সুফিবাদি কবিদের কথাঃ গালিব ভালোবাসে সুন্দর ‍মুখ

0
395
সুফিবাদি কবিদের কথাঃ গালিব ভালোবাসে সুন্দর ‍মুখ
সুফিবাদি কবিদের কথাঃ গালিব ভালোবাসে সুন্দর ‍মুখ

সুফিবাদি কবিদের কথাঃ গালিব ভালোবাসে সুন্দর ‍মুখ
মনিজা রহমান
সুফিবাদের মুল শর্ত সৃষ্টি প্রেম এবং বন্দনা।সে কারনে সুফিবাদের অন্যতম শর্ত রবুবিয়াতের ধর্ম হল সৃষ্টিকে ভালোবাসা, সৃষ্টির বন্দনা করা এবং খোদার বন্দনা করা। আর সৃষ্টিকে ভালোবাসা মানেই তার শ্রষ্ঠাকে ভালোবাসা। সৃষ্টির এই ভালোবাসার নির্যাস এবং পালনবাদ নিয়ে পৃথিবীর অনেক কবি সৃষ্টি প্রেমে দেওয়ানা হয়েছিলেন। মির্জা গালিব ছিলেন তাদের অন্যতম একজন। মির্জা গালিব নিজের সম্পর্কে বলেন “আমার হৃদয়ের আগুন থেকেই আলো দিচ্ছে আমার কবিতা, আমি যা লিখছি তাতে একটি আঙ্গুল দেয়ার সাধ্য নেই কারো৷” ১৭৯৭ সালে আগ্রায় জন্ম গ্রহনকারী এই সুফিবাদি কবি জীবনের নানা প্রান্তে বৈচিত্রপূর্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ১৮৫৪ সালে তিনি মোগল শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের ‍উস্তাদ হিশেবে মর্যাদা লাভ করেছিলেন। কোন প্রশংসা বা ক্ষমতার জন্যে তিনি কখনো লালায়িত ছিলেন না। তাঁর কথায় “আমি প্রশংসার কাঙ্গাল নই পুরস্কারের জন্যে লালায়িত নই আমার কবিতার যদি কোন অর্থও না থাকে তা নিয়েও আমার তোয়াক্কা নেই।’’। ’সুফিবাদি কবিদের কথা’ নিয়ে ধারাবাহিক লেখা প্রকাশিত হবে শিল্প-সাহিত্যের পত্রিকা অযান্ত্রিকে। এ পর্বে প্রকাশিত হল ’গালিব ভালোবাসে সুন্দর মুখ’। ধারাবাহিকভাবে লিখছেন লেখক এবং সাংবাদিক মনিজা রহমান।সঙ্গেই থাকুন এবং আপনারা আপনাদের মতামত আমাদের সাথে শেয়ার করুন । সম্পাদক

সুফিবাদি কবিদের কথাঃ গালিব ভালোবাসে সুন্দর ‍মুখ
সুফিবাদি কবিদের কথাঃ গালিব ভালোবাসে সুন্দর ‍মুখ

