‘চিন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ এশিয়ার মিয়ানমার, চীন, ভারত ও বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু স্থানে বসবাস করে। এই জনগোষ্ঠীর রয়েছে আদিকাল থেকেই ট্যাটু প্রথা। একজন যুবতীর বয়স ১২-১৪ বছর হলেই তাকে পরতে হয় বড় কানের দুল ও মুখে আঁকা হয় ট্যাটু। যার ফলে তাকে কুিসত দেখায়। আর তাতে সে অপহরণ থেকে রক্ষা পাবে। এ রকম একটি জাতিগোষ্ঠী নিয়েই আমাদের আজকের চিত্র-বিচিত্র।

মিয়ানমারের চিন ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী সে দেশের চিন প্রদেশে বসবাস করে। সাধারণত পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করে বলে তাদের পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী বলা হয়। পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসরত চিন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মহিলারা এখনও তাদের প্রাচীন প্রথা মেনে চলে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-একজন মেয়ের বয়স মাত্র ১২ থেকে ১৪ বছর হলেই তাদের মুখে বিভিন্ন রংয়ের ট্যাটু আঁকা হয়। ফলে সে অপহরণ বা অন্য সব শারীরিক নির্যাতন থেকে রক্ষা পায়। কথিত আছে, এই প্রথাটি চালু করা হয় নারীদের কুিসত করার জন্য। ফলে তত্কালীন রাজা ও তার কর্মচারীদের দ্বারা অপহরণের শিকার হওয়া থেকে তারা রক্ষা পেত। এভাবে প্রথাটি ১৯৬০ সাল পর্যন্ত চলমান থাকে। এখনও তারা কানের চামড়া প্রসারিত করে বড় রিং পরে। রিংগুলো একেকটি বিভিন্ন নকশার হয়ে থাকে। প্রতিটি নকশার রয়েছে একেকটি সাংস্কৃতিক তাৎপর্য।
ট্যাটুর বাহারভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ট্যাটু। তাদের মধ্যে যারা খ্রিস্টধর্মের অনুসারী তারাই বেশি ট্যাটু করে থাকে। ট্যাটু নকশা মাকাং ও দাই সম্প্রদায়ের একই। দেখতে চার কোণ আকৃতির মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফোঁটা। আবার দাই সম্প্রদায়ে কিছু শ্রেণি ঘাড় নীল আর মাকাং সম্প্রদায়ের ট্যাটুর রং নীল-সবুজ রংয়ের। আর মুন সম্প্রদায়ের ট্যাটুর নকশা কপাল থেকে নাক পর্যন্ত সোজা লাইনাকৃতি। লাইনগুলোর চারপাশে ফোঁটা ফোঁটা বৃত্ত রয়েছে। রং সাধারণত কালো। ট্যাটুগুলো তৈরি করতে ব্যবহার করা হয় গরুর পিত্ত, প্রাণীর চর্বি ও বিভিন্ন গাছের কষ। ট্যাটু করার পদ্ধতিটি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। বিশেষ করে চোখের পাতার ওপরের নরম অংশটুকু। সাধারণত এটি করতে এক থেকে দুই দিন সময় লেগে যায়। আর কাটা অংশ শুকাতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় প্রয়োজন হয়। তবে ট্যাটুর নকশা যাই হোক সব নকশাই নারীদের জন্য। আর যদিও এই ট্যাটু তাদের মুখে কুিসত করার কাজে ব্যবহার করা হতো, তথাপি বর্তমানে এটি চিন নৃ-জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির অংশ।
১৯৬০ সালের পূর্বে মুন, দাই ও মাকাং সম্প্রদায়ের কোনো কন্যাশিশু জন্মালে ১২-১৪ বছর বয়সে তাকে ট্যাটু করা হতো। এতে প্রায়ই নিহতের ঘটনা ঘটত। ফলে ১৯৬০ সালে মিয়ানমার সরকার এটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সরকার এটিকে বর্বরোচিত বলে ঘোষণা করে। তবে এটি বর্বরোচিত কি না তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে চিন নৃ-জনগোষ্ঠীর মাঝে। যারা এর পক্ষে তারা এখনও ট্যাটু চর্চা করে যাচ্ছে। অবশ্য এখন শুধু বয়স্ক নারীরা এটি অনুসরণ করে থাকে। নতুন প্রজন্ম এটি আর অনুসরণ করছে না। ফলে দিনে দিনে এই সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে।

LEAVE A REPLY