টার্নিং পয়েন্ট

0
453
turning_point
turning_point

টার্নিং পয়েন্ট
মনিজা রহমান
একজন শৌখিন ঘটক হিসেবে আমার ব্যর্থতা শতভাগেরও বেশী। আমি আজ পর্যন্ত যতগুলি ঘটকালি করেছি তার কোনটাই শেষ পর্যন্ত বিয়ে হয়নি। তবু প্রতিবার ভাবি এবার কিছু একটা হবে। আর সেটাই হবে আমার ঘটক ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। কিন্তু কাঙ্খিত সেই ঘটনা যে আর ঘটেই না !

অনেকদিন আগে ফেসবুকে এমন একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। ঘটকালি ব্যাপারটা ছিল আসলে রূপক। পরিকল্পনাহীন,ম্যাড়মেড়ে জীবনের কথা ভেবেই হয়ত এমনটা লিখেছিলাম। জীবন সাগরে একটা কাঙ্খিত টার্নিং পয়েন্টের জন্য কতকালের অপেক্ষা যে আমার।

বিয়ের মতো প্রেমের ঘটকালিতেও আমি ব্যর্থ একজন মানুষ। দুটি ঘটনা বলি। প্রমাণ মিলবে।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। একদিন বাসায় কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুলে দেখি অপরিচিত এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই সে লম্বা সালাম দিল। ওই বয়সে এমন সালাম পেলে যে কারো বিগলিত হবার কথা। তারপর সে ইনিয়ে বিনিয়ে যা বলল তার সারমর্ম হল সে আমার বান্ধবী লিমার প্রণয়প্রার্থী।

এতদিন পরে তার নাম মনে নাই। তবে এটা মনে আছে লিমার ছোট দুই বোন বাবু আর সোমা লোকটার নাম দিয়েছিল ‘ভ্যাবল দাস’। লোকটার চেহারা, পোষাক, আচরণের সঙ্গে নামটা ছিল খুব মানানসই। এই ধরনের কাউকে লিমার হ্যা বলার কোন কারণ নাই। তবু আমার কেন জানি খুব মায়া হল লোকটার জন্য। হয়ত লম্বা সালাম, অতি বিনয়, আমার প্রতি অগাধ আস্থা সব মিলে কেমন যেন দরদ তৈরী হয়েছিল ওই ভ্যাবল দাসের জন্য।

আমার দুতিয়ালিতে কাজ হয় না, উল্টো আমি যাতে বাধা দেই তাতেই যেন সোনা ফলে। সেই কথাই বলছি…

দ্বিতীয় ঘটনা কলেজে ওঠার পরে। তখন আমার প্রিয় বান্ধবী হল মৌসুমী। আমাদের দুজনকে সবাই বলতো – ‘এক বৃন্তে দুটি কুসুম’। সেই মৌসুমী একদিন এসে জানালো, আমেরিকা ফেরত ওর খালাতো ভাই ওকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে।

আমি জানতে চাইলাম, চেহারা কেমন ? কারণ ওই বয়সে বাহ্যিক সৌন্দর্য্যকেই মনে হত মানুষকে নির্ণয়ের প্রধান মাপকাঠি।

মৌসুমী জানাল, খুব ভালো। লম্বা। ফর্সা।

আচ্ছা ঠিক আছে। দেখাস তাহলে…

কলেজ ছুটির পরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। মৌসুমীকে জিজ্ঞাসা করলাম, কই তোর খালাতো ভাই ?

মৌসুমী দূরে কাউকে দেখিয়ে বলে,ওই যে… দেখতে পাচ্ছিস না ! আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে ! দেখছিস না ! সত্যি ‍!

আমি বলি, কই আমি তো কাউকেই দেখছি না।

পরে রাস্তা পার হয়ে যার সঙ্গে ও যার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল, সে লম্বাও না। ফর্সাও না। উচ্চতায় আমার চেয়ে সামান্য বেশী। গায়ের রঙ কালো আর শ্যামলার মাঝামাঝি। যে কারণে অনেক কাছে দাঁড়িয়ে থেকেও ওর খালাতো ভাইকে চোখে পড়েনি। বুঝলাম, আমার বান্ধবী প্রেমে অন্ধ !

এভাবে যে সম্পর্কের ব্যাপারে আমি তেমন উৎসাহ দেখাই না, সেখানেই দেখি প্রেম হয়, তারপর বিয়ে হয়..অত:পর সুখে শান্তিতে বাস করতে থাকে সারাজীবন…

আর আমি….? নন্টে-ফন্টে কার্টুনে, হোস্টেল সুপাররিন্ডেন্ট হাতিনাথ পাতি যেভাবে শ্রীমান কেল্টুকে বলতেন, সেভাবে নিজেই নিজেকে বলে উঠি- ‘ব্যাটা ! হতচ্ছাড়া মর্কট !’

আসলে আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। সারাজীবন এত কোর্স করলাম, এত কিছু শেখার চেষ্টা করলাম, এতো আশায় বুকলাম, দিন গুনলাম, মনে মনে কল্পনা ফানুষ ওড়ালাম…কিন্তু কাঙ্খিত টার্নিং পয়েন্ট এল না জীবনে !

