স্কুলে থাকতে সৈয়দ মুজতবা আলীর একটা গল্প পড়েছিলাম। গল্পের নাম –রসগোল্লা। ইউরোপের এক এয়ারপোর্টে কাস্টমস পুলিশের রসগোল্লা চিনতে না পারা এবং এই নিয়ে গল্পের নায়ক ঝান্ডুদার ব্যাপক উত্তেজনা ছিল গল্পের বিষয়বস্তু।

স্কুলে পড়া গল্পগুলি কেমন যেন মগজে গেথে যায় সারাজীবনের জন্য। যে কারনে আজও আমি যখনই কোন এয়ারপোর্টে যাই, কেন জানি ঝান্ডুদার খুব কথা মনে হয়। যার চামড়ার ব্যাগে নানা দেশে আগমন ও বহির্গমনের টিকেট এমনভাবে সাঁটা থাকতো যে, হঠাৎ দেশে বোঝার উপায় ছিল না তিনি বিদেশে যাচ্ছেন, নাকি বিদেশ থেকে আসছেন।

গল্পে ঝান্ডুদার চরম আপত্তি সত্তেও কাস্টমস অফিসার রসগোল্লার টিন কেটে দেখেন ভিতরে কি আছে। অল্পতেই রেগে যাওয়া বাঙ্গালী আর যায় কোথায়! ঝান্ডুদা তখন রেগেমেগে সেই কাস্টমস অফিসারের শার্টের কলার ধরে, একটা রসগোল্লা থেবড়ে দেন ব্যাটার নাকের ওপর! হাহাহা।

মাঝে  মাঝে এমনও মনে হয় গল্পের সেই ঝান্ডুদা আসলে সৈয়দ মুজতবা আলী নিজেই।

আমি নিজেকে ঝান্ডুদা দাবী করতে পারি না। আমার সেই সামর্থ্য কোথায়, প্রতিনিয়ত দেশবিদেশে ঘুরে বেড়ানোর। তবু সদ্য বিদায়ী বছরে যেটুকু ঘুরেছি, এই নাতিদীর্ঘ জীবনে কম নয়। সামার ভ্যাকেশনের সময় গেলাম নিউইয়র্ক, ইস্তাম্বুল হয়ে মালয়েশিয়ায়। তারপর সেখান থেকে জন্মভূমি বাংলাদেশে। সেখানে লম্বা সফরের পরে আবার নিউইয়র্কে ফিরে গিয়েছিলাম নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখতে বাফেলোতে। আর বছরের শেষে এসে গেলাম টেক্সাস। এই রাজ্যের তিনটি বড় শহর ডালাস, অস্টিন ও স্যান এন্টনিও ঘুরে দেখলাম।

সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশেবিদেশে’ বই দিয়েই বেশীরভাগ বাঙ্গালী পাঠকের ভ্রমন সাহিত্যে হাতেখড়ি। তাই নিজেকে ঝান্ডুদা ভাবাটা বোধকরি দোষের কিছু না। আর নিত্য নতুন জায়গায় যাবার ইচ্ছা মানুষের স্বভাবজাত, চিরন্তন। ইউরোপিয়ানরা কিংবা ইউরোপিয়ান বংশোৎভূত আমেরিকানরা তো পারলে সারা বছর ঘোরে। টাকা জমায়ই তারা ঘোরার জন্য।

আমরা এশিয়ানরা সেই তুলনায় অনেক ঘরকুনো। অথচ নতুন জায়গায় গেলে শুধু সেই জায়গাটা দেখা হয় না, সেই জায়গা সম্পর্কে অনেক তথ্যও জানা হয়। এরমধ্যে অনেক নতুন তথ্য থাকে। আবার পুরনো জানাটা ঝালাই হয়।

এই যেমন টেক্সাসের কথা বলি। আমরা কি সবাই জানি, আমেরিকায় আলাস্কার পরে সবচেয়ে বড় রাজ্যের নাম টেক্সাস। আলাস্কা কিন্তু আবার বসবাসের উপযোগী নয়। টেক্সাসের সবচেয়ে নামকরা শহর ডালাস। এই নামে আশির দশকে একটা টিভি সিরিয়াল দেখানো হতো বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। মোট ৯৬ টি দেশে ৫৫টি ভাষায় এই সিরিয়াল চলতো। যে রেকর্ড পৃথিবীর আর কোন টিভি সিরিয়ালের নেই। অথচ আমেরিকায় ডালাস টিভি সিরিজের অবস্থান সর্বকালের সেরা তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে। প্রথম অবস্থানে আছে ম্যাশ। এমন আরো অনেক অজানা তথ্যই জানা যায় নতুন জায়গায় গেলে।

আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে মনে করা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যাক্তি। প্রতি চার বছর অন্তর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। কিন্তু আমরা কজনকে সারাজীবন মনে রাখি। হাতে গোনা তেমন কয়েকজনের মধ্যে থাকবেন জন এফ কেনেডি। কেন তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল মৃত্যুর এত বছর পরেও সেই রহস্য অজানাই থেকে গেছে। কেনেডিকে নিয়ে এত জানার সুযোগ ঘটল সেই ডালাসে গিয়েই। কোন জায়গায় তাকে হত্যা করা হয়, হোটেলের কোন জানালা দিয়ে গুলি করেছিল আততায়ী, সবই চাক্ষুষ দেখতে পেলাম

নিউইয়র্ক থেকে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার ফ্লাইট টেক্সাসের ডালাসে। শিকাগো বিমানবন্দরে আবার যাত্রা বিরতি আছে। আমরা নয়জনের দল। সেই দলে আমি, আমার স্বামী ও দুই শিশুপুত্র আছে।

ডালাসে নেমেই জানলাম, আমার এক পুরনো বন্ধু সেও বেড়াতে এসেছে এখানে। ওর নাম ফারজানা রহমান শাওন। ইডাহো থেকে এসেছে ও। উঠেছে সুপর্ণা নামে ওর আরেক বন্ধুর বাসায়। সেই সুপর্ণা ড্রাইভ করে নিয়ে এল শাওনকে। আমরা তখন দলেবলে খাচ্ছিলাম এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে। বলাবাহুল্য এই সফরে হোটেলে করেছি ব্রেকফাস্ট। লাঞ্চ কিংবা ডিনার খুঁজে খুঁজে ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে করতে হয়েছে।

আমেরিকার যে দুই তিনটি শহরের নাম বাঙ্গালী সবার আগে জেনেছে, তার মধ্যে ডালাস একটি। কারণ এই শহরের নামে ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত একটা বিখ্যাত টিভি সিরিয়াল চলতো সারা বিশ্বে। ডালাসে এসে সেই সিরিজের বাড়ীঘর না দেখলে কি হয়!

বিশাল তেল সামাজ্যের মালিক ইউইন পরিবারের প্রাসাদ দেখে একটু হতাশই হলাম। টিভিতে যত বড় দেখাতো আসলে সেরকম না। সুইমিং পুলটাও খুব ছোট। তবে র‌্যানটা মোটামুটি বিশাল। ছোট এক ট্রেনে করে পুরো এলাকা আমাদের ঘুরে দেখানো হল। তারপর এক গাইড মহিলা বাড়ীর ভিতরে ঘুরে ঘুরে আমাদের বিস্তারিত সব বললেন।

ডালাস ছিল প্যাট্রিসিয়া জকের তিনপুত্রের কাহিনী। যার বড় ছেলের নাম জে আর। ইউইন ওয়েলের সিও সে। উচ্চভিলাষী, ধূর্ত, চতুর ব্যবসায়ী। ছোট দুই ভাই ববি ও গ্যারি। ববি ভালোবাসতো ইউইন পরিবারের শত্রু ব্যারনেসদের কন্যা পামেলাকে। এই নিয়ে অনেক নাটকীয়তা। অনেকটা আমাদের বাংলা সিনেমার মতো।

তবু সেই স্মৃতি মনে দখিনা বাতাস বইয়ে দিল। আমাদের সাদাকালো বিশ ইঞ্চি ফিলিপস টিভির কথা মনে পড়ল। যখন টিভি দেখা ছিল একটা উৎসবের মতো। কাঠের বাক্সে তালা দিয়ে রাখা হতো বিশাল যন্ত্রটা। যখন তখন খোলা হত না। পড়াশুনা শেষ করে রাতের খাবারের পরে সবাই বসে জমিয়ে দেখতাম টিভি। এমনকি বিজ্ঞাপনগুলিও বাদ পড়তো না।

