২০২১ সালের মধ্যে দেশের প্রতি ঘরে বিদ্যুত্ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এজন্য প্রয়োজন কমপক্ষে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্। অর্থাত্ ২০২১ সালে মধ্যে আরও ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের উত্পাদন ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কিন্তু নির্মীয়মাণ বড় বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর যে অগ্রগতি তাতে এই সময়ের মধ্যে বড়জোর আড়াই থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুত্ যোগ হতে পারে। এতে সরকারের এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে কি না তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের বড় বিদ্যুেকন্দ্র, বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো স্থাপনের প্রক্রিয়া পিছিয়ে পড়ায় ওই লক্ষ্য অর্জন বড় রকমের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ কারণে সরকার আরও দেড় হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার তেলভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। একই সঙ্গে ভারত থেকে আরও বিদ্যুত্ আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরকারকে বিদ্যুত্ আমদানি অথবা উচ্চ দামের তেলভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। এসব করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। এতে বরং বিদ্যুতের উত্পাদন খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি দামের ঘানি টানতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে দৃঢ় আশাবাদী সরকারের বিদ্যুত্ বিভাগের অধীনস্থ নীতি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন। সম্প্রতি তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে বিদ্যুত্ খাতের যে অগ্রগতি তাতে ২০২১ সালে যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা অর্জন করা সম্ভব। তিনি বলেন, কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর কাজ শেষ করা সময়সাপেক্ষ। এসব কেন্দ্রে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে অন্তত দুটি বড় কেন্দ্র থেকে বিদ্যুত্ পাওয়ার আশা করছি। এর বাইরে অন্যান্য উত্স থেকেও বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়ানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। কোনো কারণে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুত্ পেতে দেরি হলে বিকল্প ব্যবস্থাও চিন্তা করা হয়েছে। পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্যও প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন।

বিদ্যুত্ বিভাগের কর্মপরিকল্পনায় ২০২১ সালের মধ্যে বিদ্যুতের উত্পাদন ক্ষমতা ২৪ হাজার এবং ২০৩০ সালে ৪০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।

মূলত বড় বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভর করে এই পরিকল্পনা নেওয়া হলেও কয়লাভিত্তিক অধিকাংশ বিদ্যুেকন্দ্রের নির্মাণকাজ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। পরিকল্পনাধীন ২৩টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্রের মধ্যে সাতটি সরকারি, আটটি বেসরকারি এবং আটটি বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গৃহীত প্রকল্প। এই ২৩টি কেন্দ্রের সব মিলিয়ে মোট উত্পাদন ক্ষমতা ২০ হাজার ৬২২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সরকারি খাতের বড়পুকুরিয়া (তৃতীয় ইউনিট) বিদ্যুেকন্দ্রের কাজ শেষ পর্যায়ে। ২০১৮ সালের মধ্যে এই কেন্দ্র থেকে ২৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ পাওয়া যাবে। এর বাইরে ২০২১ সাল নাগাদ পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র উত্পাদনে আসবে বলে আশা করছে বিদ্যুত্ বিভাগ। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বহুল আলোচিত রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রের কাজ ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর বাইরে আর কোনোটিরই ২০২১ সালের মধ্যে উত্পাদনে আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণের যে কাজ শুরু হয়েছে সেখান থেকেও ২০২১ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুত্ আসার সম্ভাবনা খুবই কম। যদিও সরকার আশা করছে এখান থেকে অন্তত একটি ইউনিটের ১ হাজার ২শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আসবে ২০২১ সালের মধ্যে। কিন্তু বাস্তবে ২০২২ সালের আগে বিদ্যুত্ পাওয়া যাবে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিদ্যুত্ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কয়লাভিত্তিক দুটি বিদ্যুেকন্দ্র ছাড়া গ্যাস ও তেলভিত্তিক কিছু বিদ্যুেকন্দ্র এবং ভারত থেকে আমদানি ও নবায়নযোগ্য উত্স থেকেও কিছু বিদ্যুত্ আসবে। কিন্তু তা দিয়ে ২০২১ সালে প্রতি ঘরে বিদ্যুত্ পৌঁছানো হয়তো সম্ভব হবে না।