২০১৫ সালে মুক্তধারা আয়োজিত আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলা কভার করতে এসেছিলেন আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার। শেষ দিন উনি বক্তব্য রাখতে গিয়ে মির্জা গালিবের একটা শের আবৃত্তি করে শোনান। লাইনগুলি এইরকম- গালিব সুন্দর মুখ ভালোবাসে গালিব সুন্দর মুখ ভালোবাসে গালিব ভালোবাসে সুন্দর মুখ কিন্তু- গালিব কি নিজের চেহারা আয়নায় দেখে। কদিন ধরে গালিবের এই শের আমার মাথার মধ্যে ঘুরছে। ঘরে-বাইরে প্রতিক্ষণ, প্রতি নিয়ত অন্যের সমালোচনায় মুখর, অন্যের কাছ থেকে আকাশসম প্রত্যাশা করা আমরা বাংগালিরা কি, আসলেই নিজের চেহারা আয়নায় দেখি? দেখিনা। কেন দেখব? আমরা ধরেই নেই যে সারা দুনিয়ার মানুষ অচেতন, আমিই কেবল সচেতন। বড় কবিরা কতখানি অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হন, ত্রিকালীদর্শী হন এই শের তার আরেকটি প্রমাণ। গালিব মূলত উর্দু ভাষার কবি হলেও পুরো ভারতবর্ষে তার মতো পঠিত ও উদ্বৃত করা হয় না কোন কবির লেখা। মাইক্রোসফটের মতো বিশ্বখ্যাত কোম্পানীর সিইও একজন ভারতীয়র সেদিন এক উদ্দীপনামূলক বক্তৃতা শুনলাম। বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি মির্জা গালিবের শের আবৃত্তি করলেন। সমস্ত দর্শক হাততালি দিয়ে উঠল। মির্জা গালিবের কবিতা, তাঁর শের, গজল – সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। অন্যান্য অনেক কবির মতো জীবিত অবস্থায় তিনি তেমন কোন স্বীকৃতি পাননি। বরং অভাব-অনটন আর অপমানের কাঁটায় বিদ্ধ হয়ে কাটাতে হয়েছে জীবন! কারন কি শুনবেন? তিনি ছিলেন গ্রীক দেবতা নার্সিসাসের মতো। আত্নবাদ, আত্নপ্রেম আর আত্নশ্লাঘায় মত্ত। নার্সিসিস্ট, দাম্ভিক, কিন্তু সহজাত প্রতিভা ও অসাধারণ মেধার অধিকারী মির্জা গালিবের সঙ্গে তুলনা করা যায় বাংলা সাহিত্যের আরেকজন কবিকে। তিনি হলেন- মাইকেল মধুসুধন দত্ত। দুজনেই ছিলেন মারাত্নক অসংযমী, হেঁয়ালি, বেহিসাবি, বেপরোয়া। নিজেদের প্রতিভা নিয়ে দুজনেরই ছিল মারাত্নক দম্ভ, কিন্তু জীবন ও জীবিকা উপার্জন নিয়ে তাদের বিশেষ কোন মাথাব্যথা ছিল না। ফলে দুজনকে শেষ জীবনে চরম দু:খ ও দারিদ্রের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হয়। কিন্তু সৃষ্টিশীলতা ও প্রতিভার কষ্টিপাথরে তারা কালোত্তীর্ণ শ্রেষ্ঠ শব্দ যাদুকর। মির্জা গালিবের জন্ম আগ্রায়, ১৭৯৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ খান তার আসল নাম। ‘গালিব’ হল ছদ্মনাম। এর আগে তিনি ‘আসাদ’ ছদ্মনাম নিয়ে লিখতেন। আসাদ শব্দের অর্থ সিংহ আর গালিব এর অর্থ সর্বশ্রেষ্ঠ ও বিজেতা। নামের মতোই তিনি ছিলেন তেজী। জোর্তিবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র, অধিবিদ্যা, মেটাফিজিক্স বিষয়ে পড়াশুনা করলেও গালিবের বিশেষ ঝোঁক ছিল ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি। তিনি উর্দু ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি হলেও ফারসী ভাসাতেও তার দখল ছিল প্রচন্ড। ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক পরাধীনতার মধ্যে গালিবের জন্ম। তার বাবা মির্জা আবদুল্লাহ বেগ খান ও চাচা নাসিরুল্লাহ বেগ খান দুজনেই যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিক হিসেবে নিহত হন। গালিব তখন শিশু। ১৮১০ সালে তিনি ১৩ বছরের কম বয়সে বিবাহ করেন নওয়াব ইলাহী বখশ খানের কন্যা ওমরাও বেগমকে। বিবাহের পরে গালিব আগ্রা ছেড়ে দিল্লী চলে আসেন। বিবাহিত জীবনে গালিব সাত সন্তানের জনক হলেও একটি সন্তানও বাঁচেনি। শৈশবে পিতা ও পিতৃতূল্য চাচার মৃত্যু, তারপর সাত সন্তানের একজনকেও বাঁচাতে না পারা গালিবের মনে চিরস্থায়ী এক বিষাদের জন্ম দেয়। জীবনের প্রতি বৈরাগ্য এনে দেয়। তাঁর শেরে উঠে এসেছে সেই দু:খবোধ, অভাব ও অপ্রাপ্তির কথা- ‘এটাতো আমার মন, ইট