মনে সেই রঙ লাগিয়ে সেদিন বিকেল ডালাস থেকে রওনা হলাম টেক্সাসের রাজধানী অস্টিনে। রাজধানী হলেও এই রাজ্যের চতূর্থ গুরুত্বপূর্ণ শহর এটি। তবে এক রাজ্যে এতগুলি গুরুত্বপূর্ণ শহর আমেরিকায় টেক্সাস ছাড়া আর কারো নেই। হিউস্টন, ডালাস, স্যান এ্যান্টনিওর পরে তার স্থান।

অনেকে মনে করেন টেক্সাস বুঝি মেক্সিকো থেকে দখল করে নিয়েছে আমেরিকা, আসলে সেটা ঠিক না। টেক্সাস স্বল্প সময়ের জন্য স্বাধীন এক রাষ্ট্র। মেক্সিকোর গৃহযুদ্ধের ফলস্বরূপ টেক্সাস বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ব্যাটল অব গনজালেস নামে সেই যুদ্ধে মেক্সিকান সেনাবাহিনীকে হারিয়ে টেক্সানরা স্বাধীনতা লাভ করে। তবে সেটা টিকে ছিল মাত্র নয় বছর। ১৮৩৬ সাল থেকে ১৮৪৫ সাল পর্যন্ত স্বাধীন ছিল টেক্সাস। স্বাধীনতাকামীদের দুই অংশের বিরোধ এক সময় চরমে ওঠে। তাদেরই একদল পরে আমেরিকার সঙ্গে একীভূত হবার জন্য চেষ্টা করে। ১৮৪৫ সালে আমেরিকার ২৮তম স্টেট হিসেবে আবির্ভাব ঘটে টেক্সাসের।

টেক্সাস আক্রমণের সময় মেক্সিকানদের মূল ঘাটি ছিল সীমান্তবর্তী শহর স্যান এন্টনিওতে। সেইন্ট এন্থনি অব পাদুয়ার নামে যে শহরের নামকরণ করা হয়েছে। টেক্সাসের সবসেরা ট্যুরিস্ট স্পট এটি। যাকে অনেকে বলে ভেনিস অব আমেরিকা। পুরো শহরের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে স্যান এন্টনিও নদী। যেখানে নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ালাম আমরা। নদীর ধারে সব কফি শপ, রেস্টুরেন্ট। সবাই চেয়ার টেবিল পেতে খাইছে। সে এক মনোরম দৃশ্য। নদী তীরের ঘ্রাণ, নৌকার দুলুনি, জীবনের এত এত প্রাচুর্য – বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল জন্মভূমিতে।

পুরো শহরে ঘুরে মনে হচ্ছিল আমেরিকা নয়, আমরা বোধকরি মেক্সিকোতে আছি। তবে এখানে এসে একটা দু:খজনক ঘটনা হল- আমার ছোট ছেলে সৃজনের পিঠের ব্যাগ হারানো। সৃজন তো কথা বলতে পারে না। আর আমরাও দ্বিধাগ্রস্ত আসলে কি ওর পিঠে ব্যাগ ছিল? নাকি সেটা গাড়ীতে আছে? হোটেল লবিতে ফেলে আসেনি তো? কিংবা রুম থেকেই হয়ত আনা হয়নি। অনেক জল্পনা কল্পনার পরে আমার সাথে তোলা সৃজনের একটা ছবিতে দেখা গেল, ওর কাঁধে একটা ব্যাগ আছে। আমরা অবশেষে নিশ্চিত হলাম ওটা হারিয়েছে। দেখলেন তো বেশী বেশী ছবি তোরা আসলে খারাপ না!