বিদ্যুত্ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুত্ খাতের উন্নয়ন অগ্রগতি অসামাঞ্জস্যহীন। সুতরাং সরকারের এই লক্ষ্য অর্জন করা খুব কঠিন হবে। কারণ প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখনও অনিশ্চিত। এ বিষয়টির ওপর নজর দেওয়া হচ্ছে না। সরকার এখন এলএনজি আমদানির কথা ভাবছে। কিন্তু এলএনজি দিয়ে বিদ্যুতের ঘাটতি মেটানো যাবে, সেটা খুব বাস্তবসম্মত চিন্তা নয়। তিনি বলেন, যে পরিস্থিতি তাতে আমদানি করা বিদ্যুতের ওপরই এখন বেশি নির্ভরশীল হতে হবে। এই আমদানি করা বিদ্যুত্ দিয়ে আমরা কতখানি আমাদের চাহিদা মেটাতে পারব সেটা ভবিষ্যত্ই বলতে পারবে। এক্ষেত্রে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুতের কথা চিন্তা করা হলেও তাতে উত্পাদন খরচ বাড়বে।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে মহাজোট ২০০৯ সালের ১২ জানুয়ারি সরকার গঠন করে। তখন দেশের বিদ্যুত্ উত্পাদনের ক্ষমতা ছিল তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। সাড়ে সাত বছরে উত্পাদনক্ষমতা প্রায় চার গুণের বেশি বেড়েছে।
১৫ হাজার মেগাওয়াট উত্পাদনক্ষমতা অর্জন করে সরকার ঘটা করে উদযাপন করেছে। এর মধ্যে সরকারিভাবে মোট স্থাপিত বিদ্যুেকন্দ্রের ক্ষমতা ১৩ হাজার ১৫১ মেগাওয়াট। তবে কিছু কেন্দ্রের ক্ষমতা কমে যাওয়ায় নিট ক্ষমতা ১২ হাজার ৫৪৭ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে। আর ভারত থেকে আমদানি করা হচ্ছে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্।

এর আগে ২০১৩ সালে বিদ্যুতের উত্পাদন যখন ১০ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছিল, তখনও সরকার আলোক উত্সবের আয়োজন করে। তবে এবারই প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের মূল উত্পাদনের সঙ্গে শিল্প-কারখানায় নিজস্ব উদ্যোগে স্থাপিত বিদ্যুেকন্দ্রের উত্পাদিত বিদ্যুত্ (ক্যাপটিভ পাওয়ার) যোগ করা হয়েছে। দেশে মোট বিদ্যুতের ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের ক্যাপটিভ বিদ্যুেকন্দ্র রয়েছে। এসব বিদ্যুেকন্দ্রের জ্বালানি সরকারই সরবরাহ করে।

সূত্র মতে, স্থাপিত ক্ষমতা ১৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করা সম্ভব হয়েছে। জ্বালানিস্বল্পতার কারণে অন্তত দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। আবার যেটুকু উত্পাদন হচ্ছে, তাও সঞ্চালন-ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে ঠিকমতো বিতরণ হচ্ছে না।
বিদ্যুত্ বিভাগ সূত্র জানায়, সঞ্চালন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে তিন থেকে চার বছর লাগবে। তবে জ্বালানির ঘাটতি কতদিনে পূরণ হতে পারে, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি।

বিদ্যুত্ খাতে গত ছয়-সাত বছরে যে উন্নতি হয়েছে, বর্তমানে ঢাকার বাইরে তার প্রতিফলন কম। গ্রামাঞ্চলে তো বটেই, ঢাকা ছাড়া ছোট-বড় প্রায় সব শহর-নগরে বিদ্যুত্ পরিস্থিতি ভালো নয়। গ্রামে ও অনেক উপজেলা শহরে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় বিদ্যুত্ থাকে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ-সমাবেশও হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়।
ঢাকাও একেবারে সমস্যামুক্ত নয়। ঢাকার কোনো এলাকায় যখনই বিদ্যুত্ থাকে না, তখনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কারণ জানতে চাইলে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কথা শোনা যায়। আর শোনা যায়, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা।

আরইবি সূত্র জানায়, সরকার ২০২১ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুত্ পৌঁছানোর কর্মসূচি নিয়েছে। সেই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য আরইবি গ্রামে গ্রামে নতুন নতুন লাইন করছে। প্রতি মাসে কয়েক লাখ নতুন সংযোগ দিচ্ছে। বিতরণ ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন করছে। কিন্তু বিদ্যুত্ সরবরাহ পরিস্থিতি আরইবির এই কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারছে না বলে মনে হয়। পিজিসিবির এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন যতটা দুর্বল বলা হচ্ছে বাস্তবে তা নয়। সেটা হলে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ সরবরাহ করা যেত না। এটিই সর্বোচ্চ বিদ্যুত্ উত্পাদন হয়েছে দেশে।

LEAVE A REPLY