বিদায়ী বছরে ভোগ্যপণ্যের উচ্চমূল্যে দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে সাধারণ ভোক্তাকে। জীবনযাত্রার গড় ব্যয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আর পণ্য মূল্য ও সেবা-সার্ভিসের মূল্য বেড়েছে ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জীবনযাত্রার ব্যয় ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
এতে আরও বলা হয়, ঢাকা শহরের ১৫টি বাজার ও বিভিন্ন সেবা-সার্ভিসের মধ্য থেকে ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২২টি নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী এবং ১৪টি সেবা-সার্ভিসের তথ্য এ পর্যালোচনায় বিবেচনা করা হয়েছে। এই হিসাব শিক্ষা, চিকিত্সা ও প্রকৃত যাতায়াত ব্যয়বহির্ভূত। ২০১৬ সালে সব ধরনের চাল ও ডালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি দাম বৃদ্ধি পেয়েছে আমদানিকৃত রসুনে-৭২ দশমিক ০৬ শতাংশ। দেশি রসুনের দাম বেড়েছে ৪৭ শতাংশ, চিনি ৪৬ দশমিক ০৫ শতাংশ, লবণ বেড়েছে ৩৭ দশমিক ৩২ শতাংশ, আমদানিকৃত মসুর ডাল বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং দেশি মসুর ডালের দাম ১২ দশমিক ৯৮ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া শাড়িতে ১২ দশমিক ০৬ শতাংশ, চা পাতায় ১১ দশমিক ৭০ শতাংশ, দেশি থান কাপড়ে দাম বেড়েছে ১০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, ডালে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ, প্রতি লিটার গরুর দুধে বেড়েছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ, গেঞ্জি, তোয়ালে ও গামছায় বেড়েছে ৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ, মাংসে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে গড়ে ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ক্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের শেষপ্রান্তিকে পাইকারি ও খুচরা বাজারে সব ধরনের চালের দাম ছিল ঊর্ধ্বমুখী। নিম্ন-আয়ের মানুষের ব্যবহূত মোটা চালের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, শহরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় বসবাস করেন এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর মোট আয়ের সিংহভাগ বাড়িভাড়ায় ব্যয় হয়। ২০১৬ সালে ঢাকা শহরে বাসাভাড়া বেড়েছে গড়ে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। বাসাভাড়া সবচেয়ে বেশি বেড়েছে পাকা টিন সেটে ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ, ফ্ল্যাটে বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ, মেস রুমে বেড়েছে ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং বস্তি বাড়িতে বেড়েছে ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। বাড়িভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে ক্যাবের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের সংস্কার করে ভাড়াটেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। অধিকন্তু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের বসবাসের উপযোগী বাসা-বাড়ির সরবরাহ বৃদ্ধির সরকারি উদ্যোগ জোরদার করা দরকার।
এছাড়া বছর জুড়েই নিম্নমানের নকল ও ভেজাল ভোগ্যপণ্য বরাবরের মতোই বাজারে বিক্রি হয়েছে এবং এটি ভোক্তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির অন্যতম প্রধান কারণ। ক্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভেজাল রোধে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বিএসটিআইর কার্যপরিধি আরও জোরদার করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এখনও খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না। অবিলম্বে কর্তৃপক্ষের জনবল নিয়োগ ও বিধিবিধান প্রণয়ন করে সংস্থাটিকে বাস্তব রূপ দিতে হবে বলে ক্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
রাজধানীতে ওয়াসার ব্যয় হ্রাস ও সেবার মান উন্নয়নের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে ২০১৬ সালে দু-দফায় পানির মূল্য ২২ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ মূল্য বৃদ্ধির কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। এই মূল্যবৃদ্ধি পুনঃবিবেচনা করা যেতে পারে। অধিকন্তু ভোক্তাস্বার্থ রক্ষা, ওয়াসার কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে গণশুনানির মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব প্রদান করে বিইআরসির আদলে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হয় ক্যাবের পক্ষ থেকে।
ক্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়নি। তবে বিদ্যুত্ ও গ্যাস সরবরাহ কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে মূল্যবৃদ্ধির আবেদন করেছে। কমিশনের গণশুনানিতে তা যুুক্তিযুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত প্রমাণিত হয়নি, তবে কমিশন এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। বিদ্যুত্ সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিদ্যুত্ খাতে গ্রাহক পর্যায়ে দুর্নীতি কমেছে। অন্যদিকে গ্যাস খাতে সরবরাহ পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে এবং দুর্নীতি অব্যবস্থাপনা আগের মতোই অব্যাহত আছে।
২০১৬ সালে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ। তবে এই মূল্যহা্রস আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যহ্রাসের তুলনায় বেশ কম। দেশের যাতায়াত ব্যয়ও বেড়েছে। ২০১৬ সালে গণপরিবহনে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। ঢাকায় যানজটের অবনতি হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যহ্রাস এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়ের সম্প্রসারণ সত্ত্বেও যাত্রী ও মালামাল পরিবহন ব্যয় কমেনি। সারা বছর বাস-মিনিবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া নিয়ে ভোক্তাদের ভুগতে হয়েছে। তবে বিদায়ী বছরে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে ভুগতে হলেও কিছু পণ্যে স্বস্তি ছিল। এ বছরে বেশকিছু পণ্যের দাম আগের বছরের তুলনায় কমেছে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি দাম কমেছে আমদানিকৃত পেঁয়াজে ৫০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। দেশি পেঁয়াজে দাম কমেছে ৩৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ, ধনিয়ায় কমেছে ৩৮ দশমিক ২০ শতাংশ, কাঁচা মরিচে কমেছে ২২ দশমিক ৪২ শতাংশ। ২০১৬ সালে সব ধরনের ভোজ্য তেলের দাম কমেছে। এর মধ্যে খোলা পাম তেলে কমেছে ৯ দশমিক ১৫ শতাংশ, বোতলজাত সয়াবিন তেলে ৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং খোলা সয়াবিন তেলে কমেছে ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ।
ক্যাবের প্রতিবেদনে মোট তিনটি সুপারিশ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে-ধান-চালের মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং কৃষককে উত্পাদিত ফসলের উপযুক্ত মূল্য প্রদানের লক্ষ্যে ‘কন্ট্রাক্ট গ্রোয়িং’ পদ্ধতি অনুসরণ করে ধান কাটার মৌসুমে কৃষকের নিকট থেকে সরাসরি সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান-চাল সংগ্রহ করা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অচিরে পেট্রল, অকটেন, ডিজেল, ফারনেস অয়েল এবং এলপি গ্যাসের মূল্যহ্রাস করা, বাড়িভাড়া আইন ১৯৯১ অনতিবিলম্বে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে ভাড়াটেদের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে সহজ শর্তে দীর্ঘ মেয়াদি কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিয়ে নগরে বসবাসরত নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জন্য ফ্ল্যাট তৈরি ও বরাদ্দের ব্যবস্থা করা। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণে প্রণীত আইন-ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯, প্রতিযোগিতা আইন-২০১২, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫-এর দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

LEAVE A REPLY