ঢাকায় ১৫ বছরের রিপোর্টিং ক্যারিয়ারের যতি টেনে যখন নিউইয়র্কে আসার পরিকল্পনা নিচ্ছিলাম, তখন ভেবেছিলাম এটাই হয়ত আমার জীবনের কাঙ্খিত টার্নিং পয়েন্ট। কিন্তু জিরো ডিগ্রি তাপমাত্রায় জমে যেতে যেতে উপলব্ধি করলাম জীবনে পরিচয়বিহীন হবার কষ্ট কেমন ? ঢাকার জীবনকে মনে হতে লাগলো অতীতের গল্পগাথা।

তখন পরিচিত অনেকেই জিজ্ঞাসা করতো স্বপ্নের শহরে কেমন আছি আমি ?……..উত্তরে সুনীলের কবিতাটা মাথার মধ্যে কিলবিল করতো প্রচন্ড ভাবে…

আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি

তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ

এই কি মানুষজন্ম ?

নাকি শেষ পুরোহিত-কংকাল পাশা খেলা !

নিউইয়র্কে আসার পরে দীর্ঘদিন স্বপ্নে ও জাগরনে দেখতাম নিউ ইস্কাটনের রোডে আমার সাজানো সংসার। বছরের পর বছর ধরে কত কিছু কিনে যে ড্রইংরুমটা সাজিয়েছিলাম। দেয়ালে ঝোলানো পেইন্টিং, বাধানো নকশিকাথা, শোকেজে সাজানো শোপিস….আলমারির তাকে রাখা বইগুলি। আমিই তো গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ এভাবে ভাগে ভাগে রেখেছি।

মনে পড়তো বেডরুমটার কথা। যে রুমে আমি দিনের বেশীরভাগ সময় কাটাতাম। আমার খাট, আলমারি, ওয়ার্ডড্রোব, টিভি…সব সব খুব মিস করতাম।

বেডরুমের পাশের বারান্দা। তাতে ঝোলানো খাঁচায় তিনটা মুনিয়া পাখী। আমি ওদের নাম দিয়েছিলাম- টিটো, টুপুর, টাপুর….। ব্যালকনির সামনেই ছিল ল্যাম্পপোস্ট। ইলেকট্রিক তারের ওপর বসে থাকতো চড়ুই পাখী।

ক্রমে সব ভাবনাগুলি কেমন ঝাপসা হয়ে আসতে লাগলো। এক সময় মনে হতে লাগলো, কত জনম আগে যেন আমি সেখানে থাকতাম। আবার সেখানে ফিরে যেতে পাড়ি দিতে হবে আরো কয়েক জনম। হয়ত ফেরাও হবে না। কারণ আমরা ঢাকা ছাড়ার পরে ওই বাসাও ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

দুই জনমের মাঝখানে হারিয়ে যাবে কেউ কেউ। যেমন এক দুপুরে রাস্তা পার হতে গিয়ে হারিয়ে গেল সাবিহা। কোনদিন আর যে ফোন করে বলবে না.. ‘আপু আমাদের এই প্রোগামে কি আপনি আসছেন ? গুরুজি আজ নিজে থাকবেন….মিস করবেন না কিন্তু…।’ সাবিহা…যখন বেঁচে ছিলো, কোন মূল্যায়ন করতে পারিনি তাঁর। ওর সরলতার, আন্তরিকতার, ত্যাগের, গুনের…মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের….। সাবিহা তোমাকে সারাজীবন খুব মিস করবো।

মা, ছোট বোন…ফেলে আসা স্মৃতির শহরের প্রত্যেকটি চেনা মানুষকে খুব মিস করি। তাইতো বাংলাদেশ থেকে কেউ নিউইয়র্কে এলে ছুটে যাই দেখা করতে…বঙ্গোপসাগরের তীরের মিষ্টি শীতল হাওয়ার স্পর্শ পাই যেন !

দেশে থাকলে প্রত্যয়টা একটু বেশীই ছিল… টার্নিং পয়েন্টে একদিন না একদিন পৌছে যাব ঠিক। এখন সেই ভাবনাগুলি কেমন বিবর্ণ মনে হয়…আর শুধু কষ্টের ঢেউ উঠে হৃদয় জুড়ে।

হেলাল হাফিজের কবিতার মতো বলতে ইচ্ছা হয়

কষ্ট নেবে কষ্ট

হরেক রকম কষ্ট আছে

কষ্ট নেবে কষ্ট

লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচা হলুদ রঙের কষ্টunnamed

পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট

আলোর মাঝে কালোর কষ্ট

মাল্টি কালার কষ্ট আছে

কষ্ট নেবে কষ্ট

মাঝে মাঝে মনে হয় অচেনা শহরে ঝরা পাতা মাড়িয়ে আমি হেঁটে যাচ্ছি। পথ কখনও উচুঁ হয়ে যাচ্ছে। আবার কখনও ঢালু। আমি চলছি তো চলছিই। বার বার ভাবছি এরপরেই রয়েছে সেই টার্নিং পয়েন্ট। কিন্তু কই কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। না টার্নিং পয়েন্ট ! না মরূদ্যান ! কিংবা ধুধু তেপান্তরের মাঠ….এমনকি মরীচিকায়ও নয়। নচিকেতার সেই গানের মতো – অন্তবিহীন পথে চলাই জীবন।

নাকি জীবনটা শ্রীকান্ত আচার্যের সেই গানের মতো….

পথে পথে চলতে চলতে

হঠাৎ একদিন থেমে যাব

মেঘলা রাতে লুকিয়ে থেকে

রূপোর আলোয় জ্যোস্না পাব

……

অশ্রুভেজা কোন দিনে

যন্ত্রণা নিয়েছে কিনে

অনেক দূরে তবু কাছে

হয়ত একদিন হারিয়ে যাব

LEAVE A REPLY