জীবনটা আসলেই খারাপ নয়

0
300
akash_monjur
akash_monjur

জীবনটা আসলেই খারাপ নয়
আজ কয়েক সপ্তাহ ধরে সৌরভের পকেটের অবস্থাটা খুব একটা ভালো নয় । খুব একটা ভালো নয় বললে ভুল হবে বলা যায় ফাঁকা-ই । যে দুটো টিউশনি করায় তা দিয়ে তার নিজের মোটামোটি চল্লেও গতমাসের শেষে হঠাৎ ছাত্রী তার পরিবারের সাথে দেশের বাইরে চলে যায় বেতন বকেয়া রেখেই আর আরেক ছাত্রের পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে মুখ তুলে বেতন টাও চাইতে পারছেনা মানবতার কারণে ।

এদিকে প্রেয়সী তার বড্ড রাগ করে আছে । দু’সপ্তাহ ধরে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যেতে বলছে, কিন্তু সৌরভের গায়েই লাগছেনা! একেকদিন তার একেক অযুহাত। মাথা ব্যাথা থেকে শুরু করে দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যাথা। এই সমস্যা সেই সমস্যা দিয়ে প্রতিদিনের অযুহাত সাজাচ্ছে।

আজ তো প্রেয়সী সর্মী ফোনে তাকে লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছে যে না আসলে কাট্টি । কিন্তু সৌরভ জানে প্রেয়সী কে নিয়ে ঘুরতে গিয়ে যদি ক্যানভাসে মুরগির ঠ্যাং আর ডানা ভাজা যদি রাখতে না পারে তাহলে প্রেমিক হিসেবে তো লজ্জার বিষয় যেখানে সে বন্ধুদের কাছে শুনে তাদের প্রেয়সীদের নিয়ে রেস্টুরেন্ট-এ হাজার টাকার খানাপিনার দামি দামি কাহিনী! তাই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে সে পরতে চায়না। পকেটে থাকা ১০-২০ টাকার নোটের দিকে তাকিয়ে উদাস হয়ে আবার নানা অযুহাতে ফোনটা রেখে দিলো আর বুঝতে পারল যে প্রেয়সী এখন তাকে কাছে পেলে ধোলাই দিত!

ফোনটা রেখেই সে আধ ময়লা শার্টটা হাতে নিয়ে বেড়িয়ে পরলো। গন্তব্য ধানমন্ডি লেকের অস্বচ্ছ ময়লা পানির পাশের গাছের ছায়ার নিচের ওই বেঞ্চ টি! মনটা উদাসীন অথবা খারাপ থাকলে মাঝে মাঝেই সেখানে যায় সৌরভ।

সেখানে গিয়ে কিছুক্ষণ চোখা ইট-পাথরের ডিগবাজী খেলিয়ে মুখ নিচু করে বসে আছে। হঠাৎ-ই দেখতে পেল সামনে কোনো রমণীর নমনীয় পা যুগল। মুখটা উপরের দিকে নিতেই খেলো এক রাম চড়। দিক-বেদিক শুণ্য অবস্থায় তাকিয়ে দেখে সর্মী। এরকম নাজুক হাতে আড়াই-তিন কেজি ওজনের এমন একটি যে চড় খাবে তা আগে বুঝতেই পারেনি সে। মেয়েটা চড় দিতে অনেক শক্তি খরচ করেছে ভাবতেই হেসে উঠে। তার ক্যাবলামি হাসি দেখে সর্মী আরও ফোঁপাতে থাকে রাগে। তারপর শুরু হলো ঝাড়ি। তুই থেকে শুরু হয়ে তুমি দিয়ে ঘুরে ঈষৎ অভদ্র হয়ে রাগান্বিত ভালোবাসার সে এক মধুর বহিঃপ্রকাশ। ‘তুমি নিজেকে কি মনে কর? নিজেকে খুব চালাক ভাবো? তুই একটা আস্তা হারামি? মন চাচ্ছে তোকে এখন জুতার হিল দিয়ে পিটাই! নখের খামচি দিয়ে মুখে আসামির মতো দাগ ফালায় দেই! ছাগল পোলা! নিজের সুখের কথা আমাকে শুনাস, সুখের সময় আমাকে পাশে রাখতে চাস, সুখ শেয়ার করিস তাইলে দুখের সময় সব দুঃখ একা নিয়ে রাখিস কেন? মনটা চাচ্ছে তোকে গলা টিপে মেরে ফেলি তারপর আমি এই ময়লা পানিতে ঝাঁপ দেই!”