ব্যাগের শোক ভুললাম আমরা পরদিন অস্টিনের সামনে এক গাছ দেখে। ওটাও যেন বাংলাদেশের গ্রামকেই এক ঝলকে তুলে আনল চোখের সামনে। একদিকে টেক্সাসের স্টেট পার্লামেন্ট ভবন। আরেকদিকে এ্যাডমিনেস্ট্রিভ ভবন। কিন্তু দুই ভবনকে তোয়াক্কা না করে আমরা হুড়োহুড়ি করে ছবি তুললাম একটা গাছের ডালে। যে গাছের একটা অংশের ডালপালা মাটিতে নেমে এসেছে। নিউইয়র্কের তুলনায় টেক্সাসের আবহাওয়া অনেক বেশী ভালো হওয়ায় সবুজ-কোমল প্রকৃতিতে আমরা হারালাম বারবার।

ডালাসে ফিরে শেষ দিনটা কাটল ব্যস্ততায়। সকালে গেলাম ওয়েস্টার্ণ শহরের আদলে গড়া ফোর্ট ওয়ার্থ স্টকসইয়ার্ডে আর বিকেল বেলা আরলিংটন ন্যাশনাল সিরিমনিতে। প্রথম অভিজ্ঞতা আনন্দের। দ্বিতীয়টি বেদনার।

সেবা প্রকাশনীর সেই ওয়েস্টার্ণ উপন্যাসের স্বাদ পেলাম স্টক ইয়ার্ডে এসে। হুবুহু সেভাবে সাজানো হয়েছে এলাকাটি। সেলুন, তাতে সুইং ডোর। নকল গানম্যানরা ঘুরে বেড়াচ্ছে কোমরে পিস্তল নিয়ে। শত শত মানুষ হাঁটছে। ট্যুরিস্ট বাস ঘুরছে। কাউগার্লরা ওদের পোষা ষাড়ে চড়ার সুযোগ দিয়ে টাকা কামিয়ে নিচ্ছে। একটু পরে কাঠের গ্যালারির ছোট স্টেডিয়াম। এখানে সকালে ঘোড়ার রেস ছিল। বিকেলে আবার ষাড়ের রেস হবে।

আনন্দময় সেই রূপের বিপরীতে আরলিংটনের চিত্রটা বিষাদের। একটা লম্বা স্মৃতিস্তম্ভ, যেখানে নিহত হয়েছিলেন আমেরিকার ৩৫তম প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। মৃত্যুর ৫৫ বছর পরেও তাকে নিয়ে গল্পের শেষ নেই। তিনি যেন পৌরানিক গল্পের সেই চরিত্রের মতো। যিনি যুগে যুগে থাকেন দ্বীপ্তিমান। ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর ডালাসে এক মোটর শোভাযাত্রায় নিহত হন তিনি। লি হার্ভি অসওয়াল্ডকে এই ঘটনার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। হোটেলের জানালা দিয়ে হার্ভি গুলি করেছিলেন কেনেডিকে। কিন্তু তার বিচার হয়নি। কারন দুইদিন পরে জ্যাক রুবি নামে আরেক আততায়ীর গুলিতে হার্ভি নিহত হয়।

কেনেডির মৃত্যু রহস্যের এখনও কুলকিনারা হয়নি। তবে তিনি থেকে গেছেন জনগনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে। আমেরিকায় অনেক প্রেসিডেন্ট এসেছেন, গেছেন, কিন্তু মানুষের মনে ঠাঁই নিতে কেনেডির মতো কেউ পারেনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে আনা আর বর্ণবাদে বিভক্ত আমেরিকাকে এক সুতায় গেথেঁ ছিলেন তিনি। হয়ত তাতে বেজার হয়েছিলেন কেউ কেউ। যার মাশুল দিতে হয়েছে কেনেডিকে জীবন দিয়ে।

জীবন উজ্জ্বলতা আর মৃত্যুর নিস্তব্ধতা বুকে নিয়ে অবশেষে আমি ঝান্ডুদা নিউইয়র্কের উদ্দেশ্য রওনা হলাম। পৌছালাম এক সময় জন এফ কেনেডির নামের এয়ারপোর্টে। আগে যখন কারো সঙ্গে দেখা হত, বাড়ী কোথায় জানতে চাইলে বলতাম- ঢাকা। এবার টেক্সাস সফরে গিয়ে অনেকে আমার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেছে- ‘আপনার বাড়ী কোথায়? আমি বলেছি-নিউইয়র্ক। সেই বাড়ীতে ফিরলাম শেষমেশ।

মানুষের জীবন আসলেই কত বিচিত্র!

LEAVE A REPLY