বুদ্ধদেব বসুর ১২৪তম জন্মদিন

0
51
buddhadeb_bose
buddhadeb_bose

বুদ্ধদেব বসুর ১২৪তম জন্মদিন
বুদ্ধদেব বসু একাধারে কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, কবি, নাট্যকার, সম্পাদক এবং অনুবাদক। কল্লোল যুগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশাতেই রবীন্দ্র বলয় থেকে বেড় হয়ে নতুন ধারায় সাহিত্য সৃষ্টিতে যে প্রতিভাবান লেখকরা দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসু ছিলেন তাদের অন্যতম। কবিতা পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি বাংলা কবিতা নির্মাণে ছিলেন এক অনন্য মাইল ফোলক। তাকে বলা যায় আধুনিক কবিকুলের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। সুকুমার সেনের ভাষায় ‘তাঁর লক্ষ্য ছিল আধুনিক কবিতার স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং ‘আধুনিক’ কবিতা লেখকদের পক্ষ সমর্থন করা।শিল্প-সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন সাহিত্যের শিক্ষক, মেধাবী ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স এবং মার্স্টার্স প্রথম শ্রেনীতে প্রথম। অনার্স পরীক্ষার তিনি যে নাম্বার পেয়েছিলেন তা ছিল একটি রেকর্ড এবং যে রেকর্ড এখনো অব্যাহত রয়েছে। ’বন্দির বন্দনা’,’ কঙ্কাবতী’, ’শীতের প্রার্থনা, বসন্তের উত্তর’, ’তিথিডোর’,’নির্জন স্বাক্ষর’, ’রাত ভর বৃষ্টি ,কালেরপুতুল ,সাহিত্যচর্চা , রবীন্দ্রনাথ: কথাসাহিত্য , স্বদেশ ও সংস্কৃতি , সঙ্গ নিঃসঙ্গতা ও রবীন্দ্রনাথ , প্রবন্ধ-সংকলন ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। আজ বুদ্ধদেব বসুর ১২৪তম জন্মদিন। অযান্ত্রিকের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি রইলো জন্মদিনের শুভেচ্ছা। বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে লিখেছেন লেখক মনিজা রহমান। সম্পাদক]

buddhadeb_bose
buddhadeb_bose

মনিজা রহমান

‘আমরা যখন সাহিত্য পড়ি তখন আমাদের দৈনন্দিন অস্তিত্বের তথ্যগুলোকেই চিনতে পারি সেখানে কিন্তু ঠিক সেগুলিকেও নয়। সেইসব তথ্য, যা বাস্তব জীবনে অস্পষ্ট, এলোমেলো, যোগসূত্রহীন, কিংবা অভ্যাসে পরিজীর্ণ, সেগুলোকে যেখানে সুসংবদ্ধরূপে দেখতে পাই, স্বচ্ছ এবং সম্পূর্ণ করে উপলব্ধি করি, তাকেই আমরা বলি আর্ট, বলি শিল্পকর্ম।’ – বুদ্ধদেব বসু।

এত চমৎকার করে শিল্প সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন জানাতে বুদ্ধদেব বসুর মতো আর কেই বা পারেন! আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অভিভাবক বলা হয় যে মানুষটিকে, তিনি হলেন- বুদ্ধদেব বসু।প্রারম্ভিক যৌবন থেকে অনেকটা সজ্ঞানেই তিনি এই দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন।

একটা প্রশ্ন অনেকের মনেই আসে। বুদ্ধদেব বসুর প্রকৃত পরিচয় কি ? তিনি কবিতা লিখেছেন, গল্প-উপন্যাস লিখেছেন, নাটক-কাব্যনাটক লিখেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন অজস্র, পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন, গ্রন্থপ্রকাশক হয়েছেন, অনুবাদ করেছেন বহু বিদেশী রচনা। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা রবীন্দ্রনাথকেও ছাড়িয়ে গেছে।