সৌরভ কিছু বলেনা। শুধু দেখে বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের হালকা সোনালী আভা গাছের পাতার বাঁধা পেরিয়ে প্রেয়সীর রাগে লাল চেহারা তার সৌন্দর্যকে পরম মাদকতায় আরও হাজার গুণ বৃদ্ধি করে দিয়েছে। এটা সাক্ষাৎ প্রকৃতি মাতার এক অপরূপ দান। আর প্রেয়সীর সৌন্দর্যও যেনো রাগের সাথে সমানুপাতিক হারেই বেড়ে চলছে। সৌরভের ইচ্ছে করছে সর্মীকে একটু ভালোবেসে দিতে, আদর করে দিতে। কিন্তু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে হাবার মতো হাসছে।

হাসি দেখে সর্মী যেনো আরও তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। সর্মী বলে উঠল, ”হাসবি না! তোকে হাসলে মোটেই সুন্দর লাগেনা। গাধার মতো দেখা যায়। এতোদিন বলি নাই কিন্তু আজ বললাম।” সৌরভ নির্বিকার আর সর্মী বলেই যাচ্ছে ।

বেঞ্চে পাশাপাশি বসে কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপ। সৌরভ এখনও মুগ্ধ হয়ে প্রেয়সীর দিকে চেয়ে আছে । সে শুধু তার এই পাগলীটাকেই ভালোবাসেনা বরং পাগলীটার রাগ-হাসি কেও ভালোবাসে। শুধু পাগলীটার চোখের পানি সহ্য করতে পারেনা।

হঠাৎ প্রেয়সী আবার বলে উঠে, ”রামছাগল! এমনে বইসা আছিস কেন? আমার ক্ষুধা লাগছে। বাদাম কিন্না আন।”

সৌরভ হন্তদন্ত হয়ে ২০ টাকার বাদাম কিনে আনল। এনে প্রেয়সীকে খাবার জন্য বলতেই আবার সে রেগে-মেগে আগুন! ”গাধা পোলা! আমারে রাগায়! এতক্ষণ ধরে চিল্লা-চিল্লি করায় এখন আবার খোসাওয়ালা বাদাম দেস! থাপড়ায়া গাল লাল কইরা দিমু। ও তোর তো আবার গালই কালা-ময়লা লালও হবে না! বাদামের খোসা ছাড়ায় দে। আমি এতো কষ্ট করতে পারব না। আমি সব খাব। একটা দানাও তুই মুখে দিবি না।”

সৌরভ বাদামের খোসা ছাড়িয়ে দিচ্ছে আর সর্মী তা পেটায় নমঃ করছে।

প্রেয়সীর রাগের সাথে ভালোবাসার যেই আভা ফুটে উঠেছে তার মুখে তা দেখে সৌরভের এই কথাটাই মনে পড়ছে- “জীবনে আর আছে কী! অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ! আর ভবিষ্যতটাই কে কবে আগে দেখেছে! সারাজীবন যদি এভাবেই থাকা যেত! আহা! জীবনটা আসলেই খারাপ নয়…”

SHARE
পূর্ববর্তী আর্টিকেলদাস
পরবর্তী আর্টিকেলটার্নিং পয়েন্ট

LEAVE A REPLY