পাথরতো নয়, বেদনায় ভরবে না কেন? আমি কাঁদবো হাজারবার, কেউ আমাকে উত্যক্ত করে কাঁদায় কেন? মাত্র নয় বছর বয়সে গালিব ফারসীতে কবিতা ও গজল লেখা শুরু করে। গালিবের লেখার অভ্যাস ছিল অদ্ভুত। তিনি মদ পান করতেন লেখার সময়। মদ হাতে, একটা সুতা নিয়ে তিনি খেলতেন। কবিতার একটা লাইন লেখার পরে সুতায় একটা গিট দিতে। যখন শুতে যেতেন, তখন সুতায় অনেকগুলি গিট থাকতো। সকালে গিট খুলতেন। গালিব নিজের কবিতা মুখস্ত বলতে পারতেন। তিনি কেবল কবি নন, ছিলেন দার্শনিকও। তার কোন রাজনৈতিক চেতনা ছিলনা। তাঁর কবিতায় ঈশ্বর প্রেম ও নারী প্রেমের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য পাওয়া যায়। এজন্য অনেকে তাঁর কবিতাকে উচুঁ দরের সুফিবাদী কবিতা বলেছেন। ব্যাক্তিজীবন ও কাব্যে রহস্যময়তা ও দুর্বোধ্যতা পছন্দ করতেন গালিব। এজন্য সমকালীন কাব্যবোদ্ধাদের দৃষ্টিতে তিনি মুশকিল পছন্দ, প্রলাপ বকিয়ে খেতাবধারী। উর্দু আর ফার্সি সাহিত্যে শুধু কবিতা, শের বা গজলে গালিবের ছিল তা নয়। গদ্য সাহিত্যে বিশেষত চিঠি লেখায় তিনি এক বিশেষ রীতির জন্ম দেন। তার রচিত ‘দাস্তাম্বু’ রোজনামচা বা দিনলিপি গদ্য সাহিত্যের এক অনবদ্য সৃষ্টি যা একই সঙ্গে ১৮৫৭ সালে সংঘটিত সিপাহী বিদ্রোহ ও ব্রিটিশ কর্তৃক নির্মমভাবে দমনের এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে আছে আজো। গালিব কেবল কবিতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন না, বিখ্যাত ছিলেন দাম্ভিকতা, আভিজাত্যবোধ, বেপরোয়া প্রথাবিরোধী জীবনযাপন এবং সুরা, সাকী আর জুয়ার প্রতি তীব্র আসক্তির জন্য। নিষিদ্ধ জুয়া খেলার জন্য ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক এবার কারাভোগও করেন তিনি। গালিব ছিলেন নারীসঙ্গ প্রিয়, বহুগামী, ভোগবাদী এবং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে তার বিশেষ নিষ্ঠা ছিল না। এজন্য অবশ্য তার কোন রাখডাকও ছিল না। ‘খাও, পান করো আর সুখী থাকো’ কিংবা ‘বুদ্ধিমান মাছি চিনির ওপর বসে, মধুর ওপর নয়’ গালিবের এসব উক্তি একসময় প্রবাদে পরিণত হয়। গালিবের পক্ষেই বলা সম্ভব যে- ‘প্রতি বছরের শুরুতে এক নতুন রমণী নাও, কারণ- গত বছরের হিসাব অর্থহীন বিষয়।’ শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর, যিনি নিজেও একজন উচুঁমানের শায়ের ছিলেন, তিনি মির্জা গালিবকে সভাকবির মর্যাদা দিয়েছিলেন। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর গালিবকে দেশের “শ্রেষ্ঠ কবির’ উপাধিতে ভুষিত করেন ১৮৫০ সালে। কেবল খেতাবই নয়। তিনি মির্জা গালিবকে নিজের মুরশিদ বলেও মেনে নেন। মুরশিদ মানে দর্শনগুরু, ওস্তাদ বা আধ্যাত্নিক পথপ্রদর্শক। আশ্চর্য্য খেয়ালী এই কবি কখনও অর্থের জন্য কাজ করেননি। তার জীবিকা নির্বাহ হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, ধার কর্য করে কিংবা কোন বন্ধুর দানে। কিন্তু ১৮৭৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে। মোগল বাদশার সময় তিনি যে ভাতা পেতেন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সেটা বাতিল করেন। ফলে মির্জা গালিব চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। চরম দারিদ্র ও দুরবস্থার মধ্যে ১৮৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গালিব ইন্তেকাল করেন। তাকে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারের কাছে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। জীবিত অবস্থায় প্রতিভার মূল্য না পেলেও মির্জা গালিব উর্দু ও ফার্সি ভাষার কবিদের মধ্যে সবচেয়ে পঠিত, আলোচিত ও উদ্ধৃত কবি। বিষাদ, প্রেমের হাহাকার আর অতৃপ্তির প্রকাশে অতুলনীয় কবি শুধু উপমহাদেশের নয়, সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে এক পরিচিত নাম।

monija
monija

LEAVE A REPLY