সবার আগে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসকে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত করি। জনগণকে ফিরিয়ে দেই তাদের প্রকৃত সম্মান। জয় বাংলা হোক আমাদের স্বাধীনতার প্রেরণা। চলুন মূলে ফিরি। স্বাধীনতার প্রশ্নে মৌলবাদী হই।

LEAVE A REPLY