জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত নানা ঘটনা-অপঘটনা ও বিস্ময় ঘিরে ছিল উইলিয়াম শেক্সপিয়রকে। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৫৬৪ সালের ২৩ এপ্রিল ইংল্যান্ডের স্ট্রাটফোর্ড আপন আভন নামে একটি মফস্বল শহরে। মজার ব্যাপার হলো, শেক্সপিয়র মারাও যান ২৩ এপ্রিল। সালটা ছিল ১৬১৬।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মতো শেক্সপিয়রও স্কুল জীবনকে ভালোবাসতে পারেননি। ১৫৮২ সালে ১৮ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন শেক্সপিয়র। বিয়ে করেন তার চেয়ে ৬ বছরের বড় অ্যান হাতাওয়েকে। কয়েক বছরের মধ্যে তিনি দুই মেয়ে এবং এক ছেলে সন্তানের জনক হন। কিন্তু ১১ বছর বয়সে ছেলে হ্যমনেট মারা গেলে উত্তরাধিকার সম্পত্তির দেখভাল নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তিনি। আরেকটি ছেলে সন্তানের জন্য বারবার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেন। ম্যাকবেথ নাটকে ম্যাকবেথ লেডি ম্যাকবেথকে বলছেন, ‘কেবল পুত্র সন্তানের জন্ম দাও।’
১৫৮৫ থেকে ১৫৯২ পর্যন্ত এ ৭ বছর শেক্সপিয়রের জীবন সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। তবে গবেষকরা ধারণা করছেন, শেক্সপিয়র ওই সময়টুকুতে কোনো ধনী লোকের গৃহে শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। তবে ১৫৯২ থেকে শেক্সপিয়র লন্ডনে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। রবার্ট গ্রিন নামে এক প্রবীণ নাট্যকার লেখেন, কে একজন আনকোরা লোক এসে কাক হয়ে ময়ূরের পুচ্ছ ধারণ করে পুরো লন্ডন শহরকে নাচাচ্ছে। এ সময় অন্য জনপ্রিয় নাট্যকাররা, যেমন টমাস কিড, ক্রিস্টোফার মার্লো প্রমুখ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী। যে কারণে তাদের ‘ইউনিভার্সিটি উইট’ বলা হতো; কিন্তু শেক্সপিয়রের সে ধরনের কিছু ছিল না, উপরন্তু তিনি ছিলেন মফস্বল থেকে আগত।
শেক্সপিয়র মৃত্যুর বাস্তবতা জানতেন ও বিশ্বাস করতেন। নিজের মৃতদেহ চুরির আশঙ্কাও তার মনে কাজ করত। শেক্সপিয়রের নিজের লেখা এপিটাফে সাবধান করে দেয়া আছেÑ হাড় চোররা যেন তার শবের হাড্ডি চুরি করতে সাহস না করে। তখন কফিন ভেঙে লাশ চুরি ইংল্যান্ডের দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা ছিল।
১৫৯৯ সালে শেক্সপিয়রের নাট্যগোষ্ঠী টেমস নদীর পাড়ে সাউথ ব্যাংক নামে জায়গাটিতে দ্য গ্লোব নামক একটি নতুন থিয়েটার হল প্রতিষ্ঠা করেন। এর কাঠ এবং পাটাতন ছিল সম্প্রতি ভেঙে ফেলা দ্য থিয়েটারের পুরনো কাঠ দিয়ে তৈরি। শেক্সপিয়রসহ ১২ জন অভিনেতা ও নাট্যকার এর মালিক হন। তবে পরবর্তী সময় এর কোনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি।
আজ তাই শেক্সপিয়র পাঠ মানে হচ্ছে কোনো একক অনৈতিহাসিক শুদ্ধ মানবতার পাঠ নয়, তার পাঠ মানে হচ্ছে ঐতিহাসিক চেতনাসমৃদ্ধ বহুমাত্রিক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যসমৃদ্ধ পাঠ।
ক্রিস্টোফার মার্লো ও শেক্সপিয়রকে নিয়ে মজার একটি তর্ক আছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের গবেষণা বলছে, ক্রিস্টোফার মার্লোকে শেক্সপিয়রের সহ-লেখক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান। তিনি ‘ষষ্ঠ হেনরি’ নাটকের তিনটি অংশেই শেক্সপিয়রের সহ-লেখক ছিলেন। যুগে যুগে সাহিত্য গবেষকরা শেক্সপিয়রের রচনায় মার্লোর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করে আসছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ক্রিস্টোফার মার্লো ও শেক্সপিয়র একই ব্যক্তি ছিলেন বলেও অবহিত করেছিলেন। একটি বহুল প্রচলিত কথা হচ্ছে, শেক্সপিয়র আদৌ মিশুক ছিলেন না। ১৯৮৬ সালে অক্সফোর্ড যখন জানাল শেক্সপিয়রের আটটি নাটকের উপাদানে অন্য লেখকদের অবদান ছিল, তখন অনেক মানুষই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। মার্লো ১৫৯৩ সালে ২৯ বছর বয়সে ছুরিকাহত হয়ে মারা যান। তিনি হয়তো গুপ্তচরবৃত্তির কলঙ্কের ফাঁদে পড়েই এ ধরনের মৃত্যুবরণ করেন। এটি রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে। মার্লো শেক্সপিয়রের ২ মাস আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং মার্লোর মৃত্যুর ২ মাস পর সাহিত্যে শেক্সপিয়রের নাম দুই সপ্তাহ ধরে কম-বেশি উচ্চারিত হওয়া শুরু করে। তবে মূল ব্যাপার হলো, বাস্তবে মার্লো একজন মানুষ, যিনি মৃত্যুর একটি মনগড়া কাহিনী দাঁড় করিয়ে ছদ্মনাম শেক্সপিয়র গ্রহণ করেছিলেন। যদিও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দুইজন দুই লোক ছিলেন।

LEAVE A REPLY