তবে তাঁকে যে-কোন একটি পরিচয় বেছে নিতে বলা হত তাহলে তিনি নি:সন্দেহে ‘কবি’ অভিধাটিকেই বেছে নিতেন। তিনি যে মনে মনে নিজেকে কবি ভাবতেন, তার প্রমাণ তিনি নিজে ছিলেন নির্জনতাপ্রিয়। স্নেহের পাত্র নরেশ গুহকে লেখা একটি চিঠিতে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন- ‘আর একরকম নি:সঙ্গতা আছে-যেটা কবির নি:সঙ্গতা। যদি মনেপ্রাণে সাহিত্য রচনাতেই লিপ্ত থাকো, তাহলে পরিণত বয়সে তার স্বাদ পাবে। সেটাও দু:খের, সে দু:খ বেঁচে থাকার গভীরতা বাড়ায়।’
এই যে নির্জনতাপ্রিয় কবিপ্রাণ, তাকে কেন আজীবন ভিড়ের মধ্যে কাটাতে হয়েছে সংগঠকের ভূমিকায়? কিংবা কবি-র চেয়ে তাঁর মূল্যায়ক-সমালোচক পরিচয় কেন বড় হয়ে উঠল? কবিরা তো লেখেন কম, ভাবেন বেশী বা পাঠ করেন বেশী। অথচ বুদ্ধদেব বসুকে ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত, এই কুড়ি বছরের লিখতে হয়েছে অন্তত পঁচাশিটি বই? পরবর্তী সময়ে ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ছেষট্টিটি বই।

আসলে এমন কাজের গুরুভার নিজের মাথায় তুলে নিয়েছিলেন, যার জন্য লেখক-জীবনের শুরু থেকেই নিজে যেমন বিতর্কিত হয়েছেন, তেমনভাবে যোগ দিয়েছে অনেক বিতর্কে। ত্রিশের দশকে রবীন্দ্র বলয়ের বাইরে গিয়ে যারা লেখালেখি শুরু করেন, তিনি তাদের অন্যতম। যদিও স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুদ্ধদেব বসুর প্রতিভা নিয়ে অত্যন্ত প্রশংসামুখর ছিলেন।

বুদ্ধদেব বসুর জন্ম কুমিল্লায়। জন্মতারিখ ১৯০৮ সালের ৩০ নবেম্বর। মাতা বিনয়কুমারীর তিনিই প্রথম ও শেষ সন্তান। কারণ তাঁর জন্মমুহূর্তে ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন মাতা। এরপর পুলিশ অফিসার পিতা চিন্তাহরণ সিংহ স্ত্রীর শোকে সন্নাসব্রত গ্রহণ করে ঘর থেকে বের হয়ে যান।

পিতামহ ও পিতামহীর কাছে শৈশবে লালিত-পালিত বুদ্ধদেব বসু ছিলেন অসম্ভব মেধাবী একজন মানুষ। পিতামহের কর্মক্ষেত্র নোয়াখালিতে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ার পরে ঢাকায় এসে কিশোর বুদ্ধদেব বসু ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। অধিকার করেন প্রথম বিভাগে পঞ্চম স্থান। ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েটে মেধা তালিকায় প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান পান আর্টস বিভাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে বিএ অনার্স প্রথম শ্রেণীতে প্রথম, এবং এমএ পরীক্ষাতেও প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান পান।

পরবর্তী সময়ে স্ত্রী লেখক প্রতিভা বসুকে নিয়ে কলকাতায় স্থায়ী হলেও বুদ্ধদেব বসুর লেখায় ঘুরে ফিরে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা শহর ও পদ্মা পারের গল্প। ১৯৭৪ সালে ১৪ মার্চ কলকাতায় মৃত্যু হয় তাঁর।

কল্লোল যুগের প্রতিনিধি বুদ্ধদেব বসু সবর্দা সাহিত্যের শিল্পমূল্যের ব্যাপারে ছিলেন আপসহীন। অনেকে বলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশকে আবিস্কার এবং প্রতিষ্ঠিত করার পিছনে সবচেয়ে বেশী অবদান বুদ্ধদেব বসু। আসলে বুদ্ধদেব একজন লেখক ছিলেন না, তিনি সবাইকে নিয়ে পথ চলতে ভালোবাসতেন। একজন লেখক সংগঠকের বৈশিষ্ট্য বুঝি এমনই হওয়া উচিত।

 

LEAVE A REPLY